সিদ্দিকে আকবর হযরত আবু বকর (রাঃ)

বিরোধী কোরায়েশদের অত্যাচার ও নির্যাতনের মাত্রা অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছুলে হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) হিজরত (দেশ ত্যাগ) করার আদেশ প্রাপ্ত হন। তিনি বিষয়টি হযরত আবু বকরকে অবহিত করেন। হযরত আবু বকর এ হিজরতে মোহাম্মদ (সাঃ)-এর সাথী হতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। সময় ও সুযেগে বুঝে এক রাতে তারা উভয়ে দেশ ত্যাগ করেন। পথিমধ্যে সত্তর নামক গহীন পর্বত গুহায় তারা আশ্রয় নেন। এ গুহায় অপ্রশস্ত মুখের বাধা দূর করে হযরত আবু বকর প্রথমে এতে প্রবেশ করেন এবং নিরাপদ স্থান নির্ধারণ করে হযরত মোহাম্মদ (সাঃ)-কে নির্বিঘ্নে ও নির্ঝাঞ্ঝ্বাটে এর অভ্যন্তরে প্রবেশ করার পথে সুগম করে দেন। শত্রম্নপক্ষ যখন তাদের অনুসন্ধানে গুহার আশেপাশে তল্লাশি শুরু করে তখন ধরা পড়ার ভয়ে হযরত আবু বকর শংকিত, ভীত ও বিচলিত হয়ে পড়েন। হযরত মোহাম্মদ (সাঃ)-তাকে এ বলে প্রবোধ দেন ভীত হয়ো না, আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনের বর্ণনা , যদি তোমরা তাকে সাহায্য না কর, তবে আল্লাহ তো তাকে সাহায্য করেছিলেন যখন কাফেরগণ তাকে বহিষ্কার করেছিল এবং সে ছিল দুইজনের দ্বিতীয়জন, যখন তারা উভয়ে গুহার মধ্যে ছিল, সে তখন তার সাথীকে বলেছিল, বিষণ্ন হয়ো না, আল্লাহতো আমাদের সাথে আছেন।’ ৯ঃ৪০ লক্ষণীয় ব্যাপার যে, পরোক্ষভাবে হযরত আবু বকরের প্রসঙ্গ পবিত্র কোরআনে এভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়ে আছে। গুহায় বিদ্যমান গর্তগুলো বন্ধ করা গেলেও একটি গর্ত অরক্ষিত থেকে যায়। হযরত আবু বকর (রাঃ) সেই গর্তটিকে স্বীয় পদদ্বয় দ্বারা আটকিয়ে রাখেন। ঘটনাক্রমে, সেই গর্তে ছিল একটি সাপ, সেই সাপটি বের হওয়ার আশায় হযরত আবু বকরের পা দংশন করে যাচ্ছিল। তার জানুর উপর নিদ্রিত মোহাম্মদ (সাঃ)-এর পাছে না ঘুমের ব্যঘাত ঘটে এ ভেবে তিনি পা সরাচ্ছিলেন না। যন্ত্রণা কাতর হযরত আবু বকরের অশ্রু রাসুল (সাঃ)-এর উপর পড়তেই তিনি জেগে উঠেন এবং সমস্ত বিষয় অবগত হন। [সূত্রঃ সারেদুল সুরসালীনঃ ১ম খন্ড পৃঃ ৩৯০] মাওলানা আবদুল মালেক। আত্মত্যাগের এমন মহৎ দৃষ্টান্ত সত্যি আমাদের মুগ্ধ করে।

হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) যখন তার মেরাজের (আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে ঊর্ধ্বাকাশে নৈশ ভ্রমণ) অলৌকিক ঘটনা সাহাবীদের নিকট বর্ণনা করছিলেন তখন তাদের অনেকেই এর সত্যতা সম্বন্ধে সংশয়াচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। তারা হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর শরণাপন্ন হন। হযরত আবু বকরের (রাঃ) নিকট যখন বিষয়ের বিবরণ প্রকাশ করা হয়, তখন তিনি এর প্রতিটি ঘটনাকে সত্য বলে গ্রহণ করেন এবং নির্দ্বিধায় মনে-প্রাণে সবকিছু বিশ্বাস করে নেন। এ ঘটনার প্রেক্ষাপটেই তিনি ‘সিদ্দীক’ বা সত্যবাদী উপাধিতে ভূষিত হন। [সূত্রঃ সাইয়েদুল মুরসালীন ১ম খন্ড, পৃঃ ৩০২ আবদুল খালেক।]

হযরত মোহাম্মদ (সাঃ)-এর মৃত্যুর পর দেখা দেয় খলিফা নির্বাচনের সমস্যা। ইসলামের এই সংকটময় মুহূর্তে হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর ভূমিকা সত্যিই প্রশংসার দাবী রাখে। হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) ওফাতকে যখন সাহাবীগণ এমনকি হযরত উমর পর্যন্ত মেনে নিতে পারেনি, তখন হযরত আবু বকর (রাঃ)-তাদেরকে এই বলে শান্ত করতে পেরেছিলেন যে, ‘তোমরা যারা রাসুলের ইবাদত কর তারা জেনে রাখ যে তার মৃত্যু হয়েছে। আর যারা আল্লাহর ইবাদত কর তারা জেনে রেখ যে তিনি চিরজীবী। তোমরা কোরআনের সেই আয়াত স্মরণ কর আর মোহাম্মদ একজন রসুল বৈ তো নয়। তার পূর্বে বহু রসুল অতিবাহিত হয়ে গেছেন। তাহলে তিনি যদি মৃত্যুবরণ করেন অথবা নিহত হন, তবে তোমরা পশ্চাদপসরণ করবে।—— ৩-১৪৪।

রাসুল (সাঃ)-এর দাফন-কাফন কার্য সমাধা হওয়ার পূর্বেই যখন খলিফা নির্বাচন সংকট তীব্র আকার ধারণ করে তখন হযরত আবু বকর (রাঃ)-কে দেখতে পাই সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী দৃঢ়চেতা জ্ঞানে বুৎপত্তিশীল একজন ব্যক্তি হিসেবে। নানা ঘাত-প্রতিঘাত পার হয়ে শেষ পর্যন্ত তিনি ঘোষণা দেন যে, আমার একপাশে রয়েছেন হযরত উমর অন্য পাশে আছেন হযরত আবু উবায়দা আপনারা যাকে খুশি নির্বাচন করে নিন। বলাবাহুল্য তারা উভয়েই হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর আনুগত্য স্বীকার করে তাকেই খলিফা হিসেবে নির্বাচিত করেন।

ইসলাম ধর্মের সম্প্রচার ও সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে খালিদ বিন ওয়ালিদের অবদান অনস্বীকার্য। তার অপূর্ব বীরত্ব ও রণকৌশল এবং বুদ্ধিমত্তায় ইসলামকে একযুগ এগিয়ে নিয়ে গেছে। কিন্তু, মালিকের বিধবা পত্নী বন্দী লায়লার সাথে তার বিয়েকে কেন্দ্র করে অনেক অভিযোগ ওঠে। হযরত উমর (রাঃ) এই অভিযোগের বশবর্তী হয়েই তাকে প্রধান সেনাপতির পদ থেকে অপসারণ করার জন্য হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর নিকট সুপারিশ করেন। হযরত উমর (রাঃ) একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। হযরত আবু বকর (রাঃ) খালিদের জন্য বিচলিত হলেন। পরে লায়লার স্বামী মালিক হত্যার কারণে এবং লায়লার সাথে তার বিবাহ সম্পর্ক বিষয় নিয়ে তিনি খালিদকে কৈফিয়ত তলব করেন। বলাবাহুল্য, খালিদের বক্তব্য এতই যুক্তিপূর্ণ ও জোরালো ছিল যে, হযরত আবু বকর (রাঃ) তাকে শাস্তি থেকে অব্যাহতি দেন এবং প্রধান সেনাপতির পদে বহাল রাখেন। হযরত আবু বকরের (রাঃ) বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতা সত্যি প্রশংসার দাবী রাখে।

হযরত আবু বকর (রাঃ) ছিলেন নিঃস্বার্থপরতার আদর্শ প্রতীক। তার সমস্ত অর্থ ধন সম্পদ সবই দীন দুঃখী বন্দী ও ক্রীতদাস-দাসীদের মুক্তির জন্য অকাতরে দান করে গেছেন। দানশীলতায় একবার রাসুল করীম (সাঃ) হযরত উমরকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আপনি স্বীয় পরিবারের জন্য কি রেখে এসেছেন? তিনি উত্তরে বলেছিলেন-উহারই ন্যায় অর্ধেক। হযরত আবু বকর (রাঃ)-কে বললেনঃ আপনি স্বীয় পরিবারের জন্য কি রেখে এসেছেন? হযরত আবু বকর (রাঃ) বললেনঃ আল্লাহ এবং তার রাসুলকে। নবী করীম (রাঃ) বললেনঃ আপনাদের পদমর্যাদা আপনাদের উত্তরের ভেতরই নিহিত।

চার খলিফার মধ্যে হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর মৃত্যুই স্বাভাবিক ছিল। ঠাণ্ডা জ্বরে আক্রান্ত হয়ে তিনি ক্রমে ক্রমে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। স্বাভাবিক ও অস্বাভাবিক মৃত্যুর মধ্যে পার্থক্য বোধগম্য নয় তবে মানুষ প্রকৃতিগতভাবেই স্বাভাবিক মৃত্যু কামনা করে। হযরত আবু বকর (রাঃ) কামনা করেছিলেন রাসুল (সাঃ)-এর মৃত্যু দিবসে তার যেন মৃত্যু হয়। হিজরী ১৩ সনের জমাদিউলসানী মাসে ২২ তারিখ, সোমবার তিনি তার কামনাকেই চরিতার্থ করে গেছেন। হযরত মোহাম্মদ (সাঃ)-এর পাশেই তাকে কবরস্থ করা হয়।

আপনাদের সকলের আনুগত্য প্রকাশের পর হযরত আবু বকর (রাঃ) উঠে দাঁড়ান। এ সময় সমবেত জনতার উদ্দেশে তিনি যে ভাষণ প্রদান করেন তা স্বচ্ছতা, প্রজ্ঞা এবং দূরদর্শিতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। মহান আল্লাহর প্রশংসার পরে তিনি বলেনঃ

ভাইসব, তোমরা আমাকে তোমাদের আমীর বা নেতা নির্বাচন করেছ। কিন্তু আমি তোমাদের চেয়ে উত্তম নই। আমি ভাল করলে তোমরা আমাকে সহযোগিতা করবে। মন্দ কাজ করলে আমাকে বারণ করবে। সত্য হচ্ছে আমানত মিথ্যা হচ্ছে খেয়ানত। তোমাদের দুর্বল লোকটি আমার নিকট শক্তিশালী, যতক্ষণ না তার ন্যায্য প্রাপ্য আমি তাকে প্রদান করতে পারি। তোমাদের নিকট শক্তিশালী লোকটি আমার নিকট দুর্বল, যতক্ষণ না তার নিকট থেকে প্রাপ্য আদায় করতে পxির। যে জাতি আল্লাহর পক্ষে জিহাদ বন্ধ করে দেয়, আল্লাহ তার ওপর অপমান চাপিয়ে দেন। যে জাতির মধ্যে নির্লজ্জতা ছড়িয়ে পড়ে, আল্লাহ তার উপর বিপদ-আপদ ও শাস্তি ব্যাপক করেন। যতক্ষণ পর্যন্ত আমি আল্লাহ ও তার রাসুলের অনুগত থাকব, তোমরা আমার প্রতি অনুগত থাকবে। আল্লাহ এবং তার রাসুলের অবাধ্যতামূলক কোন কাজ যদি আমার দ্বারা হয়, আমার অনুগত থাকা তোমাদের উপর বাধ্যতামূলক নয়। এখন নামাজের জন্য দাঁড়াও। আল্লাহ তোমাদের প্রাপ্তি অনুগ্রহ করুন।

Link
প্রফেসর মোহাম্মদ আবদুল হালিম
দৈনিক ইত্তেফাক, ০৪ জানুয়ারী ২০০৮
http://prothom-aloblog.com/users/base/samimsikder/1239
http://icchaghuri.blogspot.com/2011/04/blog-post_2622.html

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: