মর্যাদার মাপকাঠি

মানুষ শ্রেষ্ঠরূপে পৃথিবীতে আসে ঠিকই তবে এই শ্রেষ্ঠত্ব টিকে থাকে তার কৃতকর্মের উপর। কারণ সৃষ্টির সেরা হিসাবে দুনিয়াতে প্রেরণ করে আল্লাহ সবাইকে দুনিয়া থেকে শ্রেষ্ঠ হিসাবে নিয়ে যাবেন এ ব্যাপারে ওয়াদা করেননি। বরং মহান আল্লাহ তার প্রতি অবিশ্বাস পোষণকারীদের অসম্মান আর অমর্যাদার সর্বনিম্ন স্তরে পৌঁছে দিবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। যেমন আল্লাহ তা’য়ালা বলেছেন,
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ মানুষকে উত্তম অবয়বে সৃষ্টি করেছেন। এরপর তাকে নামিয়ে দিয়েছেন নিচু থেকে নিচু স্তরে। তারা ব্যতীত যারা ঈমান এনেছে এবং সৎ কর্ম করেছেন’ (সূরা-আতত্বীন)।
এখানে উত্তম অবয়ব বলতে গঠন প্রকৃতি, বুদ্ধিমত্তা, মর্যাদা ও সম্মান ইত্যাদি বিষয়কে বুঝায়। আর নিচু স্তরে নামানো বলতে অসম্মান-অমর্যাদা আর আযাব-গযব তথা ধ্বংসের সবচেয়ে নিচু স্তর বুঝানো হয়েছে। সুতরাং আল্লাহর বাণী অনুসারে মানুষের মর্যাদার একমাত্র মাপকাঠি হলো ঈমান গ্রহণ ও সৎকর্মের অধিকারী হওয়া। এখানে আল্লাহ তা’য়ালা বংশ মর্যাদা, টাকা-পয়সা, ডক্টরেট ডিগ্রি, রাজা-বাদশা হওয়া ইত্যাদিকে শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখার নিয়ামক ঘোষণা করেননি। পরিতাপের বিষয় আজকে এগুলোকে আমরা মানুষকে মূল্যায়নের নিয়ামক বলে গণ্য করি। যারফলে সৎকর্ম সমাজ থেকে দূরে চলে যায়। মধ্যযুগে বংশ মর্যাদা নিয়ে খুব একটা বাড়াবাড়ি থাকলেও বর্তমানে এর প্রভাব চাপা পড়ে গেছে আধুনিকতার ছোঁয়ায় কিছুটা, তবে পুরোপুরি নয়।
মহানবী (সা.) বিদায় হজ্বের ভাষণে বংশ মর্যাদাকে ভূলুণ্ঠিত করে দিয়েছেন। ইসলামে শুধু একটি ক্ষেত্র ব্যতীত অন্য বিষয়ে বংশ মর্যাদার মূল্যায়ন সম্পর্কে আমার জানা নেই। যে বিষয়ে বংশ মর্যাদার সামান্য আলোকপাত করা হয়েছে তা হলো কোন মুসলমান পাত্র বিবাহের সময় যেন পাত্রীর বংশ মর্যাদার বিষয়টি দেখে। এখানেও বংশ মর্যাদার উপরে দ্বীনদারীকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে।মহান আল্লাহর বাণী অনুসারে তারাই শ্রেষ্ঠ যারা ঈমান এনেছে এবং সৎ কর্ম করেছে।
বর্তমান ফেৎনা-ফ্যাসাদের জমানায় সৎকর্ম করা বড়ই কঠিন বলে মনে হয়। আজ অফিসের ছোট কর্তাকে ঘুষ সম্পর্কে প্রশ্ন করলে জবাব আসে বড় কর্তায় খায়, আমার না খেয়ে উপায় নেই। ব্যবসায়ীকে সততার কথা বললে জবাব আসে সৎ পথে ব্যবসা করলে চালান টেকানো দায়। আবার কাউকে দেখা যায় অর্থের লোভ চরিতার্থ করার জন্য এহেন কোন অপকর্ম নেই যা সে করতে দ্বিধা করবে না। মোট কথা পাপ ও পাপাচারে বর্তমান জমানা পরিপূর্ণ। এ জমানার ফেৎনা সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেছেন,
ফেৎনা ফ্যাসাদ হত্যার চেয়ে জঘন্য।
তাহলে এখন উপায় কি? উপায় অবশ্যই আছে, তা হল সকল মিথ্যাকে পরিত্যাগ করে সত্যকে আঁকড়ে ধরা। মানুষের ধ্বংসের মূলে রয়েছে মিথ্যা পক্ষান্তরে কল্যাণের দিকে ধাবিত করে সত্য। প্রিয় নবী (সা.) বলেছেন,
‘সত্য মানুষকে মুক্তি দেয় আর মিথ্যা ডেকে আনে ধ্বংস’।
এখন আমাদের খুঁজতে হবে সত্য আঁকড়ে ধরার উপায় আর মিথ্যা ত্যাগ করার গুণ কিভাবে অর্জন করা যায়। এ দু’টো গুণ অর্জন করতে হলে শুধু তাকওয়াবান অর্থাৎ আল্লাহকে ভয়কারী হওয়াই একমাত্র শর্ত। তাকওয়াবান হওয়াই যে মানুষের মর্যাদার মাপকাঠি রাসূল (সা.)-এর জমানার দিকে তাকালেই তা দেখা যায়। যে যত বেশি তাকওয়াবান ছিলেন সে তত বেশি সম্মানের অধিকারী ছিলেন। হযরত বিলাল (রা.) কালো চেহারার মানুষ ও হাবসী গোলাম ছিলেন অথচ শুধু ঈমান গ্রহণ আর অধিক তাকওয়াবান হওয়ার সুবাদে তিনি আল্লাহর নিকট, রাসূল (সা.)-এর নিকট, বিশ্ব মুসলমানের কাছে মর্যাদার আসনে আসীন। মহানবী (সা.)-বলেছেন,
‘তোমাদের মধ্যে সেই বেশি মর্যাদাবান যে বেশি তাকওয়ার অধিকারী।’ আসুন সকলে মিলে তাকওয়ার গুণ অর্জন করি এবং এর ভিত্তিতে মানুষকে মূল্যায়ন করি, যেন আল্লাহ আমাদের নাজাত দান করেন।

দৈনিক ইত্তেফাক, ২৭ জুন ২০০৮

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: