তাওহীদ – লা ইলাহ্‌ ইল্লাল্লাহ্‌

Collected from মাসুদ রানা টোকিও, জাপান  http://share-thinking.blogspot.com waiting for his approval

লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্‌ । এর অর্থ কি ? বাংলা ভাষায় অনুবাদ করলে এর অর্থ দাঁড়ায়, আল্লাহ্‌ ছাড়া কোন মাবুদ নেই, কিংবা আল্লাহ্‌ ছাড়া কোন প্রভু নেই, কিংবা আল্লাহ্‌ ছাড়া কোন ইলাহ্‌ নাই । আরবী লা মানে হচ্ছে না । ইল্লাল্লাহ্‌ মানে হচ্ছে আল্লাহ্‌ ছাড়া । ইলাহ্‌ মানে হচ্ছে প্রভু বা মাবুদ । কেউ কেউ এটাকে আর বাংলাতে অনুবাদ করেন না, ইলাহ্‌ শব্দটাই ব্যবহার করেন। কিন্তু, ইলাহ্‌-ই বলি বা প্রভুই বলি কিংবা মাবুদই বলি জিনিসটা আসলে কি ?

আমরা যেই ভুলটা প্রথমেই করি তা হলো, আমরা মনে করে বসে থাকি যে ইলাহ্‌ হচ্ছে কোন সৃষ্টিকর্তা । অর্থাৎ আমরা মসুলমানেরা যেহেতু মনে প্রাণে বিশ্বাস করি যে, একমাত্র আল্লাহ্‌ ই হচ্ছেন সমস্ত বিশ্বজগতের সৃষ্টিকর্তা, তাই আমরা মুসলমানেরা সেফ, জান্নাতে তো যাচ্ছিই, ওয়াও ! আমরা আবার অনেক সময় এও মনে করি যে, ইলাহ্‌ জিনিসটা হচ্ছে আল্লাহ্‌ জাতীয় কোন জিনিস বা ব্যক্তি জাতীয় কোন জিনিস । আসলে, ইলাহ্‌ জিনিসটা কি, সত্যি কথা বলতে এই কিছুদিন আগ পর্যন্তও বিন্দুমাত্র ধারণা ছিল না ।

ইলাহ্‌ হচ্ছে এমন একটা কিছু যার কাছে আমরা নিজেকে সঁপে দিব । যেই জিনিসের উপর আমরা আস্থা করব । যেই জিনিসের কাছ থেকে আমরা কোন কিছু আশা করব । যেই জিনিস আমাদেরকে কিছু দেয়ায় সামর্থ্য রাখে বলে মনে প্রাণে বিশ্বাস করব । যেই জিনিস আমাদের জন্য কি ভাল তা ঠিক করে দেবে । যেই জিনিস হবে আমাদের সকল সুখ এবং আনন্দের উত্‌স । যেই জিনিসকে আমরা সবচেয়ে বেশি ভালবাসব । এবং আমরা মুসলমানদের বিশ্বাস, এই যেই জিনিসটা হচ্ছে আর কিছুই না, একমাত্র আল্লাহ্‌। এবং যে মানুষ আল্লাহ্‌ ছাড়া অন্য কোন কিছুকে সেই জিনিসটা বলে মনে করবে সেই শিরক করলো । এখন দেখা যাক, আমরা মুসলমানেরা আসলে কি করছি ?

সম্পর্ক আছে বলে একটু বলা ভাল বলে মনে করছি । ঊদাহরণ হিসেবে একজন ফেল করা ছাত্রকে ধরা যাক । ধরলাম গণিত পরীক্ষায় সে ফেল করেছে । কারণ আর কি হতে পারে, সে পড়াশোনা করেনি, তাই ফেল করেছে । তবে সে কিন্তু জানত যে, সে যদি পড়াশোনা না করে তাহলে ফেল করবে । যদিও সে জানত যে পড়াশোনা করাটা দরকার, না করলে ফেল করবে এইটা তার দৃঢ় বিশ্বাস । ক্লাশে যে ফার্ষ্ট হয়েছে সে যেরকম বিশ্বাস করে যে পড়াশোনা করতে হবে, ঐ ফেল করা ছাত্রটাও কিন্তু একই কথা একইভাবে বিশ্বাস করে । তাহলে দুইজনের মাঝে তফাত্‌টা কোথায় ? তফাত্‌টা সহজ । একজন বিশ্বাস করেছে এবং সেই অনুযায়ী কাজ করেছে, আরেকজন সেইটা করেনি । এখন রেজাল্ট বের হওয়ার পর সেই ফেল করা ছাত্রটা যদি শিক্ষকের কাছে গিয়ে বলে, স্যার, আমি ১০০% বিশ্বাস করতাম যে, পড়াশোনাটা করা দরকার এবং এটা সত্যি । তাহলে কি বলা যাবে যে, সেই শিক্ষক কি তাকে পাশ করিয়ে দিবে ? ইসলামের বিশ্বাসটাও আমার কাছে ঠিক সেরকমই মনে হয় । শুধু বিশ্বাস করলাম আল্লাহ্‌ ছাড়া কোন ইলাহ্‌ নেই, কিন্তু যে কাজগুলো করে আমরা নিয়মিতই শিরক করছি বা আল্লাহ্‌র পাশে অন্য কাউকে বসাচ্ছি বা অন্য কোন জিনিসকে বছাচ্ছি, তাহলে কি আমরা বলবো যে আমরা পাশ করব ?

সত্যি কথা বলতে কি এই ইলাহ্‌ শব্দটা এত ব্যপক যে এইটা নিয়ে অনেক গবেষণা করার জিনিস আছে । আর আমাদের মুসলমানদের কি হয়েছে ? যেই বাক্যটাকে আমরা ঈমানের একদম মূল ভিত্তি বলি, সেই বাক্যটার অর্থ না বুঝে জীবনটা পার করে দেই, আফসোস !

ঊদাহরণ দিয়ে ইলাহ্‌ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্‌ এর ব্যাখ্যা করে দেখা যাক । এইখানে একটা কথা বলে রাখি, যেই মূহুর্তে আমরা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্‌ এর সীমারেখা পার করছি সেই মূহুর্তে আমরা শির্‌ক করছি । তবে আমি যা বলতে চাচ্ছি, তা বোঝার জন্য বোঝার মন নিয়ে পড়া উচিত, কারণ এই ব্যপারটা খুবই দরকারী, সত্যি বলতে বেসিকের ও বেসিক ।

আমাদের জীবনের অন্যতম প্রধান একটা ইলাহ্‌ হচ্ছে টাকা । জীবনের সুখের জন্য কি দরকার, খুবই সহজ ঊত্তর – টাকা । তার মানে হচ্ছে, আমরা বিশ্বাস করে বসে আছি, টাকা থাকলে আমরা সুখে থাকতে পারব । আমরা বিশ্বাস করে বসে আছি, টাকা থাকলে কি না করা যায় । মানিব্যাগ এ টাকা থাকলে চৈত্রের গরমেও ঠান্ডা লাগে, মাঘের শীতেও গরম লাগে । আমরা ভাবছি, টাকা আমাদের সব দিতে পারে । যেই মূহুর্তে আমরা টাকার কাছ থেকে সুখ পেতে চাচ্ছি, সেই মূহুর্তে আমরা লা ইলাহ ইল্লাল্লাহ্‌ লংঘন করছি, আমরা শির্‌ক করছি । আমি কখনো বলতে চাচ্ছি না টাকার দরকার নেই । দুনিযায় এক নম্বর ধনী যদি কোন মুসলমান হয়, আমার তাতে কোন আপত্তিই নেই । বরঞ্চ আমাদের দেশের তথাকথিত ধার্মিকেরা যখন টাকার প্রতি অনীহা প্রকাশ করে আলসেমি করে, নিজের জীবনে উন্নতি আনার কোন চেষ্টাও করে না, তখন আমার বিশ্বাস সেইটা মোটেও ইসলাম এর শিক্ষা না । সবার কাছে আমার হাতজোর করে একটা অনুরোধ, তথাকথিত মুসলমানের কি করছে তা দিয়ে ইসলামের মত এত চমত্‌কার একটা জিনিসকে বিচার যেন না করি । ইসলামকে যদি বিচার করতেই হয়, কুর্‌আনের কাছে ফিরে যেতে হবে ।

ইলাহ্‌ যে শুধু কোন বস্তুগত জিনিস হবে এমন অবশ্যই না । ইলাহ্‌ হতে পারে । মানুষের চিন্তাধারা, কোন আইডিয়া, পরসমালোচনা কে ভয় করা ইত্যাদি । যদি আমরা সুদ দেই অথবা নিই, তাহলে আল্লাহ্‌র কাছে আমরা অপরাধী হব । কারণ, সুদ দিতে অথবা নিতে আল্লাহ্‌ কুর্‌আনে সরাসরি নিষেধ করেছেন । কিন্তু আমরা যদি বলতে থাকি, আরে ধুর, সুদ ছাড়া হয় নাকি । সুদ ছাড়া আধুনিক অর্থনীতি চিন্তাই করা যায় না । কিংবা ১০ বছর পর ছেলেমেয়ের বিয়ের জন্য ডিপিএস করে টাকা জমাই, মানে সুদ নিই, এবং ভাবতে থাকি, এরকম না করলে ছেলেমেয়ের বিয়ে বা পড়াশোনা হবে কিভাবে ? তাহলে আমরা আসলে সরাসরি আল্লাহ্‌কে চ্যালেঞ্জ করছি । আল্লাহ্‌, যে সব কিছু সৃষ্টি করেছেন, এই মহাবিশ্বের সবকিছুই যার, তিনি যখন আমাদেরই ভালোর জন্য সুদ নিতে বা দিতে নিষেধ করেছেন, তখন আমরা বলছি, সুদ ছাড়া ব্যাংকিং এর কথা ভাবতেই পারছি না । আমরা এত অহংকারী যে, আল্লাহ্‌ সরাসরি আমাদেরকে একটা জিনিস করতে না করছেন, আর আমরা বলছি ধুর, সুদ ছাড়া চলে নাকি । এইখানে আমরা এইযে সুদ ছাড়া চলে নাকি, এই আইডিয়াকে ইলাহ্‌ হিসেবে গ্রহণ করছি এবং শির্‌ক করছি । এইখানে একটু খেয়াল করো, যখন আমরা কুর্‌আনের শিক্ষাটাকে মেনে নিচ্ছি, কিন্তু যেই কারণেই হোক, ভুল করে সুদ নিচ্ছি বা দিচ্ছি, এবং বিশ্বাস করছি যে এটা খারাপ, তখন আমরা অপরাধ করছি, কিন্তু শির্‌ক করছি না । কিন্তু যখন আল্লাহ্‌র দেয়া আইডিয়াকে আমরা পাত্তাই দিচ্ছি না, সুদের ঊপর ভিত্তি করে অর্থনীতিটাকে গড়ে তুলছি, তখন আমরা শির্‌ক করছি ।

এই একই ধরণের চিন্তাভাবনা অনেক ক্ষেত্রেই করা যায় । আল্লাহ্‌ সরাসরি আমাদেরকে হিজাব করতে বলেছেন । আমরা যদি না করি, সেইটা আমাদের অপরাধ । কিন্তু আমরা যদি বলি এবং ভাবতে শুরু করি যে, আরে কিসের হিজাব, কোন দরকারীই নাই । সেইক্ষেত্রে আমরা শির্‌ক করছি । অনেকক্ষেত্রে, অত্যধিক ভালবাসাকেও ইলাহ্‌ বলা যায় । অনেকক্ষেত্রে আমরা কোন মেয়ের প্রেমে দেবদাস হয়ে যাই । বলে থাকি, ও যদি না থাকে, তাহলে জীবনটা রেখে আর কি হবে ? একটা মেয়ের জন্য এই চমত্‌কার জীবনটা অর্থহীন মনে হওয়ার যেই আইডিয়াটা সেই আইডিয়াটাও ইলাহ্‌ এবং আমরা যখন এই ইলাহ্‌কে গ্রহণ করছি, তখন আমরা শির্‌ক করছি ।

এমনকি মানুষের ষ্ট্যাটাসটাকেও অনেক সময় ইলাহ্‌ বলা যায় । ষ্ট্যাটাসটা অনেকটা টাকার মতোই কাজ করে । আমরা মনে করি, ষ্ট্যাটাস আমাদের সন্মান বৃদ্ধি করবে । কিছু কিছু অজ্ঞ মানুষ হয়তো টাকা বা ষ্ট্যাটাসের উপর অন্য মানুষকে বিচার করে থাকে এবং যাদের টাকা বা ষ্ট্যাটাস আছে, তারা হয়তো মাঝে মাঝে তাদের কাছ থেকে সন্মান পেয়ে থাকে, কিন্তু কোন মানুষটা কোন অজ্ঞের কাছ থেকে সন্মান পেয়ে খুশী হতে চায় !

এবং ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে সবচেয়ে ভয়ানক যেটা মনে হয়, সেটা হল, লোকে কি ভাববে, সেটা ভাবা । কিংবা আরে সবাই করে আমি না করলে, কেমন দেখা যায় । লোকে কি ভাববে সেইটা ভাবা যে একদমই ভুল, আমি সেটা বলছি না । কিন্তু আল্লাহ্‌ যখন একটা জিনিস করতে বলছেন, তখন পাছে লোকে কিছু ভাবে এর ভয়ে আল্লাহ্‌ এর আদেশ পালন না করাটা হচ্ছে শির্‌ক । এই ক্ষেত্রে নামাযের উদাহরণটা দেয়া যায় । ধরা যাক, আমি কোন গেদারিং এ আছি । সেখানে কেউ নামায পড়ছে না । আমি সাধারণত নামায পড়ি । এখন তাদের কেউ পড়ছে না বলে যদি আমি মনে করি যে, তারা কি ভাববে ? এবং সেই কারণে, তারা কি ভাববে এই জিনিসটার কারণে যদি আমি তখন আল্লাহ্‌র আদেশ নামায না পড়ি, তাহলে আমি তখন আল্লাহ্‌র সাথে অন্যদের ভাবনাকে শরীক করছি । ঠিক বিপরীত জিনিসটাও বলা যায় । ধরি, আমি ঠিকমত নামায পড়ি না । এবং ধরলাম আজকে দুপুরে আমার নামায পড়ার কোন ইচ্ছা ছিল না । কিন্তু আমার কয়েকজন বন্ধু এসে আমাকে নামাযের জন্য ডাকল । আমার ইচ্ছা ছিল না, অথচ তাদের ডাকের জন্য বা তারা কি ভাববে, সেই কারণে নামায পড়লাম । তাহলে আমি শির্‌ক করলাম । এই ক্ষেত্রে আমি নামাযটা পড়েও শির্‌ক করলাম । কারণ, এই নামাযটা আমি আল্লাহ্‌র জন্য না, ঐ বন্ধুদের জন্য বা তাদেরকে দেখানোর জন্য পড়েছি । এই ক্ষেত্রে আমি যদি নামাযটা না পড়তাম, তাহলে অপরাধ করতাম, কিন্তু শির্‌ক তো করতাম না ।

কাজেই ইলাহ্‌ হতে পারে কোন মূর্তি, মানুষের কথার বা সমালোচনার ভয়, টাকা, স্ট্যাটাস, কোন আইডিয়া যেখানে আল্লাহ্‌র আদেশের অমান্য করা হয় ইত্যাদি অনেক কিছুই । ইবাদত করা(to worship) করা বলতে আমাদের অনেকেরই ধারণাটা পরিষ্কার না । এই নিয়ে একটা হাদীস বলি, তাহলে হয়তো ইবাদতের অর্থটা কিছুটা পরিষ্কার হবে । একজন লোক খ্রীষ্টান থেকে মুসলমান হয়েছিল । কোন এক কথার সাপেক্ষে সে একবার বলেছিল, হে রাসুলুল্লাহ্‌, আমরা তো আমাদের যাজকদের ইবাদত করতাম না । তখন রাসুলুল্লাহ্‌ বলেছিলেন, তোমরা কি এমন কিছু করতে না যা আল্লাহ্‌ না করেছে এবং যাজকেরা হ্যাঁ করেছে এবং তোমরা যাজকদের মান্য করেছ । আবার তোমরা কি এমন কিছু কর নি যেটা আল্লাহ্‌ হারাম করেছে এবং তারা(যাজকেরা) হালাল করেছে এবং তোমরা সেইটা হালাল হিসেবে মেনে নিয়েছ । তখন লোকটা বলল, হে রাসুলুল্লাহ্‌ আমরা তা করতাম । তখন রাসুলুল্লাহ্‌ বললেন, এভাবেই তোমরা সেই যাজকদের পূজা বা ইবাদত করতে । আর এভাবেই তারা আল্লাহ্‌র সাথে সেই যাজকদের শির্‌ক করত ।

আমরা মুসলমানেও যদি ভেবে দেখি, তাহলে আমরাও প্রতিনিয়ত শির্‌ক করে যাচ্ছি অর্থাৎ, লা ইলাহ্‌ ইল্লাল্লাহ্‌ ভঙ্গ করে যাচ্ছি । শুধু অমুসলিমরাই যে, লা ইলাহ্‌ ইল্লাল্লাহ্‌ মানে না তা না, আমরাও তা করি ! আল্লাহ্‌ আমাদের সঠিক পথ দেখান । আমীন ।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: