মাহে রমযানের গুরুত্ব

প্রাপ্ত বয়স্ক মুসলিম নর-নারী যাদের কোন শরয়ী ওযর নেই তাদের উপর রমযানের রোযা পালন করা ফরয। কেউ যদি বিনা ওযরে রোযা না রাখে সে এমন গুনাহ করলো যে, সারাজীবন রোযা রেখেও তার ক্ষতিপূরণ আদায় করতে পারবে না। রাসুল (সঃ) বলেছেনঃ ‘কেউ যদি ওযর ছাড়া রমযানের একটি রোযা না রাখে তবে সারাজীবন রোযা রাখলেও এর ক্ষতিপূরণ হবে না’। (মিশকাতুল মাসাবীহ) হাদিস শরিফে এসেছে-‘যখন রমযান মাস শুরু হয় তখন আকাশের রহমাতের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেয়া হয়। আর শয়তানগুলোকে শিকলে আবদ্ধ করে দেয়া হয়’। (বুখারী)

হাদিস শরিফে উল্লেখ আছেঃ ‘যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সওয়াবের আশায় রোযা পালন করে, তার অতীতের সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে’। (বুখারী) এ ছাড়াও পরকালে জান্নাতে রোযাদারদেরকে অন্যদের তুলনায় সম্পূর্ণ আলাদাভাবে আল্লাহ রিসিভ করে জান্নাতে প্রবেশের ব্যবস্থা করবেন। রাসুল (সঃ) বলেনঃ ‘জান্নাতে রাইয়্যান নামে একটি দরজা আছে, এ দরজা দিয়ে রোযাদারগণ প্রবেশ করবেন। অন্য কেউ প্রবেশ করবে না। ঘোষণা দেয়া হবে রোযাদারগণ কোথায়? তখন তারা দাঁড়াবে। তাদের প্রবেশের পর এ দরজাটি বন্ধ করে দেয়া হবে, যাতে অন্য কেউ এ দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে না পারে’। (বুখারী) রোযাই একমাত্র ইবাদত যা বান্দাহ আল্লাহর প্রতি চরম পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে কেবল তারই সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে পালন করে থাকে। তাই আল্লাহ রোযার প্রতিদান সরাসরি নিজ হাতে দেয়ার ওয়াদা করেছেন। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ বলেনঃ ‘রোযা আমার জন্য আমিই এর পুরস্কার-প্রতিদান দেবো’। কোন কোন হাদিসের ব্যাখ্যাকার বলেছেন, ‘আল্লাহ নিজেই বান্দার প্রতিদান হয়ে যাবেন’। অতএব, যে ইবাদতের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে এত বড় পুরস্কারের ঘোষণা এসেছে সে ইবাদত অবশ্যই নিষ্ঠা ও আন্তরিকতায় পরিপূর্ণ হওয়া জরুরি।

রমযান মাসে মুমিনের ইবাদতের সাওয়াব বৃদ্ধি করা হয় বহুগুণে। হাদিসের ভাষায়ঃ ‘আদম সন্তানের প্রতিটি নেক আমলের সওয়াব দশগুণ হতে সত্তরগুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়’। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, কেউ যদি ‘আলহামদুলিল্লাহ’ এই নয়টি হরফের শব্দটি একবার উচ্চারণ করে ১০ নেকী হিসাবে ৯০ নেকী পাবে। ওযুসহ পড়লে ২১৫ নেকী, বসা নামাযে পড়লে ৪৫০ নেকী, নামাযে দাঁড়িয়ে পড়লে ৯০০ নেকী আর রমযানে পড়লে ৭০ গুণ হিসাবে ৬৩০০০ নেকী পাওয়া যাবে। তাই এ মাসে বেশি বেশি করে নেক আমল করা দরকার।

মাহে রমযানের এত বেশি গুরুত্ব মূলত পবিত্র কুরআনের কারণে। এ মাস কুরআন নাযিলের মাস। তাই এ মাসে কুরআন অধ্যয়ন করতে হবে, কুরআন নাযিলের প্রকৃত উদ্দেশ্য অনুধাবন করে সে অনুযায়ী আত্মগঠন করতে হবে। মনকে ইবাদতের মাঝে নিবিষ্ট করার জন্য অর্থ বুঝে নামাযে কুরআন পড়তে হবে। রমযানে কুরআন তিলাওয়াতের গুরুত্ব সমধিক। হাদিসে এসেছেঃ ‘রোযা ও কুরআন রোযাদার ব্যক্তির জন্য শাফাআত করবে। রোযা বলবে হে আল্লাহ! আমি অমুক ব্যক্তিকে দিনের বেলা পানাহার ও কামনা-বাসনা থেকে ফিরিয়ে রেখেছি, তার পক্ষে আপনি আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। আল্লাহ সুপারিশ গ্রহণ করবেন। এভাবে কুরআন সুপারিশ করবে এই বলে যে, হে আল্লাহ! আমি এ ব্যক্তিকে রাত্রের নিদ্রা থেকে বিরত রেখেছি আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন, আল্লাহ তার সুপারিশ গ্রহণ করবেন।(বায়হাকী)। ব‘ত মানব ইতিহাসের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা কুরআন নাযিলের ঘটনা। কুরআনের আলোকেই মানব জীবনকে সাজাতে হবে, ব্যক্তি পরিবার সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কুরআন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সূর্যবিহীন সৌরজগৎ যেমন নিষ্প্রভ ও তিমিরাচ্ছন্ন তেমনি কুরআনবিহীন মানব সমাজ নিরর্থক ও অকল্পনীয়। মাহে রমযান থেকে এ শিক্ষা নেয়া জরুরি।

রাসুল (সঃ) বলেছেনঃ ‘রোযা রেখে যে মিথ্যা পরিত্যাগ করতে পারল না তার পানাহার ত্যাগ করার আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই (বুখারী, মুসলিম)। অন্য হাদিসে আছে ‘কিছুসংখ্যক রোযাদার রোযার ক্ষুৎ পিপাসায় কষ্টভোগ ছাড়া আর কিছুই লাভ করে না। আবার কিছুসংখ্যক রাতজাগা লোকের রাত্রি জাগরণ ছাড়া আর কিছুই লাভ করে না’। তাকওয়া এমন একটি মহৎ গুণ যার মাধ্যমে রিযিকের ফায়সালা হয় এবং বরকতের দরজা উন্মুক্ত হয়ে যায়। আল্লাহ বলেনঃ ‘যদি লোকালয়ের লোকেরা ঈমান আনে তাকওয়া অবলম্বন করে, তবে আমি তাদের জন্য আকাশ ও জমিনের বরকতসমূহের দরজা খুবে দেব (সুরা আরাফঃ ৯৬)।

নুষের পাশাবিক শক্তি নিয়ন্ত্রিত হয়ে নৈতিক ও চারিত্রিক শক্তিতে পরিশুদ্ধতা আসে; রোযা মানুষকে শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে রক্ষা করে; শারীরিক সুস্থতা ও আত্মিক পরিতৃপ্তি অর্জিত হয়; রোযার দ্বারা বান্দা আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা লাভের সুযোগ পায়; মানুষের মনে আল্লাহ তা আলার মাহাত্ম্য ও বড়ত্বের ধারণা জাগ্রত হয়; গরিব দুঃখী ও অভাবী মানুষের প্রতি ভ্রাতৃত্ব ও মমত্ববোধ সৃষ্টি হয়; বান্দা এক মাসের সিয়াম সাধানায় বাকি এগারো মাসের প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত হয়; রোযার চূড়ান্ত লক্ষ্য তাকওয়ার মত মহৎ গুণ অর্জিত হয়; সিয়াম পালনের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে এক ধরনের রূহানী শক্তি ও জযবা তৈরি হয়; রোযার দ্বারা পরিমিত খাদ্যাভাস ও জীবনধারায় নিয়মানুবর্তিতা ফিরে আসে; রোযার দ্বারা মানুষের মধ্যে ফিরিশতা চরিত্র সৃষ্টি করে; মানুষের মধ্যে বিনয় নম্রতা সদ্ব্যবহারের মত নৈতিক গুণাবলী অর্জিত হয়; রোযার দ্বারা মানুষ দানশীল ও আল্লাহর পথে ব্যয় করতে উদ্বুদ্ধ হয়; ইবাদত-বন্দেগীতে গতিশীল হয়ে মানুষ কুরআন ও হাদিসচর্চায় মনোনিবেশ করে। এ ছাড়াও রোযার বহু উপকারিতা রয়েছে।

পরিশেষে বলা যায়, বিধান মানুষের কল্যাণের জন্যই করা হয়েছে। কল্যাণ ও সৌভাগ্যে পরিপূর্ণ এ মাসেই মুসলমানদের ঐতিহাসিক বিজয়গুলোর অর্জিত হয়েছে। মর্যাদাগত দিক থেকে এ মাসের এবাদদ-বন্দেগী পূণ্যে পরিপূর্ণ। এ কারণে এ মাসের নফল ইবাদত ফরযের সমান আর একটি ফরয ইবাদতের সওয়াব সত্তরটি ফরযের সমান। তাই আমাদের সামর্থের সকল প্রচেষ্টা দিয়ে রমযানের ইবাদতে ব্রতী হওয়া জরুরি। ঈমানী চেতনাকে শানিত করতে রমযান মহাসুযোগও বটে।

Permission is taken from Source   http://prothom-aloblog.com/users/base/lovelu1977/

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: