প্রযুক্তি মুসলমানদের হারানো সম্পদ

আধুনিক যুগ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগ। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে যারা যত সমৃদ্ধ তারা তত উন্নত ও শক্তিধর। বর্তমানে মুসলমানরা পৃথিবীতে সংখ্যাগরিষ্ঠতার দিক থেকে দ্বিতীয় হলেও বাস্তবে জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে অন্য ধর্মাবলম্বীদের থেকে অনেক পিছিয়ে রয়েছে।
অথচ বিজ্ঞান, গণিত, অর্থনীতি, চিকিৎসা, সাহিত্যসহ আরো অনেক শাস্ত্রে মুসলমানরাই সর্বপ্রথম অগাধ জ্ঞান লাভ করেছিল। মুসা আল খাওয়ারিজমি, ইবনেসিনা, জাবির ইবনে হাইয়ান, আবু বকর আল রামি, হাসান ইবন হাইসাম, আল বিরুনি, ইমাম বোখারি, ইবন জারির তাবারি, ইমাম গাজ্‌জালি, ওমর খৈয়াম, কবি ফেরদৌস প্রমুখ ব্যক্তি বিভিন্ন বিষয়ে অসামান্য অবদান রেখে গেছেন। কিন্তু বর্তমান মুসলমানরা জ্ঞান আহরণের অভাবে কুসংস্কারসহ বিভিন্ন গোঁড়ামির কারণে সেসব ইতিহাস ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলেছেন। মহানবী সাঃ-এর ইন্তেকালের পর তার আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে মুসলমানরা জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চাকে আরো মহিমান্বিত করে তোলেন। জ্ঞানের দীপশিখা হাতে নিয়ে পৃথিবীর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েন। প্রতিষ্ঠা করেন অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিজ্ঞানাগার। স্রষ্টা জীবন-প্রকৃতি সব কিছু নিয়েই গবেষণা করতে নির্দেশ দিয়েছেন।
‘তোমরা যে বীজ বপন করো সে বিষয়ে ভেবেছ কি?’ (সূরা ওয়াকিয়া-৬৩)।
‘তোমরা যে পানি পান করো সে বিষয়ে চিন্তা করেছ কি?’ ‘(সূরা ওয়াকিয়া-৬৮)।
‘আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি বিষয়ে এবং দিন ও রাতের আর্বতনে সেসব বুদ্ধিমান লোকদের জন্য অসংখ্য নিদর্শন রয়েছে, যারা উঠতে বসতে ও শুতে সর্বাবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে এবং আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি এবং গঠন সম্পর্কে চিন্তা ও গবেষণা করে। তারা বলে ওঠে হে আল্লাহ, তুমি এর কোনো কিছু বৃথা সৃষ্টি করোনি।’ (সূরা আল ইমরান, আয়াত ১৯০-১৯১)।
মানব কল্যাণের বাহক সব ধরনের এলেমই জরুরি। মানবতার কল্যাণ হবে এমন সব ধরনের এলেমই ইসলামে কাম্য। ‘প্রত্যেক মুসলমানের ওপর জ্ঞান অন্বেষণ করা ফরজ।’ ‘দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত জ্ঞান অন্বেষণ করো।’ মহানবী সাঃ-এর বাণী সবার জন্য প্রযোজ্য।
তাই ধর্মীয় জ্ঞানের সাথে সাথে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিসহ ব্যবহারিক জীবনের জ্ঞান অর্জনও অতীব জরুরি। পৃথিবীতে সর্বপ্রথম শিক্ষাদীক্ষায় বেশি প্রসার ঘটেছিল স্পেন ও ইরাকের বাগদাদে। কিন্তু এখন সেসব দেশের মুসলমানদের কাছেও শিক্ষা-দীক্ষা অবহেলার বস্তুতে পরিণত হয়েছে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগে ইরান ও মালয়েশিয়ার মতো কয়েকটি দেশ ছাড়া আর সব মুসলিম দেশের অবস্থা হতাশাব্যঞ্জক। গ্রহ-গ্রহান্তরে বিভিন্ন মহাশূন্যযান প্রেরণ করে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে মহাশূন্যে বসতি স্থাপনের চেষ্টা করছে আমেরিকা, রাশিয়া। চীন ও জাপান প্রযুক্তিগত উন্নতির মাধ্যমে বিশ্ববাণিজ্যে অভাবনীয় আধিপত্য বিস্তার করছে অথচ মুসলিম দেশগুলোর কোনো বিষয়েই উল্লেখযোগ্য কোনো ভূমিকা নেই। প্রাকৃতিক সম্পদ গ্যাস, তেল, ইউরেনিয়াম থাকা সত্ত্বেও উন্নত প্রযুক্তির অভাবে বাংলাদেশ গরিব দেশ। যেমন আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ আইভরি কোস্ট, ইথিওপিয়া, সিয়েরালিওন, সোমালিয়ায় অনেক প্রাকৃতিক সম্পদ আছে কিন্তু উন্নত প্রযুক্তি নেই বিধায় গরিব দেশের তালিকায় পড়ে রয়েছে। এ দিকে প্রাকৃতিক সম্পদ তেমন না থাকলেও উন্নত প্রযুক্তি থাকার কারণে সিঙ্গাপুর, ফিনল্যান্ড, সুইডেন, জার্মানি প্রভৃতি দেশ অনেক উন্নত। বর্তমানে চীন ও জাপানের প্রযুক্তি সবচেয়ে উন্নত। তাই কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ জমিতে যে পরিমাণ ফসল উৎপন্ন হয় জাপানে একই পরিমাণ জমিতে চার গুণ আর চীনে তিন গুণ ফসল উৎপন্ন হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে যে ইউরেনিয়াম পাওয়া গেছে তা উঠাতে পারলে বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম একটি ধনী দেশে পরিণত হবে। কিন্তু উঠাবে কিভাবে, আমাদের তো সে রকম প্রযুক্তি নেই। বরং পাট শিল্পের মতো বিশাল শিল্পকে আমরা প্রযুক্তির অভাবে ধ্বংস করে ফেলেছি। এভাবে চললে বাংলাদেশসহ সব মুসলিম রাষ্ট্রগুলো ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হতে বাধ্য। এ দোষ কার! স্রষ্টার, না আমাদের! মুসলমানরা বিভিন্ন বিষয়ে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে কিন্তু চেষ্টা, পরিশ্রম ও গবেষণা করে না। মসজিদে, মাদ্রাসায় দারিদ্র্য দূরীকরণের কর্মসংস্থান সৃষ্টির কোনো ভূমিকা নেই। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত শিক্ষার প্রতি কোনো উৎসাহ উদ্দীপনা লক্ষ করা যায় না। অলস, অকর্মণ্য আর পরনির্ভরশীল হওয়ার শিক্ষা ঠিকই চলছে। ইহকালের বাস্তবতাকে ভুলে পরকালের সুখ স্বপ্নে বিভোর হয়ে পড়েছে। ফলে মুসলমানরা জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, চিকিৎসা, খেলাধুলা, অর্থনীতি, সমাজনীতি, রাজনীতি সব ক্ষেত্রেই পিছিয়ে পড়ছে।
ইবাদতের উছিলায় খানকায় বা মসজিদে বসে থেকে স্বেচ্ছায় দরিদ্রতা বরণ করে নিতে, লোকদের কাছে হাত পেতে ভিক্ষা চাইতে বা মানুষের সাহায্যের ওপর বেঁচে থাকতে বলেনি ইসলাম। অলসতা আর ভিক্ষাবৃত্তির শিক্ষা ইসলামে নেই। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় ইসলামের শিক্ষা কর্মের শিক্ষা, চিন্তা ও গবেষণার শিক্ষা।
‘যখন নামাজ শেষ হয়ে যায় তখন তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ো, আর আল্লাহর অনুগ্রহ তথা জীবিকা অন্বেষণ করো।’ (সূরা জুমআ, আয়াত-১১)। ধর্মকর্মও করতে হবে আবার আমলে সালেহও করতে হবে। ‘যারা ঈমান এনেছে এবং আমলে সালেহ (সৎ কাজ, ভালো কাজ বা মানবকল্যাণ) করেছে তারাই জান্নাতি।’
আমাদের মনে রাখতে হবে, আল কুরআনে প্রায় সাড়ে সাত শ’ আয়াত রয়েছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পর্কিত। আজ ধর্মীয় গোঁড়ামি, কুসংস্কার ও মূর্খতাকে ঝেড়ে ফেলে মুসলমানদের উচিত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষা, গবেষণাসহ সর্ববিষয়ে অগাধ জ্ঞান লাভ করে শির উঁচু করে দাঁড়ানো। তাহলেই মুসলমানদের তাদের হারানো ঐতিহ্য, শৌর্য-বীর্য এবং ক্ষমতা ফিরে পাওয়া সম্ভব হবে। নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য নিজেরাই সচেষ্ট হতে হবে। ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো জাতির ভাগ্য পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের ভাগ্য নিজেরা পরিবর্তনে সচেষ্ট হয়।’ (সূরা জুমআ, আয়াত-১১)।

সুত্রে (সংখেপিত)
http://islamicbanglabd.blogspot.com/2008/11/blog-post_3899.html

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: