সূরা হুমাযাহ আপনাকে আমাকে নিয়েই কথা বলছে

পুরনো বান্ধবীর সাথে ফোনে কথা বলছি, অন্যরা কে কেমন আছে খোঁজ নিচ্ছি। চট করে ওপাশ থেকে বলে ফেলল, ‘জানিস সিমির বিয়ে হয়েছে, জামাইটা দেখতে একদম সুন্দর না।’ অথবা ‘রিদিমা কীইইই মোটা হইসে দেখসিই্ইস……’ অথবা ‘আমার শাশুড়ির কাজকাম দেখলে মেজাজটা এমন খারাপ হয়..’. ছেলেদের বেলায় ‘শাফিন কি এখনো ওই ১২,০০০ টাকার চাকরিই করে?’ ‘দুইদিন পরপর জিএফ চেঞ্জ করে কেন?’ ‘পোলাটার ভাবস মারা আর শেষ হইলনা।’

‘বাহ! সে করতে পারবে আর আমি বলতে পারবনা?’
– জ্বী না। সে কিছু করলেই পাড়ায় পাড়ায় বলে বেড়ানোর অধিকার আপনাকে কেউ দেয়নি।
‘আহা! পাড়ায় পাড়ায় বলব কেন? আমরা আমরাই ত, নিজেদের মধ্যে আলোচনা করা যাবেনা?’
– যাবে! যাবে না কেন? আপনি চাইলে কে নিষেধ করেছে? মদ ও খাওয়া যাবে, পরকীয়াও করা যাবে, মানুষ খুন ও করা যাবে। খালি শাস্তির চিন্তাটা মাথায় না থাকলেই হল।

বাংলাদেশের আড্ডার প্রিয় উপকরণ হচ্ছে চা আর বিটলামী। হো হো হাসি চালায় যাওয়ার জন্য একেকজনকে টার্গেট করা হয়, তার মাথার টাক, কথার অ্যাক্সেন্ট, পেটের মেদ থেকে শুরু করে বারো-চোদ্দ বছর আগেকার অতীব লজ্জাস্কর ঘটনা পর্যন্ত তুলে হাসাহাসি করা হয়। বাই চান্স, কোন ভাবে, কোন কথায়, কারো কোন ফেসিয়াল এক্সপ্রেশনে যদি সে কষ্ট পেয়ে যায়, তাহলে বিদ্রুপকারীর জন্য তিন লেভেলে অভিশাপ আছে।

১. তার অভিশাপ, যে কষ্ট পেল

২. সে যদি অভিশাপ নাও দেয়, তার কষ্ট পাওয়াটা নিজেই একটা অভিশাপ

৩. সেই মানুষের হয়ে আল্লাহ বিদ্রুপকারীকে অভিশাপ দেন।

তাহলে কি ফান করা বন্ধ করে দিতে হবে? না! তবে পচানো বন্ধ করে দিতে হবে, অথবা পচানোর এমন আর্ট আবিষ্কার করতে হবে যে পচানো হবে, কিন্তু কেউ পচবে না।

মানুষের আরেকটা চমৎকার স্টাইল হচ্ছে খোঁচা দিয়ে চরম অপমানজনক একটা কথা বলা, কিন্তু এমনভাবে, যে রিঅ্যাক্ট করলে উল্টো হাসির পাত্র হতে হবে। বা যদি বুকে সাহস নিয়ে রিঅ্যাক্ট করেই ফেলা হয়, উড়ায় দিয়ে বলবে, ‘আমি ত মজা করতেসিলাম, ফান ও বুঝিস না?’ এই আচরণটা ‘লুমায’ শব্দের আন্ডারে পড়ে। যারা এই অসাধারণ শিল্পটাকে আয়ত্ত করেছেন, তাদেরকে আবারো মনে করিয়ে দেই, ‘লুমায’ এর মধ্যে শুধু দু’জন ব্যক্তি জড়িত না, আল্লাহও জড়িত। আল্লাহ খুব ভালভাবেই জানেন কোনটা নির্দোষ ফান আর কোনটা ‘লুমায’।

গালি দেয়া ‘লুমায’, এমনকি যদি মিন করে নাও বলা হয়। ইউনিভার্সিটিতে রাশি রাশি গালি শিখেছি, এখন আর কাজে লাগাতে পারিনা, আফসোস্।

কেউ একজন একটা কথা খুব আগ্রহ নিয়ে বলল, সবাই মিলে সেটা হেসে উড়ায় দিল বা হালকা করে দিল, মানুষটা একটু দমে গেল, এটাও হুমায বা লুমায। কিছু কিছু মানুষের স্বভাবই আছে, সব কিছু নিয়ে হাসিঠাট্টা করবে, সবসময়। আবার কিছু মানুষ বলার সময় খুব মন দিয়ে শুনবে, ভালভাবে রেসপন্ড ও করবে। আড়ালে অন্যদের সাথে হাসির ফোয়ারা তুলবে। আড়ালে মানুষটার প্রতি যে অন্যায় করা হল তার প্রতিশোধ নিতে আল্লাহ নিজে তাদের জন্য আগুনের অভিশাপ দিয়েছেন।

কথা বলার সময় একটা তাচ্ছিল্যের ভাব দেখানো হুমায বা লুমায। চোখ কুচকায় বিরক্তি সহকারে তাকানো, বা এমন ভাব করা যে কী ফালতু কথা বলছে – এটাও হুমায বা লুমায।
সূরা হুমাযাহ আপনাকে আমাকে নিয়েই কথা বলছে।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: