ভ্যালেন্টাইনস ডেঃ কতটুকু বৈধ?

হুমম…তো বছরের সে দিনটা আবার এসে গেল। যখন তারা বলে “ভালোবাসা” আকাশে বাতাসে। যে সময়টাতে সর্বত্র লাল রং-এর ছড়াছড়ি … লাল রঙ্গের হৃদয়াকৃতি, লাল ক্যান্ডি, লাল ফুল আর লাল লাল গোলাপ।

আর আপনি যদি এসময়টাতে দোকান-পাটগুলোতেও যান; দেখবেন সারিবদ্ধ চকোলেট, বিভিন্ন সাজ-সজ্জার উপকরণ আর বিশেষ বিশেষ উপহার যাতে লেখা “আপনার বিশেষ কারো জন্যে”।

এ সময়টাতে বুড়ো-বুড়ি থেকে শুরু করে যুবক-যুবতী এমনকি স্কুল পড়ুয়া ছেলে-মেয়েরা পর্যন্ত নিজেদের মধ্যে ভ্যালেন্টাইন কার্ড আর প্রেমের চিরকুট আদান-প্রদান করে থাকে।
কিন্তু এসবকিছু কেন?
কারণ এটা “ভ্যালেন্টাইনস ডে” … তাই!

কিন্তু চরম বিপর্যয়ের বিষয় হচ্ছে, আজ আমরা মুসলিমরা পর্যন্ত এসব করছি। আর এটা শুধু পশ্চিমা বিশ্বে নয়, যারা মুসলিম রাষ্ট্রগুলোতেও বসবাস করছি তারাও এতে জড়িয়ে পড়ছি! তারাও আজকাল এসব কার্ড চালাচালি আর চিরকুট আদান-প্রদানে লিপ্ত!

তারাও পালন করে থাকে ভ্যালেন্টাইনস ডে!

কিন্তু এ ভ্যালেন্টাইনস ডে আসলে কি জিনিস?

কখনো কি একবারও তা ভেবে দেখেছেন? কি কাহিনী আছে এর পিছনে?

“ভ্যালেন্টাইনস ডে” পালন করা বলতে আসলে কি বোঝায়?

এটা কি একজন মুসলিম জীবনের সাথে মেলে?
তার চেয়েও বড় কথা, এটা কি আসলে কোনোভাবেই আমাদের সাথে খাপ খায়?

কোরআন ও সুন্নাহর দিকে তাকালে এটা সহজেই বোধগম্য যে আমাদের এসব পালন করা ঠিক নয়, কারণ এটা অমুসলিমদের একটা আচার-অনুষ্ঠান। আমরা যা কিছু উদযাপন করতে পারি তা আমাদের আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রসূল (স.) বলে দিয়েছেন এবং এর বাইরে যা কিছু আছে তা পালন করা নিষিদ্ধ।

এ কারণে আল্লাহ তায়ালা বলেছেনঃ
“প্রত্যেক জাতির জন্যেই আমি (ইবাদাতের কিছু আচার) অনুষ্ঠান ঠিক করে দিয়েছি যা তারা পালন করে” {সূরা আল হাজ্জ, আয়াত ৬৭}

আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “প্রত্যেক জাতিরই তাদের নিজস্ব আচার অনুষ্ঠান আছে আর আমাদের হলো এই ঈদ (অর্থাৎ ঈদ আল-ফিতর্ ও ঈদ আল-আজহা)” {সহীহ বুখারী ও মুসলিম}

কিন্তু, যদি এই ঐশ্বরিক আদেশ এখানে নাও থাকতো তবুও মুসলিমদের জন্যে এটা পালন করা উপযুক্ত হতো না।

কেন?

কারণ, যদি আপনি গভীরভাবে ভেবে দেখেন, এ দিন আসলে যা প্রবর্তন করছে ও যে বিষয়ের কেন্দ্রের দিকে আমাদের নিয়ে যাচ্ছে, তা ইসলামের মূলনীতির একেবারে উল্টো। এই দিন যার প্রতি উৎসাহ দেয়, তা আমাদেরকে আমাদের ধর্মের শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়।

এবার দেখা যাক পার্থক্যগুলো কি কিঃ

১. আল্লাহ তায়ালা আমাদের দৃষ্টি নত রাখার আদেশ দিয়েছেন এবং বিপরীত লিঙ্গের প্রতি তাকাতে নিষেধ করেছেন।
“তুমি মুমিন পুরুষদের বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে (নিম্নগামী ও) সংযত করে রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানসমূহকে হেফাযত করে … (একইভাবে) তুমি মুমিন নারীদেরও বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নিম্নগামী করে রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানসমূহকে হেফাযত করে …” {সূরা আন্ নূর, আয়াত ৩০-৩১}

কিন্তু ভ্যালেন্টাইনস ডে মানুষকে ইচ্ছাকৃতভাবে একদৃষ্টিতে তাকাতে ও যাকে আপনার আকর্ষণীয় লাগে তাকে খুঁজে বের করতে ও তাকে নিজের প্রেম-সঙ্গী/সঙ্গীনী বানাতে উৎসাহিত করে।

২. আল্লাহ তায়ালা মুসলিম নারীদেরকে অপ্রয়োজনে বা কোমল কণ্ঠে অপরিচিত পুরুষদের সাথে কথা বলতে নিষেধ করেছেন।
“…তাহলে (অন্য পুরুষের সাথে) কথা বলার সময় কোমলতা অবলম্বন করো না, (যদি এমন করো) তাহলে যার অন্তরে ব্যধি আছে সে তোমার ব্যাপারে প্রলুব্ধ হয়ে পড়বে” {সূরা আল আহযাব, আয়াত ৩২}

এমনকি সাহাবাগণেরও যখন নবী (স.)-র স্ত্রীদের কাছে কোনো কিছু জিজ্ঞাসার দরকার হতো তখনও আল্লাহ তায়ালা তাদের পর্দা করতে বলেছেন। চরিত্রগত গুণাবলীতে রসূল (স.)-এর স্ত্রীদের চেয়ে কে আর পবিত্র হতে পারে বা তাকওয়ার দিক থেকে সাহাবাগণের চেয়ে কে আর উচ্চ হতে পারে?

“তোমাদের যদি নবীপত্নীদের কাছ থেকে কোনো জিনিষপত্র চাইতে হয় তাহলে পর্দার আড়াল থেকে চেয়ে নিয়ো, এটা তোমাদের ও তাদের অন্তরকে পাক সাফ রাখার জন্যে অধিকতর উপযোগী” {সূরা আল আহযাব, আয়াত ৫৩}

এর পরেও, ভ্যালেন্টাইনস ডেতে, আপনারা দেখতে পাবেন ছেলে আর মেয়েরা যারা কোনোক্রমেই একে অপরের মাহরাম (মাহরাম হচ্ছে নিজের স্বামী আর যাদের সঙ্গে ওই মেয়ের বিয়ের অনুমতি নেই, অর্থাৎ এমন সব ব্যক্তি যাদের সঙ্গে তার বিয়ে বৈধ হবে না, যেমন বাবা, ভাই, ছেলে ইত্যাদি কয়েকজন নির্দিষ্ট আত্মীয় পুরুষ) নয়, তারা এ নিষেধকে পেছনে ফেলে আরো বহু দূর চলে যায়। তারা শুধু কোমল কণ্ঠে কথা বলে বা খুনসুটি করে না, বরং তারা একে অপরের প্রতি তাদের ভালোবাসা ও লালসার প্রকাশ ঘটায়।

৩. সুন্নাহ একজন পুরুষ ও একজন নারীকে নির্জনে একত্রিত হতে নিষেধ করে।

রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
“যে আল্লাহ এবং কেয়ামত দিবসে বিশ্বাস রাখে, সে যেন এমন কোন মহিলার সাথে একাকী না হয় যার কোনো মাহরাম তার সাথে নেই, কারণ তখন সেখানে তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে উপস্থিত থাকে শাইতান।” {আহমদ আল-আলবানি একে সহীহ বলেছেন}

কিন্তু যারা ভ্যালেন্টাইনস ডে পালনের নামে উদ্দেশ্যমূলকভাবে নির্জনতা খোঁজে, বেড়াতে বের হয়, তাদের জন্যে আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ

“তোমরা ব্যভিচারের ধারে কাছেও যেয়ো না, নিঃসন্দেহে এ হচ্ছে একটি অশ্লীল কাজ এবং নিকৃষ্ট পথ।” {সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত ৩২}

৪. ইসলাম পুরুষদের না-মাহরাম মেয়েদের স্পর্শ করা থেকে নিষিদ্ধ করেছে।

রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
“তোমাদের কেহ যদি একটি লোহার শলাকা তার মাথায় গেড়ে নেয়, একজন না-মাহরাম মেয়েকে স্পর্শ করা থেকে তবু তা অনেক ভালো” {তাবরানী আল-আলবানি একে সহীহ বলেছেন}

কিন্তু ভ্যালেন্টাইনস ডে যা শিখায় তা স্পর্শ করা থেকেও অনেক বেশী কিছু। এটা ছেলে-মেয়েদের একে অপরকে আলিঙ্গন করা, চুমু খাওয়া, আদর করা এবং আরো অনেক কিছু করাকে প্রবর্তন করে। মহান আল্লাহ তায়ালা এর থেকে আমাদের হেফাযত করুন।

৫. ইসলাম আমাদের নারী-পুরুষের মধ্যকার যে সত্যিকার ভালোবাসা শিক্ষা দেয় এবং যা আল্লাহ তায়ালার তরফ থেকে গ্রহণযোগ্য ও অনুমোদিতও বটে তা হলো স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার ভালোবাসা।

“তাঁর (কুদরতের) নিদর্শনসমূহের (মাঝে) এও (একটি) যে, তিনি তোমাদের জন্যে তোমাদের মধ্য থেকে (তোমাদের) সংগী সংগিনীদের বানিয়েছেন, যাতে করে তোমরা তাদের কাছে সুখ শান্তি লাভ করতে পারো, (উপরন্তু) তিনি তোমাদের মাঝে ভালোবাসা ও (পারস্পরিক) সৌহার্দ্য সৃষ্টি করে দিয়েছেন, অবশ্যই এর মাঝে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্যে অনেক নিদর্শন রয়েছে।” {সূরা আর রুম, আয়াত ২১}

কিন্তু ভ্যালেন্টাইনস ডে তো দুজন না-মাহরাম নারী-পুরুষের মধ্যে হারাম সম্পর্কের অনুমোদন দেয় আর ধর্ম-বিরুদ্ধ ভালোবাসা ও অনৈসলামিক সম্বন্ধকে উৎসাহিত করে।

৬. ইসলাম আমাদের বলে যে হায়া (শালিনতাবোধ) এবং লজ্জাশীলতা হলো অমূল্য সম্পদ।

এটা হলো এমন এক পবিত্রতা ও শুদ্ধতার গুণ যা পুরুষ ও নারীর সকলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
“লজ্জা ঈমানের একটি শাখা।” {সহীহ বুখারী}

অন্যদিকে, এ ভ্যালেন্টাইনস ডে লজ্জাহীনতা ও অশালীনতার পক্ষ সমর্থন করে। যে সমস্ত পুরুষ ও নারীদের আল্লাহর সামনে কোনো লজ্জাবোধ নেই, তারাই এ দিনে একে অপরের জন্যে খোলামেলাভাবে আর নির্লজ্জভাবে একান্ত হয়, একে অপরের কাছে ভালোবাসা কামনা করে অথবা প্রেমি হতে চায়।

___উপসংহার___
আমাদের, মুসলিমদের, ভ্যালেন্টাইনস ডে কোনোভাবেই পালন করা উচিত না, না এটা অনুমোদিত পালন করার জন্যে। এই দিন উপলক্ষে যা কিছুই ঘটে তা সবই আল্লাহ ও তাঁর রসূল (স.)-এর খাঁটি ও অকৃত্রিম শিক্ষার বিপরীত।

এই দিনে এমনকি কাউকে এ উপলক্ষে শুভেচ্ছা জানানো বা যে কোনো উপহার প্রদান করাও উচিত নয়। যদি তা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেও হয়, তবুও নয়, কারণ এটা একটি অমুসলিম আচার-অনুষ্ঠান। আর অবশ্যই, যদি তা হয় নিষিদ্ধ সম্পর্কের ক্ষেত্রে তবে তা তো আরো হারাম।

আমাদের সকলের আল্লাহ তায়ালা প্রদত্ত সীমা দৃঢ়ভাবে অনুসরণ করা উচিত, কোনোভাবেই তা এ কারণে লংঘন করা উচিত নয় যে, অন্যরাও তো করছে।

মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে সত্যিকার মুসলিম থাকার তৌফিক দান করুন যে নিজেকে আল্লাহ ও তার সকল আদেশ-নিষেধের সামনে স্থির ও আন্তরিকভাবে পেশ করে।
আমীন!

“(হে মানুষ), তোমরা যারা ঈমান এনেছো, আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করো, (তোমাদের) প্রত্যেকেরই উচিত (একথাটি) লক্ষ্য রাখা যে, আগামীকাল (আল্লাহর সামনে পেশ করার) জন্যে সে কি (আমলনামা) পেশ করতে যাচ্ছে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করতে থাকো; অবশ্যই তোমরা যা কিছু করছো, আল্লাহ তায়ালা তার পূর্ণাংগ খবর রাখেন।” {সূরা আল হাশর, আয়াত ১৮}

* বোন আসমা বিনত্ শামীম-এর মূল ইংরেজী থেকে অনুদিত।
** লেখাটি যে কেউ তাদের ব্যক্তিগত বা গ্রুপ সাইটে বা ইন্টারনেটের যে কোনো জায়গায় প্রচার করতে পারবেন এবং যে কোন অলাভজনক প্রকাশনায় প্রকাশ করতে পারবেন।

http://www.shobdoneer.com/siddiquee/8063

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: