ইসলাম প্রচার, সেই সব মনিষীদের ভূমিকা : পর্ব -০৮

মাওলানা রুমী আলোকিত বিশ্বের সূফী কবি

আটশত বছর পূর্বে পারস্য বিস্তৃত ছিল বিশাল ভূখণ্ডজুড়ে। আফগানিস্তান, ইরাক, তুরস্ক এবং উত্তর ভারতের কিছু অঞ্চল পারস্যের সাথে একীভূত ছিল। আরবের ইসলাম দ্রুত প্রসার লাভের মধ্য দিয়ে পারস্য সূফীবাদ চর্চার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। বর্তমান সূফীবাদের চারণভূমি হিসাবে এ অঞ্চলটি সুপরিচিত। প্রাপ্ততথ্য অনুযায়ী পৃথিবীতে আগমনকারী দুই-তৃতীয়াংশ সূফীর জন্ম পারস্যে। ইবরাহীম আদহাম, শাকীক বালখী, ফাজেল ইবনে আয়াজ, বায়েজীদ বোস্তামী, হুসাইন, ইবনে মনসুর হাল্লাজ, আবু আলী রম্নদবারী, আবু নাসর শিরাজ তুসী, উসমান হিজভিরী গাজনাভী, ইমাম আবু হামেদ গাজ্জালী তুসী, আবদুর কাদের জিলানী, শেখ ফরিদউদ্দীন আত্তার নিশাবুরী, মাওলানা জালালউদ্দীন রুমী, খাজা হাফেজ শিরাজী, আবদুর রহমান জামী প্রমুখ অন্যতম। তারা রচনা, কর্ম-পদ্ধতির মধ্যদিয়ে আজো বেঁচে আছেন। বর্তমান বিশ্বজুড়ে এমন একজন সূফীর নাম আলোড়িত হল যার কাব্যগ্রন্থটি ‘মসনবী শরীফ’ হিসেবে খ্যাত। তিনি ফারসি ভাষার কবি মাওলানা জালালউদ্দীন রুমী। পাঁচ বছর বয়সের সময় তাকে দেখে শায়খ ফরিদউদ্দীন আত্তার যে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন সেই বিশ্ব আলোকিত সূফী কবি ২০০৬ সালে আন্তর্জাতিক সম্মানে ভূষিত হন।

ইউনেস্কো (UNESCO) কর্তৃক ২০০৭ খ্রিস্টাব্দটি International Rumi year বা মাওলানা জালালউদ্দীন রুমীর বছর নামে আখ্যায়িত হয়। বিশ্ব এবছর মাওলানা রুমীর ৮০০তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন করছে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়।

‘মৌলভী’ বা ‘মোল্লা রুমী’ নামে খ্যাত মোহাম্মদ জালালউদ্দীন ছিলেন ইসলামের ইতিহাসে বড়মাপের একজন আরেফ। অধ্যাপক ঈ• জী• ব্রাউন বলেন – ‘The most eminent Sufi poet whom Persia has produced’• তিনি ফারসি-ভাষাভাষী কবিদের অন্যতম। ১২০৭ খ্রিস্টাব্দে পারস্যের খোরাসান প্রদেশের অন্তর্গত ‘বালখ’ নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা বাহাউদ্দীন ছিরেন যুগশ্রেষ্ঠ আলেম এবং অসামান্য পরহেজগার ব্যক্তি। তৎকালীন শাসক সুলতান মুহাম্মদ খাওয়ারযম শাহ রাজনৈতিক কারণে এ পরিবারের প্রতি অসন্তুষ্ট ছিল। ফলে শৈশবেই তিনি পিতার সাথে জন্মস্থান ত্যাগ করে পূর্বরুমের কওনিয়া শহরে যেতে বাধ্য হন। একাধিক সূত্র অনুযায়ী ১২৭৩ খ্রিস্টাব্দে সূর্যাস্তের সময় কওনিয়ায় ইন্তেকাল করেন। এ কারণে নামের শেষে ‘রুমী’ শব্দটি সর্বাধিক প্রচলিত হয়ে আছে।

মাওলানা রুমী বাল্যকালেই ইসলামের তথ্য-জ্ঞান, হাদীস, তাফসীর, দর্শন এবং যুক্তিবিদ্যার উপর অগাধ জ্ঞানের অধিকারী হন। তিনি পারস্যের জ্ঞান-চর্চার কেন্দ্রবিন্দু ব্যতীত সিরিয়া এবং মিশরের বিভিন্ন শিক্ষাকেন্দ্র থেকে যুগোপযোগী শিক্ষা লাভ করেন। তিনি শায়খ ফরিদউদ্দীন আত্তার, শায়খ বোরহানউদ্দীন, শায়খ মহিউদ্দীন ইবনুল আরাবী, শায়খ সাদউদ্দীন হামাবী, শায়খ উসমান রুমী, শায়খ সাদারম্নদ্দীন কুনুবী এবং শায়খ শামসুদ্দীন তিবরিজীর সাহচর্য পান। তাদের তত্ত্বাবধানে এসে তরীকত ও মারেফতের গুপ্ত রহস্য এবং গুরুত্ব সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করেন। তিনি পিতার মৃত্যুর পর দশ বছর আধ্যাত্মিক শিক্ষায় আত্মনিয়োজিত ছিলেন।

১২৪৪ খ্রিস্টাব্দে মাওলানা রুমীর জীবনে এক বিস্ময়কর বিপ্লব সাধিত হয়। জীবন-পরিবর্তনের মূলে ছিল শামসুদ্দীন তিবরিজীর প্রত্যক্ষ প্রভাব। তার অলৌকিক শক্তির মাধ্যমে রুমীর জীবনে এক ঐশী শক্তির বিচ্ছুরণ ঘটে। তিনি তার সাগরিদত্ব গ্রহণ করে একাধারে তিন মাস ধ্যানমগ্ন ছিলেন। মাওলানা রুমি তার মুর্শিদ সম্পর্কে বলেন, ‘শামসুদ্দীন তিবরীজ একটি সূর্য ঔজ্জ্বল্যে পরিপূর্ণ। তিনি ইউসুফ আঃ-এর পোশাকের ঘ্রাণ পেয়েছেন আমি তার সম্পর্কে কি বলব। আমার একটি শিরাও ঠিক নেই। এই বন্ধুর ব্যাখ্যা প্রদান বন্ধুর কাজ নয়।’ (মাসনভীঃ ১ম দপ্তর) বস্তুত মারেফাত শিক্ষার কঠিন পথ অতিক্রম করার মধ্য হল মুর্শিদ। মুর্শিদবিহীন মারেফাত শিক্ষা কন্টকাকীর্ণ। মুর্শিদের প্রতি গভীর আকষর্ণের মধ্য দিয়ে মাওলানা রুমীর কবিত্বের জন্ম।

রুমীর চিন্তা-দর্শন পরিপক্ব এরফানী চেতনায় সমৃদ্ধ। তার এই আধ্যাত্মিক দর্শন শায়খ ফরিদউদ্দীন আত্তার, হাকিম সানাঈ এবং শামস তাবরিজীর মাধ্যমে লালিত হয়েছিল। তিনি তাদের স্তর অতিক্রম করে একটি উন্নত এবং বিস্তৃত পরিসরে নতুন দর্শন দিতে সক্ষম হন। তার মতে এই বিশ্ব প্রেমের জন্য সৃষ্টি। প্রেমই জীবনের রহস্য। প্রেমের জন্য বাঁশীর বুকে সঙ্গীত ধ্বনি উঠে। তিনি বলেন, বেশনো আয ন্যায় চুন হেকায়েত মিকুনাদ, আজ জাদাঈহা শিকায়েত মিকুনাদ। ‘অর্থাৎ- কান পেতে শোন বাঁশী কি অবস্থা বর্ণনা করছে, বিরহ-বিচ্ছেদের অভিযোগ করেছে।’ তার চিন্তা-ধারা সেই আপনহারা লোকদের জন্যে যে আল্লাহর প্রেমের অনলে দগ্ধীভূত। একমাত্র আল্লাহ ব্যতীত অন্যকিছুই জীবনের কাম্য নয়।

রুমীর রচনার প্রধান বৈশিষ্ট্য হল আশাবাদ (Optimism)। মানুষ বিরহ-বেদনা, দুঃখ-কষ্টের মধ্যেও বেঁচে থাকবে- কোন হতাশ নৈরাশ্য নয়। তিনি গদ্য ও পদ্যাকারে একাধিক রচনা রেখে গিয়েছেন। তন্মধ্যে ‘দীওয়ান’, ‘মাসনভীয়ে মা’নাভী’, ‘মাকাতীব’, ‘মাজালীশ’ এবং ‘ফীহে মা ফীহে’ উল্লেখযোগ্য। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ হলো মাসনভীয়ে মা’নাভী। এটি বিশ্বে সূফী গ্রন্থ হিসেবে প্রসিদ্ধ লাভ করেছে। ইসলামী সাহিত্যের ভাণ্ডারে এরূপ গ্রন্থের অস্তিত্ব দ্বিতীয়টি নেই। মাওলানা রুমী বলেন, ‘মাসনভী গ্রন্থ রহস্য উদঘাটনে ধর্মের মূলনীতিসমূহের শিকড়। এটি মহান প্রভুর সর্বাপেক্ষা সুস্পষ্ট দলিল।’ (মাসনভীঃ মুকাদ্দমা) এই মাসনভী শরীফ বিশাল জ্ঞান-ভাণ্ডারে পরিপূর্ণ। এই জ্ঞান-ভাণ্ডার থেকে প্রত্যেকে জ্ঞানের পরিধি অনুসারে লাভবান হতে সক্ষম। অসংখ্য বাস্তব কল্প-কাহিনী, উপকথা, নীতি-গল্প কাহিনীর মাধ্যমে তরীকত, হাক্কীকত এবং মারেফাতের গূঢ় রহস্য উন্মোচন, আল্লাহর মহব্বত, কামেল পীরের পরিচয়, পরলৌকিক সুখ-শান্তি লাভের উপায় এবং আল্লাহর অস্তিত্ব বিষয়ের বর্ণনা এই মাসনভীতে রয়েছে। কাব্য-রসিক পাঠক সাধারণ এবং কোরআন মজিদের সারমর্ম অনুধাবনে আগ্রহী সকল শ্রেণীর মানুষের প্রয়োজনীয়তার উপর গুরুত্ব আরোপ করেই মাসনভী শরীফ আখ্যায়িত হয়েছে মরমী কাব্যরূপে। এই কাব্যগ্রন্থটি বাংলাদেশে সমধিক পরিচিত। ধর্মীয় শিড়্গা-প্রতিষ্ঠান এবং অন্যত্র স্থানেও পাঠ ও পাঠের বহির্ভূত সূফীবাদ হিসেবে স্থান করে আছে। এখনো সমাজের বুদ্ধিদীপ্ত, জ্ঞানীদের কাছে কোরআন ও হাদীস শরীফের পাশে মসনভী-কাব্যগ্রন্থটি বিশেষ শ্রদ্ধায় শোভা পায়। ফরাসি ভাষার এই কাব্যটির প্রভাব বিশ্বের উন্নত দেশসমূহে বিদ্যমান। বর্তমান সর্বাধিক প্রচলিত ১৫টি ভাষায় অনুবাদ প্রকাশিত হয়।

বাংলা-ভাষাভাষী মুসলমানদের নিকট নতুন করে মাসনভীর পরিচয় দানের বিষয়টি আবশ্যক নয়। কেননা এদেশে ইসলাম প্রচারের সাথে ফারসি ভাষার মাসনভী গ্রন্থটি ওতপ্রোত। ড• মুহাম্মদ এনামুল হকের মতে সূফীরা ইসলাম প্রচারের সময় মাসনভীকে এদেশে জনপ্রিয় করে তুলতে সচেষ্ট হন। এর প্রমাণ ষোড়শ শতাব্দীর কবি জয়ানন্দ রচিত ‘চৈতন্য-মঙ্গল’ কাব্য। তিনি বলেন, ‘মসনভী আবৃত্তি করে থাকে নলবনে। মহাপাপী জাগাই মাধাই দুই জনে।’ এ কবিতার মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, বাংলার হিন্দু-মুসলমান উভয়ই এ গ্রন্থটি পাঠ করতেন। মাসনবীর প্রর্শসায় আব্দুর রহমান জামী (১৪১৪-১৪৯২) বলেন, ‘মাসনভীয়ে মৌলাবীয়ে মা’নাবী। হাস্ত কোরআন দর যাবানে পাহলবী ।। অর্থাৎ, মৌলাবীর মসনভী তত্ত্বগরীয়ান। পহলভী ভাষায় এই অমর কোরান। (অনুবাদক মুহাম্মদ এনামুল হক) আত্মার সৌন্দর্যে মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব। যে আত্মায় প্রেম নেই সে আত্মা মৃত। আত্মাময় মানুষের জন্য প্রয়োজন আত্মোদ্‌ভাসিত বাণী। সেই অমীয় বাণী গভীর আধ্যাত্মিক তত্ত্বপূর্ণ গ্রন্থ মাসনভী।

‘ফারসি’ একটি প্রাচীন ভাষা। এ ভাষার কবি, সাহিত্যিক, দার্শনিক, আরেফ, সূফী বিশ্বে পরিচিত। মাওলানা রুমী বিশ্বকে নতুনভাবে পরিচয় করিয়ে শুধু এ ভাষার শ্রেষ্ঠত্বতাই প্রমাণ করেননি- ইসলামের এরফান ও সূফীবাদের বিষয়টি সমুন্নত করেছেন। ইংরেজ শাসনের পূর্বকাল পর্যন্ত এদেশে ফারসি চর্চার ধারা অব্যাহত ছিল। আধুনিক যুগে এসে আমরা সুমধুর ভাষাটির সাহিত্য-চর্চা থেকে অনেক দূরে চলে এসেছি। এর ফলে ভাষা-সাহিত্যের সৌন্দর্য, মাধুর্য এবং হৃদয়বৃত্তির অনুশীলন থেকে আমরা বঞ্চিত। অপরদিকে ইসলামের দ্বিতীয় ভাষাটির মমার্থ উপলব্ধি করতে হলে এ ভাষার দার্শনিক, কবি, সাহিত্যিক এবং সূফীদের গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। ফারসি ভাষার জ্ঞান লাভের বিষয়টি যথাযথ না হলে এ ভাষার সম্পদ অনায়াসে অগোচরেই থেকে যাবে। শ্রেষ্ঠ সূফী কবি জালালউদ্দীন রুমীর সূফীবাদ অনুপ্রাণিত মাসনভী শরীফ বিশ্ব সাহিত্যের এক অমূল্য রত্ন। মানব প্রেম জাগ্রত হউক। বিশ্ব ফিরে পাক ঐশী-শক্তির সন্ধান।

Permission is taken from Source   http://prothom-aloblog.com/users/base/lovelu1977/

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: