নামায : আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের উপায় ১৩ তম পর্ব

ধর্ম-বিশ্বাসী বা ধার্মিকরা মনে করেন একমাত্র আল্লাহই প্রশংসা পাবার যোগ্য এবং একমাত্র তাঁরই এবাদত করা যায়। তাদের মতে মহান আল্লাহ নিজ বান্দাদের প্রতি বিশেষ দয়া ও করুণা প্রদর্শন করেন এবং তাদেরকে প্রশান্তি দান করেন। পবিত্র কোরআনের বহু আয়াতে এক আল্লাহর এবাদত ও প্রশংসা করতে মানুষের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। আল্লাহর এবাদত ও প্রশংসা মানুষকে সংকীর্ণ বস্তু জগৎ থেকে আলোকিত জগতে নিয়ে যায় এবং ক্রমেই আরো উন্নত জগতে তার অবস্থানের পথ সুগম করে। বিশ্বজাহানের প্রতিপালক মহান আল্লাহর এবাদত ও প্রশংসার সুন্দরতম প্রকাশ হ’ল- নামাজ। সূরা আরাফের ২০৫ ও ২০৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “তোমার প্রতিপালককে প্রভাতে ও সন্ধ্যায় নিজ অন্তরে বিনীতভাবে ও সভয়ে এবং অনুচ্চ স্বরে স্মরণ কর, আর উদাসীন হয়ো না। নিশ্চয়ই যারা তোমার প্রতিপালকের সান্নিধ্যে রয়েছে, তারা আল্লাহর এবাদতে অহঙ্কার করে না, তারা আল্লাহর প্রশংসা ও পবিত্রতা বর্ণনা করে এবং তাঁকেই সেজদা করে থাকে।”

মহাপুরুষ ও মহামানবীদের মধ্যে খোদা-প্রেমের কাতরতা দিনকে দিন তীব্রতর হয়ে থাকে। এমনই একজন মানুষ ছিলেন মহিয়সী নারী হযরত ঈসা (আঃ)’র মাতা হযরত মরিয়ম । তিনি অধিকাংশ সময়ই আল্লাহর এবাদত-বন্দেগীতে মশগুল থাকতেন। জীবন-সায়াহ্নে খোদা-প্রেমের ক্রমবর্ধমান কাতরতা নিয়ে এবাদতে মশগুল থাকার সময় তিনি উপলব্ধি করছিলেন যে এ পৃথিবীতে তাঁর অবস্থানের মেয়াদ শেষ হয়ে আসছে। এ রকম ভাবনার দিনগুলোতে একদিন মৃত্যুর ফেরেশতা হাজির হল। হযরত মরিয়ম র প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে মৃত্যুর ফেরেশতা তাঁর প্রাণ নেয়ার অনুমতি চাইলো। মহান আল্লাহর দরবারে পবিত্রতা ও সতীত্বের মহিমায় ভাস্বর হযরত মরিয়ম ‘র ছিল অসাধারণ উচ্চ মর্যাদা। তাই তিনি যখনই চাইতেন তখনই তাঁর কাছে হাজির করা হত বেহেশতের নেয়ামত। তিনি স্মরণ করলেন সে সময়ের কথা যখন তাঁকে হযরত ঈসা(আঃ)’র জন্মের সুসংবাদ দেয়া হয়েছিল এবং বলা হয়েছিল, “হে মরিয়ম! এই নেয়ামতের কৃতজ্ঞতাস্বরূপ আল্লাহর প্রতি বিনম্র হও, সেজদা কর এবং রুকুকারীদের সাথে রুকু আদায় কর।” তাই জীবনের শেষ লগ্নে তিনি মৃত্যুর ফেরেশতাকে বললেন, আমাকে আল্লাহর দরবারে সেজদার সুযোগ দাও, এরপর জীবন নিও।

মৃত্যুর ফেরেশতা হযরত মরিয়ম ‘র এ অনুরোধ রক্ষা করেন। খোদাপ্রেমের অফুরন্ত আকুতি ও বিনম্রতা নিয়ে হযরত মরিয়ম যখন সেজদায় মগ্ন, তখনই তাঁর পার্থিব জীবনের অবসান ঘটে।এভাবে জীবনের শেষ মুহূর্তেও হযরত মরিয়ম ছিলেন আল্লাহর প্রেমে একাত্ম ও একাকার। হযরত ঈসা (আঃ) মায়ের কাছে ছুটে এলেন। ডাক দিলেন মা বলে। কিন্তু কোনো জবাব এল না। গভীর দুঃখ আর শোকে সমাচ্ছন্ন হযরত ঈসা (আঃ) বুঝতে পারলেন মমতাময়ী মা আর ইহলোকে নেই। মহান আল্লাহর পর দুঃখ ও বেদনার একমাত্র সহায় মাকে গভীরভাবে ভালবাসতেন হযরত ঈসা (আঃ)। আল্লাহর ইচ্ছায় তিনি মৃত মানুষকে জীবীতও করতে পারতেন। তাই দ্বিতীয়বার ডাক দিলেন স্নেহময়ী মাকে। আল্লাহর ইচ্ছায় জীবীত হলেন হযরত মরিয়ম । অশ্রুসিক্ত হযরত ঈসা (আঃ) মাকে প্রশ্ন করলেন, মা, আপনি কি আবার পৃথিবীতে ফিরে আসতে চান? হযরত মরিয়ম বললেন, হ্যাঁ, এ দুনিয়াতে আবার শুধু যে কারণে ফিরে আসতে ইচ্ছে হয় তা হ’ল, প্রবল শীতের রাতগুলোতে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নামাজ পড়তে এবং গ্রীস্মের তীব্র গরমের দিনগুলোতে রোজা রাখতে । এরপর পরিপূর্ণ মমতায় ভরা চোখে পুত্রের দিকে তাকিয়ে বললেন, বাছা! এই দুনিয়া খুবই ভয়ংকর। বিস্মিত ও দুঃখ-ভারাক্রান্ত হযরত ঈসা (আঃ) মায়ের চেহারায় আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের বেহেশতী আনন্দ প্রত্যক্ষ করলেন। পূণ্যময়ী হযরত মরিয়ম আবারও চোখ দুটি বন্ধ করলেন এবং শায়িত হলেন চিরনিদ্রায়।

বর্তমান বিশ্ব সামাজিক ক্ষেত্রে অনেক সংকট, মানসিক চাপ এবং বিভিন্ন ধরনের অপরাধ ও নৈরাজ্যে জর্জরিত। হতাশা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা সমসাময়িক যুগের মানুষের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আত্মহত্যার ব্যাপারে পরিসংখ্যানগত এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশটিতে আত্মহত্যার শতকরা ৭২ টি ঘটনা ঘটে হতাশার কারণে, শতকরা ১৩ টি আত্মহত্যা ঘটে মদ পানের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তির কারণে, শতকরা ৮ ভাগ আত্মহত্যা ঘটছে অন্যান্য মানসিক রোগের জন্য এবং শতকরা ৭ ভাগ আত্মহত্যা ঘটে থাকে কোনো ধরনের পূর্ব-প্রেক্ষাপট বা কারণ ছাড়াই। এ ছাড়াও মার্কিন সমাজে সবচেয়ে বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা ব্যক্তিরা যারা চাকুরী থেকে অবসর নেয়ায় এবং পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ায় সামাজিকভাবে একঘরে হয়ে আছেন।

মনোস্তত্ত্ববিদরা বিভিন্ন ধরনের মানসিক সমস্যা সমাধানের বিভিন্ন উপায়ের কথা বলে আসছেন। এ ব্যাপারে ধর্ম-বিশেষজ্ঞরাও ভিন্ন ধরনের কিছু পদ্ধতির কথা বলে থাকেন। মানসিক সংকটগুলো হ্রাসে নামাজের ভূমিকার কথাও এ প্রসঙ্গে বিশ্লেষণযোগ্য। এই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নামাজ হতাশা বা বিষন্নতা দূর করার পাশাপাশি মানুষের মধ্যে আশা এবং জীবনের লক্ষ্য সম্পর্কে অনুপ্রেরণা সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ধর্মীয় সমাজে বয়স্ক ব্যক্তিরা নিয়মিত নামাজ পড়েন। আধ্যাত্মিক বিশ্বদৃষ্টি ও পরকালমুখী চিন্তার কারণে তারা জীবনের পড়ন্ত বেলায় তওবা বা অনুশোচনা এবং পাপ মার্জনার জন্য প্রার্থনায় মশগুল হন। তারা জীবনের এই সময়টাকে আল্লাহর সাথে অঙ্গীকার নবায়নের মূল্যবান সময় বলে বিবেচনা করেন। তাই বিভিন্ন ধরনের মানসিক আঘাতের শিকার ব্যক্তিরাসহ বয়স্ক ও প্রবীণ ব্যক্তিদের জন্য নামাজ ও প্রার্থনা আশা-উদ্দীপক এবং প্রশান্তিদায়ক মোক্ষম ওষুধ হিসেবে কাজ করে। আপনজনের মৃত্যুর মত মানসিক সংকট ও অর্থনৈতিক সংকটের সময় নামাজ মানুষকে অবিচল রাখে এবং আত্মহত্যার মত অযৌক্তিক ও অশান্ত কাজ থেকে বিরত রাখে। আর এ জন্যই পবিত্র কোরআনে সূরা বাকারার ৪৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “তোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা কর। এ কাজ বিনয়ী বা খোদাভীরু ব্যক্তি ছাড়া অন্যদের জন্য কঠিন। ”
হ্যাঁ, সংকটগুলোর সমাধানের জন্য দুটি বিষয় খুবই জরুরী। এ দুটি বিষয় হল, ধৈর্য ও নামাজ। নামাজ মানুষকে মহান আল্লাহর অশেষ শক্তির সাথে সম্পর্কিত করে এবং তার মধ্যে সঞ্চার করে নতুন শক্তি ও মনোবল। অন্য কথায় নামাজ মানুষকে সংকট ও দুঃখ-বিপদের মোকাবেলায় পাহাড়ের চেয়েও অবিচল ও শক্তিমান করে। মহান আল্লাহ যেন আমাদের সবাইকে প্রকৃত নামাজী হবার তৌফিক দেন ।আমিন

Permission taken from Source http://harisur.blogspot.com

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: