নামায : আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের উপায় ১৪তম পর্ব

নামাজ মুমিনের জন্য মেরাজস্বরূপ। যথাযথ নিয়ম মেনে ও আদব সহকারে যদি নামাজ আদায় করা যায় তাহলে মানুষের সমস্ত সৎগুণ নামাজীর মধ্যে বিকশিত হবেই। একজন প্রকৃত নামাজী কখনও কোনো অসম্মান নিজের জন্য ও কোনো মানুষের জন্য মেনে নিতে পারেন না। নামাজ ও দোয়া মানুষের মন এবং শরীরে বিস্ময়কর প্রভাব ফেলে। মানুষের আধ্যাত্মিক ও নৈতিক চেতনা জোরদার করে এই নামাজ। নামাজ ও দোয়ায় অভ্যস্ত ব্যক্তির চেহারার দিকে তাকালে দেখা যায় তার মধ্যে হিংসা ও মন্দ কাজের ছাপের পরিবর্তে সততার আলোকোজ্জ্বোল আভা ফুটে উঠেছে। এ ধরনের মানুষ যে তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে খুবই সচেতন এবং তারা যে অন্যদের কল্যাণকামী তা-ও তাদের সৌম্য, প্রশান্ত ও পবিত্রতায় প্রদীপ্ত উজ্জ্বল চেহারাই বলে দেয়। এ ধরনের মানুষ তথা নামাজী হন নির্মল মনের অধিকারী, আচরণে বিনয়ী, প্রশান্ত-চিত্ত, ভয়-ভাবনাহীন প্রফুল্ল বা ফুরফুরে মেজাজসম্পন্ন, প্রবল আত্মবিশ্বাসী, সত্য ও সুপরামর্শ মেনে নিতে সদা প্রস্তুত এবং সর্বাবস্থায় আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট।

বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) এরশাদ করেছেন, ঈমানদার ব্যক্তি হাস্য-রসিক হন এবং মুমিনের মুখে মুচকি হাসি লেগে থাকে। ফার্সী প্রবাদে বলা হয়, খান্দেহ বর হার দারদে বি-দারমান দাওয়াস্ত। অর্থাৎ চিকিৎসার অযোগ্য সমস্ত রোগের ওষুধ হল হাসি।
আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের গবেষণায় দেখা গেছে, জীবন সম্পর্কে হতাশ ব্যক্তির চেয়ে হাসি-খুশি বা প্রফুল্ল মেজাজের মানুষের আচরণ বেশী সুন্দর। এ ধরনের মানুষ খুব কমই মানসিক ও শারীরিক রোগে ভোগেন। তাই মানুষের জন্য আনন্দদায়ক সব পদক্ষেপই শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য সহায়ক। আবার অনেক সময় মানুষের শরীরের রাসায়নিক উপাদানের পরিবর্তন তাকে বিষন্ন বা প্রফুল্ল করে। যেমন, অনেক মানুষ সকালের দিকে কোনো কারণ ছাড়াই অনিচ্ছাকৃতভাবে খিটমিটে বা ক্রুদ্ধ হয়ে থাকেন রক্তে রাসায়নিক পরিবর্তনের কারণে। কর্টিসল নামের একটি রাসায়নিক উপাদান শরীরে প্রয়োগ করা হলে মানুষ হাসি-খুশি হয়ে ওঠে। খুব ভোরের দিকে মানুষের শরীরে এই রাসায়নিক উপাদান বা হরমোন বৃদ্ধি পায়। আর এ সময় যদি মানুষ জেগে থাকে তাহলে সে বিশেষ আনন্দ ও প্রফুল্লতা উপভোগ করতে পারে। আর এই বাড়তি আনন্দ সারাদিন তার সৃষ্টিশীলতায় ইতিবাচক প্রভাব রাখবে। আর এ জন্যেই যারা খুব ভোরে বা গভীর রাতে নামাজ ও প্রার্থনায় মশগুল হন তারা সবচেয়ে শিহরণ-জাগানো মানসিক আনন্দ উপভোগ করেন বলে মনোস্তাত্ত্বিকরা মনে করেন। অনাবিল আত্মিক ও মানসিক প্রশান্তি অর্জনের মোক্ষম পন্থা হল নৈশকালীন ইবাদত। অবশ্য নামাজ, তা যে সময়েই আদায় করা হোক না কেন, সব সময়ই আধ্যাত্মিক ও খোদাপ্রেমের অতুলনীয় আনন্দের পরিবেশ সৃষ্টি করে এবং তা মানুষের মনকে করে বিকশিত, প্রাণবন্ত ও সজীব।
আজকাল মনোস্তাত্ত্বিকরা বলছেন, খুব ভোরে ঘুম থেকে জাগা ও নামাজসহ বিভিন্ন এবাদত-বন্দেগীতে মশগুল হওয়া মানুষের শারীরিক সুস্থতাসহ মানসিক প্রফুল্লতার জন্য সহায়ক। ফলে ভোরের নামাজ ও এবাদত মানুষকে বিষন্নতা থেকে রক্ষা করে। বিষন্নতায় ভুগছেন এমন রোগীদের শতকরা ৭৫ ভাগই সকালের ঘুমের মধ্যে বিভিন্ন সমস্যায় ভুগেন এবং বিষন্নতার উপসর্গগুলো সকালের দিকেই তীব্রতর হয়। তাই মনোস্তাত্ত্বিকরা খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠা ও এবাদত করাকে বিষন্নতা দূর করার মোক্ষম উপায় বলে মনে করছেন।

পবিত্র কোরআনেও ভোররাতের দোয়া ও নামাজেরও ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এ সময়ের এবাদত মানুষের মানসিক বোঝাকে হাল্কা করে এবং দূর করে মানসিক জটিলতা ও বিষন্নতা বা হতাশা। ভোরবেলায় খোদাপ্রেমের আকুতিতে টুইটুম্বর এবাদতের মাধ্যমে অর্জিত আল্লাহর সান্নিধ্যের পরশ মানুষের তৃষ্নার্ত আত্মাকে জোগায় প্রশান্তির মদিরা। ফলে মনের নড়বড়ে ভাব দূর হয়ে যায় এবং আল্লাহর ওপর একান্ত নির্ভরতায় পরিপূর্ণ দৃঢ়-মনোবল নিয়ে সে শুরু করে এক নতুন দিন। আর এ জন্যই আমীরুল মুমিনীন হযরত আলী (রাঃ) বলেছেন, “আল্লাহ যখন বান্দার কল্যাণ চান তখন তাকে স্বল্প আহার, স্বল্প ঘুম ও কম পরিমাণে কথা বলার গুণে বিভূষিত করেন। ”
রবিয়া বিন কা’ব ছিলেন বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)’র বিশিষ্ট সাহাবী। তিনি বহু বছর রাসূল (সাঃ)’র পাশে ছিলেন এবং বিভিন্ন যুদ্ধেও তাঁর সাথী ছিলেন। এ কারণে মুশরিকদের নানা অত্যাচার ও যন্ত্রণা তাকে সহ্য করতে হয়েছে। কিন্তু তিনি কখনও বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)’র কাছে কিছু চান নি। একদিন মহানবী (সাঃ) তাকে বললেন, হে রবিয়! তুমি ৭ বছর ধরে আমার সাথে ছিলে এবং আমার কাছে কিছুই চাও নি। তুমি কি আমার কাছে কিছুই চাইবে না?
উত্তরে মাথা নিচু করে তিনি বললেন, হে রাসূল আমাকে এ ব্যাপারে ভাবনার সময় দিন।
ঘরে ফিরে অনেক কথা মনে হলো রবিয়ার। অর্থনৈতিক সংকট দূর করার কথা কিংবা কখনও অসুস্থ না হবার আশার কথা। তার একজন ঘনিষ্ঠ লোক বড় কোনো পদ চাওয়ার পরামর্শ দিল তাকে। কিন্তু রাসূল (সাঃ)’র কাছে ফিরে এসে রবিয়া বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, আপনি আল্লাহর কাছে দোয়া করুন যেন আমি আপনার সাথে বেহেশতে যেতে পারি।
বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) তাকে বললেন, কেউ কি তোমাকে এ বিষয়টি শিখিয়ে দিয়েছে? উত্তরে রবিয়া বললেন, না, আমি নিজেই ভেবেছি যে সম্পদ তো চিরস্থায়ী নয়, দীর্ঘ হায়াত বা জীবন ও পদ-এসবও একদিন শেষ হয়ে যাবে। বিশ্বনবী (সাঃ) রবিয়ার প্রশংসা করে বললেন, আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করবো যাতে তোমাকে আমার সাথে বেহেশতে যেতে দেয়া হয়, তবে তুমিও অত্যধিক নামাজ ও সিজদার মাধ্যমে এই আশা পূরণের ব্যাপারে আমাকে সহায়তা কর।
রবিয়া বিন কা’ব খুব খুশী হলেন। তিনি একনিষ্ঠ মনে ও আল্লাহর প্রতি গভীর অনুরাগ নিয়ে বেশী বেশী নামাজ আদায় করতে লাগলেন। তিনি বুঝতে পারলেন সৌভাগ্য ও সুপথ এবং আল্লাহর সাথে গভীর ও প্রেমময় সম্পর্কের চাবিকাঠি হল নামাজ ও প্রার্থনা।

Permission taken from Source http://harisur.blogspot.com

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: