সমাজকে সুন্দর করতে দরকার শিষ্টাচার

মহাগ্রন্থ আল কোরআনে ঘোষণা করা হয়েছেঃ “এই কোরআন সেই পথ দেখায়, যা পুরোপুরি সোজা ও ঋজু। যে সব লোক উহাকে মেনে নিয়ে শিষ্টাচার পালনের মধ্য দিয়ে কাজ করতে থাকবে তাদেরকে উহা সুসংবাদ দেয় যে, তাদের জন্য বিরাট শুভ কর্মস্থল রয়েছে। আর যারা পরকালে বিশ্বাস করে না, তাদেরকে একথা জানিয়ে দাও যে, তাদের জন্য আমি অত্যন্ত পীড়াদায়ক আযাব প্র‘ত করে রেখেছি।” (সূরা বনি ইসরাইলঃ ১, ১০ আয়াত।
মহানবী (সাঃ) বলেছেন, “মানবতাবোধের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ শিষ্টাচার।” কথায় বলে, ভদ্র ও সৎ হতে যখন অর্থ ব্যয়ের দরকার হয় না, অথচ উক্ত আচরণ মানুষকে শ্রেষ্ঠ গুণসম্পন্ন বলে প্রতিপন্ন করতে পারে- তখন ভদ্র ও সৎ না হবার অন্তরালে কোনো যুক্তি নেই। অবশ্য একথা সত্য যে, মানুষ ইচ্ছে করলেই সৎ হতে পারে না। এর জন্য শুধু শিক্ষা নয়- চাই উপযুক্ত সুশিক্ষা। অশিক্ষিত বা নিরক্ষর মানুষের কাছে প্রকৃত ভদ্রতা আশা করা যায় না (সব নিরক্ষর কিন্তু অভদ্র নন)। কারণ অজ্ঞানতার অর্থই অমার্জিত রুচির প্রয়োগ।
পরকালের অন্তহীন জীবনকে সুন্দর ও সার্থক করে তুলতে হলে এর পাথেয় সংগ্রহ করতে হবে এই দুনিয়াতেই। এ সংগ্রহ সৎ-শিষ্টাচার জীবন যাপনের দ্বারা অর্জন করা ছাড়া বিকল্প পথ নেই। “সেই লোকদের ছাড়া যারা ঈমান এনেছে ও শিষ্টাচারের মাধ্যমে জীবন পরিচালনা করে তাদের জন্য অশেষ প্রতিফল রয়েছে” (সূরা আত্তীন, আয়াত-৬)।
মানব জীবনে শিষ্টাচার ও সৌজন্যবোধ -এর প্রয়োজন কতোটুকু তা বলে শেষ করা যাবে না। জনৈক সাহিত্যিক বলেছেন, “মানব জীবনের একটি বড় গুণ হচ্ছে শিষ্টাচার।” শিষ্টাচারের অভিধানগত অর্থ ভদ্রতাসুচক আচরণ। গল্প বা পুস্তকে নেপোলিয়নের মতো একজন মহাবীর শিষ্টাচারের যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন সে কাহিনী কে না জানে? একবার তিনি অতি সামান্য একজন ভিখারীকে পথ প্রদর্শন করে শিষ্টাচার ও সৌজন্যবোধের যে নজির রেখে গেছেন তা আজো ইতিহাসে স্মরণীয়। তিনি দেশবাসীকে সর্বদা সদাচার ও ভদ্র হতে উপদেশ দিতেন।
আমাদের সমাজ ও জাতীয় জীবনের উদ্যোক্তা মহা-পুরুষেরা একথা জোর দিয়ে বলেছেন যে, যে কোনো জাতির জীবনকে আদর্শ করে তুলতে হলে শিষ্টাচার ও সৌজন্যের ব্যাখ্যা হ্নদয়ঙ্গম করে দৈনন্দিন জীবনে এর প্রয়োগ সক্রিয় হওয়া উচিত। একজন পর্যটক লন্ডনে পথ হারিয়ে একদিন মহাবিভ্রাটে পড়েন। বাস কন্ডাক্টর তার মনের অবস্থা উপলদ্ধি করে গন্তব্য স্থানের ঠিকানা জিজ্ঞেস করে তাকে লক্ষ্য স্থলে পৌঁছার পথ দেখিয়ে দেয়। আমাদের দেশের অসৌজন্যবোধ ও অশিষ্টাচারের দৃষ্টান্ত অত্যন্ত মর্মান্তিক। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার মূলে রয়েছে এর অভাব। বিদ্যালয়ে শিক্ষা জীবনের শুরুতেই শিষ্টাচার সম্পর্কে ধারণা দেয়া উচিত।
ইসলাম ধর্মে শিষ্টাচার অত্যন্ত গরুত্বের সাথে ইহলৌকিক ও পারলৌকিক মঙ্গল সাধনে বিবেচিত। তারপরও যদি কেউ অসৎ ও অন্যায়ের পথে অগ্রসর হয়, নিজের চরিত্রগত দোষ সংশোধন করে কলুষমুক্ত জীবন-যাপন না করে অসৎ পথে অগ্রসর হয়ে মানব সমাজের ক্ষতিসাধন করতে থাকে, তবে তার পারলৌকিক শাস্তি ছাড়াও পার্থিব শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে যেনো তা দেখে অন্যরা সাবধান হয়। ইরশাদ হয়েছেঃ “তওরাতে আমি ইহুদীদের প্রতি এই হুকুমই লিখে দিয়েছে যে, জানের বদলে জান, চোখের বদলে চোখ, নাকের বদলে নাক, কানের বদলে কান, দাঁতের পরিবর্তে দাঁত এবং সব রকম জখমের সমান বদল নির্দিষ্ট।” (সূরা মায়েদাঃ ৪৫ আয়াত)
ইসলামে শিষ্টাচার শুধু ব্যক্তি বা সমাজ জীবনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তাই এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব জাতীয় জীবনের প্রতি ক্ষেত্রেও সম্প্রসারিত হয়েছে। একটি জাতি যদি সত্যিকার অর্থে শিষ্টাচারী না হয়, সে জাতির বৈষয়িক উন্নতি সম্ভব নয়। এক সময় মুসলিম জাতি নৈতিক আদর্শে বলীয়ান হয়েছিলো বলেই সারা দুনিয়ার ওপর প্রভুত্ব করেছিলো। প্রকৃত কথা এই যে, “আল্লাহ্ কোন জাতির অবস্থার পরিবর্তন করেন না।, যতোক্ষণ পর্যন্ত জাতির লোকেরা অবস্থা পরিবর্তনের চেষ্টা না করে। আর যখন আল্লাহ্ কোনো জাতির অকল্যাণ করার সিন্ধান্ত করেন, তখন তা কারো প্রতিবাদে রুদ্ধ হয় না, না আল্লাহর বিরুদ্ধে এই রকম জাতির কেউ সহায়ক ও সাহায্যকারী হতে পারে। (সূরা রাদঃ ১১ আয়াত)।
আমরা আজ পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েছি। শিষ্টাচারের প্রতি এখন আর তেমন গুরুত্ব দেই না। পশ্চিমা জগতের মতো অসত্য, অন্যায়, শোষণ আর অপরের অধিকার হরণকে নিজের মৌলিক অধিকার বলে স্বীকার করে নিতে যেনো অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। ফলে আমাদের উন্নতির চেয়ে অবনতিই ইচ্ছে অনেক বেশি। কিন্তু তা বুঝা ও অনুধাবনের জ্ঞানটুকু পর্যন্ত আমাদের লোপ পেয়েছে।
দেহের শোভা, আবরণ, আর আত্মার শোভা হচ্ছে শিষ্টাচার। এই শিষ্টাচার অনুশীলনের অর্থ হচ্ছে, বাক্য এবং আলাপে রূঢ়তা বর্জন করে যে যতো বেশি অমায়িক, ভদ্র ও পরোপকারী- সে ততো বেশি জনপ্রিয়। যে কোনো জাতির সুনামের বাসনা চরিতার্থ হয় মানবতা রূপ-গুণের বলে। সমাজ-জীবনে শিষ্টাচরে ও সদাচারের মূল্য তা চিন্তাশীল ব্যক্তি মাত্রই অজানা নয়। পারস্পরিক বন্ধুত্ব ও সম্পর্ক স্থাপনের জন্যে গুণাবলীর সক্রিয়তা কেউই অস্বীকার করতে পারেন না। মানুষের গুণের কথাই মানুষ স্মরণ রাখে। কে কতো সমৃদ্ধ বা কার রূপ কতো বেশি- এদিকে কেউ দুষ্টিপাত করে না।
শিষ্টাচার বিবর্জিতভাবে অর্থ ও সম্পদ পুঞ্জিভূত করার জন্যে সমাজে ভারসাম্যহীনতার সৃষ্টি হয়। সৃষ্টি হয় শোষক ও শোষিত শ্রেণী। এজন্যে পবিত্র কোরআনে কঠোর ও পীড়াদায়ক শাস্তির কথা ঘোষণা করা হয়েছে। “একদিন অবশ্যই হবে, যখন এই স্বর্ণ, রৌপ্যের ওপর জাহান্নামের আগুন উত্তপ্ত করা হবে এবং পরে ওটার দ্বারাই সে লোকদের কপালে, পার্শ্বদেশে ও পিঠে চিহ্ন দেয়া হবে। এটা হচ্ছে সেই সম্পদ- যা তোমরা নিজেদের জন্যে সঞ্চিত করেছিলে। এখন তোমাদের সঞ্চিত সম্পদের স্বাদ গ্রহণ করো।” (সূরা তওবাঃ ৩৫ আয়াত)।
শেক্সপিয়ারের মতে, “দরিদ্র অথচ শিষ্টাচারী ভদ্রজনের কাছে দেশ-বিদেশ থেকে বন্ধুত্বের বাণী আসে।”
মেকলে বলেছেন, “ছোট কাজে বদন্যতার প্রকাশ শিষ্টাচার বা ভদ্রতার নামান্তর। এই শিষ্টাচার মানুষের মনে চরম পরিতৃপ্তি দিতে পারে। নিজে যেভাবে অপরের ভালোবাসার প্রত্যাশী, সেভাবে অপরকে ভালোবাসাই শিষ্টাচার। এই শিষ্টাচার মানুষের মন থেকে পক্ষপাতিত্ব এবং স্বার্থপরতার বিলোপ সাধন করে।”
পবিত্র কোরআন পাকে নর-নারীদের কথা বলা হয়েছে। শাফা’আত কেবলমাত্র ঈমানদার শিষ্টাচারীদের জন্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। কাফির-মুশরিকদের জন্যে কোনো শাফা’আত হবে না। ইরশাদ হয়েছেঃ “শাফা’আত শুধুমাত্র ঈমানদার শিষ্টাচারী নর-নারীদের জন্যে। তাদের কোনো উপকারে আসবে না- যারা অশিষ্টাচারী মুশরিক।” (সূরা মুদদাসসিরঃ ৪৮ আয়াত)।
আল কোরআনের নির্দেশনানুযায়ী শিষ্টাচার মানুষের পরম সম্পদ। সুতরাং সমাজ ও মানব জীবনে এর গুরুত্ব অপরিসীম। প্রতিটি মানুষের শিষ্টাচারী হওয়া অবশ্যই ফরজ কর্তব্য।

Source & Gratitude
http://www.shobdoneer.com/Shibly/14045

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: