মুসলমান পরস্পরের আমানত

Permission is taken from Source   http://prothom-aloblog.com/users/base/lovelu1977/

ইসলামে ইবাদতের ধারণা এবং এর স্বরূপ যেমন ব্যাপক, গুনাহ কিংবা পাপের পরিধিও তেমন বিস্তৃত। হাতেগোনা কিছু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে যেমন ইবাদত সীমাবদ্ধ নয়, তেমনি স্বল্পসংখ্যক অনুষ্ঠান পালন না করার মধ্যেও গুনাহ সীমিত নয়। আল্লাহতায়ালার জন্য নিবেদিত যে কোনো আমলের পাশাপাশি ইবাদতের সীমানার বিরাট একটি অংশ রয়েছে মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক সূত্র। মূলত ইবাদত ও নাফরমানি এবং সওয়াব ও গুনাহর যে ব্যাপক ধারণা ও পরিচিতি ইসলাম আমাদের উপহার দিয়েছে, তাতেই মানবিকতাকে ইবাদত ও অমানবিকতাকে গুনাহ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ কারণেই মানবিকতা পোষণ করার মানেই হল আল্লাহ তায়ালার নির্দেশের সামনে আত্মনিবেদন করা আর অমানবিকতা, জুলুম ও অন্যায়কে ধারণ করার মানেই হল আল্লাহর অবাধ্যতার পথে নিজেকে পরিচালিত করা।

ইবাদত ও পূণ্যের, নাফরমানি ও পাপের এই জীবনাদর্শ ইসলামের চোখে বান্দার হক বা মানুষের অধিকারের গুরুত্ব অপরিসীম। ইসলামী জীবনাদর্শ ও জীবন বিধানের সমৃদ্ধ ভাণ্ডারে মানুষের প্রতি মানুষের অধিকার বিষয়ে, তাই স্বতন্ত্র একটি অধ্যায়ের উজ্জ্বল অবস্থান আমরা লক্ষ্য করি। সেই অধ্যায়ের নাম হল ‘হক্কুল ইবাদ’। হক্কুল ইবাদ ধ্বংস করে কিংবা উপেক্ষা করে আখেরাতে নাজাত ও কামিয়াবী অর্জন করা অসম্ভব। হক্কুল ইবাদের বিশাল ভুবনের মধ্য থেকে যদি শুধু মুসলমানের হক কিংবা অধিকার ও দায়িত্বের সম্পর্ক নিয়েই আলোচনা হয়, তাহলেও দেখা যাবে-আমাদের সামনে অধিকার ও দায়িত্বের একটি আকর্ষণীয় দিগন্ত উন্মোচিত হয়ে গেছে। রাসূলের আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এরশাদ-’নিশ্চয়ই আমি সদাচরণে পূর্ণতা দানের জন্য দুনিয়াতে প্রেরিত হয়েছি।” অন্য এক হাদীসে রয়েছে-‘পূর্ণ মুসলমান ঐ ব্যক্তি যার জিহবা ও হাত থেকে অন্যান্য মুসলমান নিরাপদে থাকে।’ (বুখারী)

এই হাদীসে উল্লেখিত ‘জিহবা ও হাত’-এর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কোরআনে শরীফ ও হাদীস শরীফের বিভিন্ন বর্ণনা ও উদ্ধৃতি পর্যালোচনা করে মুহাদ্দিসগণ বলেছেন, হাদীসে উল্লেখিত ‘জিহবা ও হাত’ দ্বারা কেবল জিহবা ও হাতকেই বোঝানো হয়নি, বরং সকল অঙ্গ প্রত্যঙ্গসহ সব ধরনের উদ্যেগ ও প্রয়াসকেই অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রধান দুটি অঙ্গ্‌ হিসাবে এ দুটি মূলত প্রতীকরূপে উল্লেখ করা হয়েছে। মুসলমানের প্রতি মুসলমানের আচরণ ও মনোভাবের প্রকৃতি ও ধরনকে চিহ্নিত করে কোরআন শরীফে উল্লেখ করা হয়েছে- ‘রুহামা-উ বাইনাহুম’-‘তারা পরস্পরের প্রতি পরস্পর অত্যন্ত কোমল ও সদয়।’ (ফাতাহ)। একই ধরনের আরও আয়াত রয়েছে। হাদীস শরীফেও মুসলমানের পারস্পরিক সম্পর্কের কোমলতা, দয়ার্দ্রতা ও সৌজন্যের কথা উল্লেখের পাশাপাশি তাদের মাঝে কল্যাণকর অনেক দয়া ও দায়িত্বের কথা বর্ণিত হয়েছে।

মুসলমানের প্রতি মুসলমানের এই দায়িত্বের অভিব্যক্তি কিভাবে ঘটবে? মুসলমানের মধ্যে থেকে একজন অপরজনের জানের, মালের ও সম্ভ্রমের উপর কোন আঘাত হানতে পারবে না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, ‘মুসলমানকে গালি দেয়া গুনাহের কাজ এবং তার সঙ্গে যুদ্ধ করা কুফরের সমতুল্য।’ (মুসলিম)

অন্য এক হাদীসে এসেছে, প্রত্যেক মুসলমানের জন্য অপর মুসলমান ভাইয়ের ধন-সম্পদ, ইজ্জত-আব্রু ও রক্ত হারাম। কোন মুসলমানের জন্য এই পাপই যথেষ্ট যে, সে তার মুসলমান ভাইকে ঘৃণা ও অবহেলার চোখে দেখবে।’

অপরদিকে এই দায়িত্বের ইতিবাচক প্রকাশটা হচ্ছে, একজনের প্রতি অপরজন ন্যায়পরায়ণতা পোষণ করবে, ব্যক্তিগণ পর্যায়ের অপরাধ ক্ষমা করে দিব, সদাচরণ করবে· দয়া, কোমলতা ও সৌজন্য প্রকাশক আচরণ করবে এবং যে কোন পর্যায়ের প্রাপ্য সাধ্যানুযায়ী দ্রুত সময়ে অপরজনকে পৌঁছে দেবে। পবিত্র কোরআন-হাদীসে এ বিষয়গুলো অবলম্বনের তাগিদ এসেছে ও অনুপ্রেরণা এসেছে; এ বিষয়গুলো অবলম্বন না করার ক্ষেত্রে শাস্তির ধমক এসেছে এবং সতর্কতামূলক বক্তব্য এসেছে। এছাড়াও হাদীস শরীফে মোটা দাগে মুসলমানদের মধ্য থেকে একের প্রতি অন্যের বিশেষ ধরনের পাঁচটি হক বা অধিকারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেগুলো হলঃ ১· সালামের জবাব দেয়া, ২· কেউ হাঁচি দিয়ে আলহামদুলিল্লাহ বললে জাবাবে ইয়ারহামুকাল্লাহ বলা। ৩· দাওয়াত দিলে দাওয়াত কবুল করা, ৪· কেউ অসুস্থ হলে তাকে দেখতে যাওয়া। ৫· জানাযায় অংশগ্রহণ করা। কোন কোন রেওয়ায়েতে অতিরিক্ত আরও দু’-একটি হক বা অধিকারের উল্লেখ রয়েছে। এ থেকে বোঝা যায়, মুসলমান তথা মানুষের অধিকারের প্রতি যত্নবান হওয়া, তার প্রতি সদাচরণ করা গুরত্বপূর্ণ কাজ। এই কাজ করতে পারলে সওয়াব হবে করতে না পারলে গুনাহ হবে। ধর্মসম্মত জীবনযাপন করতে হলে এই বিষয়টিকে উপেক্ষা করার উপায় ধর্মীয়ভাবে নেই। পবিত্র কোরআন ও হাদীসের আলোকে মুসলমানদের পরস্পরের দায়িত্বপূর্ণ সম্পর্কের যে মাধুর্যপূর্ণ আদল স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তাতে সমগ্র মুসলমান সমাজ ও জাতিকে একটি পরিবার কিংবা একটি দেহের সঙ্গেই তুলনা করা যায় এবং হাদীস শরীফে তা করাও হয়েছে। একের প্রতি অন্যের দায়িত্বের ক্ষেত্রে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব, ভালবাসা ও সহানুভূতির যে মমতাপূর্ণ আদর্শের আয়না ইসলাম আমাদের সামনে পেশ করেছে, এ শুধু প্রয়োগ ও প্রাকটিসমুক্ত কোন তত্ত্বকথা নয়; বাস্তব অনুশীলন ও চর্চার মধ্যদিয়ে এই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের উজ্জল চেহারা উন্মোচন করে গেছেন, ইতিহাসের সামনে নিজেদেরকে মেলে ধরেছেন সাহাবায়ে কেরাম।

পারস্পরিক অবিশ্বাস ও যন্ত্রণার এই দুঃসহ সময়ে আমাদের উচিত সেই আয়নার সামনে দাঁড়ানোর প্র‘তি গ্রহণ করা। সমাজের প্রতি, জাতির প্রতি, অন্যের প্রতি দায়হীন, দায়িত্বহীন নিষ্ফল নিজস্বতা ও ধ্বংসাত্মক বিচ্ছিন্নতা পরিহারের পথ ধরেই আমাদেরকে এই দুনিয়ায় বাঁচতে হবে। হাদীসের একটি সুন্দর উপমা চেতনায় জাগ্রত করে। সফল দুনিয়া যাপনের প্র‘তি আমরা নিতে পারি। সেই উপমাটি হল-গোটা মুসলমান সমাজ একটি ব্যক্তির মতো। যদি তার চোখ অসুস্থ হয়, তাহলে তার সারা দেহই অসুস্থ হয়ে যায়। যদি তার মাথা ব্যাধিগ্রস্ত হয়, তাহলে সমগ্র দেহই ব্যাধিগ্রস্ত হয়, তাহলে সমগ্র দেহই ব্যাধিগ্রস্ত হয়ে পড়ে (মুসলিম)।

Permission is taken from Source   http://prothom-aloblog.com/users/base/lovelu1977/

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: