নামায : আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের উপায় ৪র্থ পর্ব

অসীম দয়ালু আল্লাহর সামনে মানুষ অক্ষম এবং অতিশয় ক্ষুদ্র। মহান স্রষ্টার সাথে এই ক্ষুদ্র সত্ত্বার সম্পর্ক যার মাধ্যমে স্থাপিত হয় তা হলো নামায। পরমাত্মার সামনে জীবত্মার বিনয় প্রকাশের মাধ্যম হলো নামায। মনের আকাশে যখন মেঘ জমে,তখন কেবল নামাযের স্নিগ্ধ শীতল মৃদুমন্দ প্রেমের মেহরাবে উপস্থিতিই মানুষকে হালকা করতে পারে এবং মনের বাগিচায় খোদার স্মরণের সুগন্ধি ফুল ঘ্রাণ ছড়ায়।
নামায কেন পড়বো-এরকম একটি প্রশ্ন সবার মনেই জাগতে পারে। বহুক্ষেত্রেই দেখা যায় সাধারণত বস্তুবাদী জীবনের ব্যস্ততা ও সমস্যাই মানুষকে দুঃখ-কষ্টের দিকে নিয়ে যায়। মানুষ তখন এই দুঃখ-কষ্ট থেকে মুক্তি লাভের জন্যে দুশ্চিন্তাহীন একটা নিরাপদ জীবন প্রত্যাশা করে। এই প্রত্যাশা পূরণের জন্যে মানুষ যে-কোনো একটা কিছুর আশ্রয় নেয়। কেউ বই পড়ে,কেউ গান শোনে আবার কেউবা একাকীত্ব বেছে নেয়। কিন্তু এগুলোর কোনোটারই প্রভাব স্থায়ী নয়। জীবনের এরকম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা থেকে বেঁচে থাকার লক্ষ্যে ইসলাম স্থায়ীভাবে একটি স্বচ্ছ ঝর্ণাধারা আমাদের সামনে প্রবাহিত করে দিয়েছে। আমরা যদি আমাদের অন্তরগুলোকে ঐ ঝর্ণাধারায় ধুয়ে নিই তাহলে স্থায়ীভাবে আমরা পবিত্রতা ও নিরাপত্তা পেতে পারি। প্রাণদায়ী এই ঝর্ণাধারাটি হলো নামায। আর এর মাধ্যমে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক স্থাপিত হয়।

অন্তত ১০ হাজর বিষাদগ্রস্ত লোকের ওপর গবেষণা চালানোর পর ব্রিটিশ মনোবিজ্ঞানী হেনরি র্যা ঙ্ক বলেছেন,আমি এখন ধর্মীয় বিশ্বাসগুলোর গুরুত্ব খুব ভালোভাবেই উপলব্ধি করছি। সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে,যে কেউ ধর্ম বা ধর্মীয় বিশ্বাস লালন করবে কিংবা যথাযথত নিয়মে প্রার্থনালয়ে উপস্থিত হবে,তারা উন্নত মানবীয় ব্যক্তিত্ব ও মর্যাদার অধিকারী হবে।

আমেরিকার স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ ডক্টর ফ্রেডরিক পাওয়ার্স বলেছেন, এমন এমন কিছু রোগী আমাদের কাছে এসেছে যাদের অবস্থার উন্নতির ব্যাপারে বড়ো বড়ো এবং অভিজ্ঞ ও দক্ষ ডাক্তারগণও খুব কমই আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তবে তাদের অবস্থার উন্নতির ব্যাপারে যা তাদের ওপর প্রভাব ফেলেছিল,তাহলো আল্লাহর সাথে সম্পর্ক এবং মোনাজাতের মতো অলৌকিক বিষয়। ব্রিটিশ মনোবিজ্ঞানী সেরেল ব্রেতও বলেছেন,আমরা নামায এবং দোয়ার মাধ্যমে বুদ্ধিবৃত্তিক আনন্দের বৃহৎ সম্ভারে প্রবেশ করতে পারি,যেখানে সাধারণভাবে প্রবেশ করার কোনো সুযোগ নেই।

এ কারণেই যারা নামায পড়েন তাদের জন্যে এ বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়ে গেছে যে,দৈনিক কয়েকবার নামায পড়া আন্তরিক প্রশান্তির জন্যে সর্বোৎকৃষ্ট কর্মসূচি ও অনুশীলন। নামায হলো মানুষের আধ্যাত্মিক চাহিদার যোগান। জ্ঞান-বুদ্ধির আলো যেভাবে মানুষের ব্যক্তিত্বকে বিকশিত করে তেমনিভাবে নামাযও মানুষকে বিকশিত করে। এ কারণেই নবী কারিম (সা) নামাযকে তাঁর নিজের চোখের আলো বলে উল্লেখ করে বলেছেন-প্রত্যেক বস্তুরই একটা চেহারা বা রূপ আছে আর ধর্মের রূপ বা চেহারা হলো নামায। অতএব এর চেহারাটার পরিপূর্ণ সৌন্দর্য রক্ষার চেষ্টা করো। হাদিসে এসেছে রাসূলে খোদা (সা) নামাযের সময় হলে বলতেন-হে বেলাল!নামাযের মাধ্যমে আমাদেরকে প্রশান্তির পর্যায়ে নিয়ে যাও! অন্য এক হাদিসে এসেছে যখনই ইসলামের নবী পরিশ্রান্ত হয়ে পড়তেন তখনই নামাযে দাঁড়াতেন এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করতেন।

নামায পড়ার মাধ্যমে অন্তর প্রশান্ত,পূণ্যময় ও সৌন্দর্যপূর্ণ হয় এবং আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করা যায়। আল্লাহর সাথে নামাযের মাধ্যমে যোগাযোগ বা সম্পর্ক স্থাপিত হয় এবং নামায আদায়কারীর অন্তরাত্মায় পবিত্রতার দিকে ছোটার স্পন্দন অনুভূত হয়। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে নামায মানুষকে সকল প্রকার অন্যায় ও মন্দকাজ থেকে দূরে রাখে। নামায পড়লে মানুষের মাঝে গুনাহের কাজে লিপ্ত হবার প্রবণতা হ্রাস পায়। এ কারণেই ধর্মীয় চিন্তাবিদগণ বলেছেন,নামায মনের কামনা-বাসনা চরিতার্থ করার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার শক্তি বৃদ্ধি করে এবং ঈমানী শক্তি বৃদ্ধির প্রেরণার বৃহৎ একটি সম্ভার হলো নামায।

আসলে নামায মানুষের মাঝে বেশ কিছু গুণাবলী সৃষ্টি করে দেয়। যেমন পবিত্রতা ,ওজু করা এবং হাত-মুখ ধোয়া, মেসওয়াক করা,পরিচ্ছন্ন পোশাক পরা প্রভৃতি নেক গুণাবলি মানুষের মাঝে সৃষ্টি করে নামায। অবশ্য মানুষ নামাযের ভঙ্গি এবং শব্দগুলোর প্রতি যতো বেশি মনোযোগী হবে,ততো বেশি তার প্রভাব ও ঔজ্জ্বল্য বিকীর্ণ হবে তার অন্তরে।

নামাযের আরো কিছু ইতিবাচক প্রভাব ও বৈশিষ্ট্য আছে। যেমন নামাযের স্থানটিকে পূত-পবিত্র হতে হবে,অপবিত্র হওয়া চলবে না।নামায আদায়কারীর পরিধানের বস্ত্র হতে হবে সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন। সেইসাথে অপরের অধিকারের প্রতি মনোযোগী হওয়াটাও নামাযের আরেকটি শিক্ষা বা বৈশিষ্ট্য। এ বৈশিষ্ট্যগুলো স্বাভাবিকভাবেই একটি মানুষকে অন্যায় বা অপরাধী কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রাখে। ফলে মানুষের জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ন্যায়নীতি এবং সামাজিক সম্পর্ক উন্নয়নে নামাযের প্রভাবশালী ভূমিকার বিষয়টি প্রমাণিত হয়। অপরদিকে নামাযের সময়-সচেতনতার বিষয়টিও মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে নিয়ম-শৃঙ্খলার ওপর ধর্মীয় গুরুত্বের সুস্পষ্ট নিদর্শন। এইসব কারণেই ধর্মীয় গুরুত্বপূর্ণ হুকুম-আহকামগুলোর মধ্যে নামায অন্যতম।

Permission Taken from Source http://harisur.blogspot.com/

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: