নামায : আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের উপায় ৯ম পর্ব

রাসূল (সাঃ)’র বিশিষ্ট সাহাবী হযরত সালমান ফারসী বলেছেন, একদিন রাসূলে খোদা (সাঃ)’র পাশে একটি গাছের নীচে বসেছিলাম। তিনি গাছটির একটি শুকনো ডাল ধরে নাড়া দিলে ঐ ডালের সমস্ত পাতাগুলো ঝরে পড়ে। এরপর আল্লাহর শেষ রাসূল (সাঃ) বললেন, সালমান, তুমি কি জিজ্ঞেস করবে না- কেন আমি এমন করলাম? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনিই এর কারণ বলুন। তিনি তখন বললেন, যখন কোনো মুসলমান ভালোভাবে ওজু করে ৫ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করে, তখন তার গোনাহগুলো ঠিক এই ডালের পাতাগুলোর মতই ঝরে পড়ে। এরপর তিনি সূরা হুদের ১১৪ নম্বর আয়াত তেলাওয়াত করেন যেখানে দিনে ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়ার কথা বলা হয়েছে।

নামাজ অজস্র কল্যাণ ও বরকতের উৎস। অন্য কথায় এ এমন এক এবাদত যা থেকে বরকত ও কল্যাণের এত বিপুল ও অজস্র ফল্গুধারা প্রবাহিত যে মানুষের মন তা কল্পনা করতেও অক্ষম।
দিন ও রাতে ৫ ওয়াক্ত নামাজ সতর্ক থাকার ও সচেতন থাকার মাধ্যম। নামাজ মানুষের কাছে মানব-জীবনের পরিকল্পনাগুলো তুলে ধরে এবং মানুষকে গতিশীল ও প্রাণবন্ত বা উদ্দীপ্ত করতে চায়। নামাজ দিন ও রাতগুলোকে করে অর্থপূর্ণ এবং সুযোগগুলো যে শেষ হয়ে আসছে তা স্মরণ করিয়ে দেয়। সময়ের প্রবাহে মানুষের মধ্যে যখন দেখা দেয় উদাসীনতা, তখন নামাজ তাকে সচেতন হবার আহ্বান জানায়। নামাজ তাকে মনে করিয়ে দেয় যে তোমার একটা দিন অতিবাহিত হয়ে গেছে এবং আরো একটি দিনের যাত্রা শুরু হয়েছে তোমার জীবনে। তাই আরো বেশি সক্রিয় হও, ঈমানের শক্তিতে বলীয়ান হয়ে ও আল্লাহর প্রেমের মধুর নেশায় মত্ত হয়ে এগিয়ে যাও সৌভাগ্যের স্বর্ণালী শিখরের দিকে। বাংলাদেশের জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম যেমনটি নামাজকে ইসলামী জাগরণের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরে বলেছেন,

ঘুমাইয়া কাজা করেছি ফজর
তখনো জাগিনি যখন যোহর
হেলায় ফেলায় কেটেছে আসর
মাগরেবের ওই শুনি আজান
নামাজে শামিল হওরে এশাতে
এশার জামাতে আছে স্থান!

বৃটেনের ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ওয়াল্টার কোফম্যান বলেছেন,
” এবাদত তথা প্রার্থণার মধ্যে ও স্রষ্টার গুণ-গানের মধ্যে মানুষ এমন এক আন্তরিক ও নৈতিক শক্তি লাভ করে যে অন্য সব সাধারণ মুহূর্তে ঐ শক্তি বা চেতনা লাভ সম্ভব হয় না। এবাদত ও প্রার্থণার সময় মানুষের একাকীত্বের দেয়াল ভেঙ্গে যায় এবং নামাজী বা প্রার্থণাকারীর সামনে খুলে যায় অসীম রহস্যের এক জগৎ। মানবীয় আবেগ ও কোমল বা সূক্ষাতিসূক্ষ্ম অনুভূতিগুলো আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশের বাহন হয়ে, কৃতজ্ঞতা ও ভক্তির ভাষাগুলো মর্মের অশ্রু হয়ে, একান্ত আলাপচারিতা এবং একান্ত আপনজন বা বন্ধুর কাছে উপস্থাপিত প্রত্যাশা কিংবা অনুরোধ হয়ে দেখা দেয়। প্রার্থনার সময় মানুষের আত্মায় যেন পাখা ও পালক যুক্ত হয়। তাই এ সময় সে উড়ে চলে ঊর্ধ্বাকাশে, উপর থেকে আরো উপরের আকাশে সে এগিয়ে যেতেই থাকে। ”

নামাজের গঠনমূলক ও শিক্ষা বা প্রশিক্ষণমূলক ভূমিকার কারণে নামাজ কায়েম বা প্রতিষ্ঠার ওপর ব্যাপক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। পবিত্র কোরআনের ৮৬ টি আয়াতে নামাজের প্রসঙ্গ স্থান পেয়েছে। সূরা হুদের ১১৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “তোমরা দিনের দুই অংশে এবং রাতের প্রথমভাগে নামাজ কায়েম কর। কারণ, নিশ্চয় সৎকর্ম অসৎকর্মকে দূর করে বা ধ্বংস করে। এটা উপদেশ গ্রহণকারীদের জন্য উপদেশ। ”

পবিত্র কোরআনের যেসব আয়াত মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশী মাত্রায় প্রাণ সঞ্চার করে ও মানুষকে আশাবাদী করে এই আয়াতটি সেসবের মধ্যে অন্যতম। একবার আমীরুল মুমিনিন হযরত আলী (রাঃ) একদল লোকের কাছে প্রশ্ন করলেন, পবিত্র কোরআনের সবচেয়ে বেশী আশা-সঞ্চারক আয়াত কোনটি? এক ব্যক্তি বললেন, কোরআনের সেই আয়াতটি যাতে বলা হয়েছে, হে আমার বান্দারা, যারা নিজের ওপর জুলুম করেছে, তারা আল্লাহর রহমতের ব্যাপারে নিরাশ হয়ো না। হযরত আলী (আঃ) বললেন, এটাও ভালো, তবে আমি যে আয়াতের কথা বলতে চেয়েছি এ আয়াত তা নয়। অন্য এক ব্যক্তি অন্য এক সুন্দর আয়াতের কথা বললো। কিন্তু ঐ আয়াতও হযরত আলী (রাঃ)’র প্রত্যাশিত আয়াত ছিল না। এ অবস্থায় লোকেরা বলল, আপনি নিজেই ঐ আয়াতটির কথা বলুন যা আপনার দৃষ্টিতে সবচেয়ে আশাব্যাঞ্জক। তখন তিনি বললেন, আমার প্রিয় ব্যক্তিত্ব রাসূলে খোদা (সাঃ) বলেছেন, সূরা হুদের ১১৪ নম্বর আয়াতটি সবচেয়ে আশাব্যাঞ্জক।
এই আয়াতের অর্থ আমরা একটু আগেই বলেছি। এই নূরানী আয়াতে দৈনিক ৫ বার নামাজ কায়েম করার কথা বলার পর পরই এই এবাদতের গঠনমূলক ও প্রজ্জ্বোল প্রভাবের কথা তুলে ধরা হয়েছে। অর্থাৎ নামাজ সৎকর্মের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত এবং এই নামাজ নোংরা বা খারাপ কাজগুলোর কূফলকে ধ্বংস করে দেয়। আমাদের জীবনে বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাতের সময় কূমন্ত্রণাদায়ী প্রবৃত্তিগুলো আমাদেরকে অনেক সৎ লক্ষ্য বা অঙ্গীকার এবং মানুষের কল্যাণকামীতা থেকে দূরে রাখে। কূমন্ত্রণাদায়ী প্রবৃত্তিগুলো সর্বপ্রথম যেখানে আঘাত হানে তা হল মানুষের ইচ্ছা-শক্তি ও দৃঢ়-সংকল্পের দূর্গ। এই দূর্গ নড়বড়ে হয়ে পড়লে মানুষ সহজেই অধঃপতন বা অবক্ষয়ের শিকার হয়। সিমীত ক্ষমতার ও দূর্বল শক্তির মানুষ আল্লাহকে নামাজের মধ্যে বার বার স্মরণের মাধ্যমে অসীম ক্ষমতা ও শক্তির আধারের সাথে সম্পর্কিত হয়। আল্লাহর এই মধুর স্মরণ মানুষের ইচ্ছাশক্তিকে সুদৃঢ় করে এবং তাকে কূপ্রবৃত্তির ওপর বিজয়ী হবার শক্তি দান করে। এ জন্যই নামাজকে আত্মিক রোগগুলো চিকিৎসার সবচেয়ে সুন্দর ও কার্যকরী ওষুধ বলে অভিহিত করা হয়।

মানুষের প্রতিটি অন্যায় কাজ বা পাপ তার অন্তরে একটি কালো বিন্দু বা কলংকের দাগ সৃষ্টি করে। পাপ কাজ অব্যাহত রাখলে ব্যক্তির সমস্ত সত্ত্বা কলুষিত হয়ে পড়ে এবং সে তার নিজের আত্মারই শত্রুতে পরিণত হয়। অন্যদিকে মানুষ যদি আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য সৎ কাজ করতে থাকে, তাহলে তার অন্তর পরিচ্ছন্ন ও পবিত্র হতে থাকে। সৎকর্ম মানুষের অন্তর বা আত্মা থেকে পাপের প্রভাব ধুয়ে মুছে ফেলে আত্মাকে নির্মল ও উজ্জ্বল করে।

নামাজ মানুষের মধ্যে ঈমানের ভিত্তিগুলোকে মজবুত করে এবং তার মধ্যে খোদা-ভীতির চারাগাছ রোপন করে। নামাজের মধ্যে পঠিত বিষয়গুলো মানুষকে উচ্চতর মানবীয় গুণাবলীর দিকে আকৃষ্ট করে। ফলে পাপ বা মন্দ কাজের কারণে মানুষের মনে যেসব দূষণ বা ঘা সৃষ্টি হয় তা নামাজের মাধ্যমে সেরে যায়। যখন নামাজী সঠিকভাবে নামাজ আদায় করেন তখন তিনি আলোকিত ও আধ্যাত্মিক জগতের সাথে সম্পর্কিত হন এবং মানুষের হৃদয়ে স্বর্গীয় গুণাবলীর বিকাশ ঘটায়। তাই কেউ যদি নামাজের সূক্ষ্ম রহস্য ও তাৎপর্যগুলো উপলব্ধি করতে পারেন তাহলে নামাজ তার জন্য সর্বাত্মক উন্নতি ও অগ্রগতির এক উচ্চতর শিক্ষালয় বা প্রশিক্ষণালয়ে পরিণত হবে।

Permission taken from Source http://harisur.blogspot.com

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: