ইহসান

ইহসান ‘হুসন’ শব্দ থেকে এসেছে। যার আভিধানিক অর্থ হচ্ছে সুন্দর ব্যবহার। মহান আল্লাহতায়ালার প্রতি এবং তাঁর সৃষ্টির প্রতি যাবতীয় কর্তব্য সুন্দর ও উত্তমরূপে সম্পাদন করার নামই ইহসান।

রাসূলুল্লাহ সাঃ বলেছেন, ‘তুমি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে, যেন তুমি তাঁকে দেখছ, আর তুমি আল্লাহকে দেখতে না পেলেও তিনি তোমাকে দেখছেন।’ (মুসলিম)

ইহসান মানব চরিত্রের অমূল্য সম্পদ। কুরআনে কারিমে বলা হয়েছে, ‘তোমরা ইহসান করো। কেননা আল্লাহতায়ালা ইহসানকারীদের ভালোবাসেন।’ (সূরা বাকারাঃ ১৯৫) আল্লাহতায়ালা আরো বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ইহসানকারীদের সাথে আছেন।’ (আনকাবুতঃ ৬৯)
ইহসানের মতো মহৎগুণ ব্যতীত প্রকৃত মুমিন হওয়া যায় না। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘ইহসানকারীরূপে যে ব্যক্তি পূর্ণাঙ্গভাবে আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করে সে ব্যক্তি দৃঢ়ভাবে মজবুত হাতল ধারণ করেছে।’ (লুকমানঃ ২২)। ইহসানের বিনিময়ে আল্লাহতায়ালা দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ দান করেন। এ সম্পর্কে আল্লাহর বাণীঃ ‘উত্তম কাজের জন্য উত্তম পুরস্কার ছাড়া আর কী হতে পারে।’ (রাহমানঃ ৫৫)। মূল কথা ইবাদাতের চূড়ান্ত পর্যায় হলো ইহসান।
ইহসানকারী সাধারণত উন্নত চরিত্র, চরিত্র মাধুর্য, মহানুভবতা, সহনশীলতা, পরশ্রীমুখর, ব্যক্তিস্বার্থ বা আত্মত্যাগের মানসিকতাসম্পন্ন ব্যক্তি হয়ে থাকেন। ফলে তার চিন্তাধারায় পরিচ্ছন্নতা, স্বভাবে প্রশান্তি, মেজাজে ভারসাম্য, চরিত্রে পবিত্রতা, আচরণে মাধুর্যতা, ব্যবহারে নম্রতা, লেনদেনে সততা, কথাবার্তায় সত্যবাদিতা, ওয়াদা ও অঙ্গীকারের দৃঢ়তা, সামাজিক জীবনযাপনে সদাচার, কথাবার্তায় চিন্তার ছাপ, চেহেরায় পবিত্রতার ভাব ফুটে ওঠে। মোট কথা, তার সামগ্রিক জীবনব্যবস্থায় বৈপ্লবিক একটা পরিবর্তন সূচিত হয়। যে জীবনধারার কোথাও কোনো অন্ধকার ও অসঙ্গতি পরিলক্ষিত হয় না। এরা কখনো আত্মপূজারী, স্বার্থবাদী, স্বার্থান্ধ ও পরশ্রীকাতরতাকে প্রশ্রয় দেন না।
মুহসিন ব্যক্তির পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক জীবনের প্রতিটি কাজ ও কথায় বিশেষত্ব পরিলক্ষিত হয়। একজন পূর্ণাঙ্গ মুমিন বা মুসলিম এবং একজন মুহসিনের পার্থক্য হলো এই যে, একজন মুমিন ও মুসলিম জীবনের প্রতিটি কাজ আল্লাহর মর্জি মোতাবেক পালন করেন, কোথাও দুর্বলতা নেই এবং খুলুছিয়াত বা আন্তরিকতারও অভাব নেই। কিন্তু প্রতিটি কাজের সৌন্দর্য ও সুচারুতা বলতে একটি কথা আছে। মুহসিন ব্যক্তি মুমিন ও মুসলিমের মতো জীবনের প্রতিটি কাজ আল্লাহর মর্জি মোতাবেক পালন তো করবেনই সেই সাথে তার প্রতিটি কাজের সৌন্দর্য ও সুচারুতা থাকবে। অর্থাৎ প্রতিটি মুহসিন মুমিন কিন্তু প্রতিটি মুমিন মুহসিন নয়।

যারা আল্লাহর দিকে আহ্বানকারী তাদেরকে এ মানে পৌঁছা একান্ত জরুরি। যুগে যুগে আম্বিয়ায়ে কেরাম এবং তাদের সাথীরা এ মানে পৌঁছতে পেরেছিলেন। যার ফলে তাদের জানের শত্রুরাও তাদের চরিত্র মাধুর্যে মোহিত হতে বাধ্য হয়েছে। আল্লাহর দিকে ডাকা সর্বোত্তম কাজ হওয়ার কারণ কী? কারণ যিনি খালেছভাবে আল্লাহর পথে মানুষকে ডাকার ইচ্ছা পোষণ করেন, তিনি সর্বপ্রথম নিজ চরিত্রে কিছু অবশ্যম্ভাবী পরিবর্তন নিয়ে আসেন। দাওয়াতি কাজই তাগিদ প্রদান করবে যেন দায়ী নিজের চরিত্রকে নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্য দ্বারা সুসজ্জিত করেন। আল কুরআনেরই শিক্ষা অনুযায়ী আহ্বানকারীর প্রথম বৈশিষ্ট্য হবে, তিনি শিরকমুক্ত জীবনযাপন করবেন। কারণ আল্লাহর দিকে আহ্বানকারীর প্রথম দাওয়াতই হলোঃ হে মানবমণ্ডলী, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো দাসত্ব, আনুগত্য ও উপাসনা করবে না। ভয় একমাত্র তাঁকেই করতে হবে। তিনি একক ও অদ্বিতীয়। তাঁর আর শরিক নেই। চাওয়া-পাওয়া, কামনা-বাসনা তাঁকে ছাড়া অন্য কারো কাছে করা যাবে না।

দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য আমলে সালেহ দ্বারা নিজকে সুশোভিত করবেন। কারণ দায়ীর নিজ চরিত্রই যদি পরিশুদ্ধ না হয়, তবে তার দাওয়াতের মাধ্যমে সমাজ কখনো প্রভাবিত হবে না। তাই দায়ী ইল্লাল্লাহ নিজেকেই সর্বপ্রথম পরিচ্ছন্ন চরিত্র দ্বারা রাঙাবেন।

তৃতীয় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে¬ দায়ী একজন আপসহীন ও সৎসাহী ব্যক্তিত্ব হবেন। আল্লাহর কাজে লজ্জা, সঙ্কোচ, ভয়ভীতি কোনো কিছু তাঁকে স্পর্শ করবে না। চরম বিরোধিতার মুখেও নিকৃষ্টতম শত্রুদের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে অকুতোভয়ে বলবে ‘আমি মুসলমান’।
জাফর আহমাদ
(কিছুটা ছোট পরিসরে)

2 responses to this post.

  1. Posted by dinidawah on December 25, 2012 at 4:56 am

    ভালো লাগলো।

    Reply

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: