ইসলাম প্রচার সেই সব মনিষীদের ভূমিকা : পর্ব -০৩

হাদিস শাস্ত্রের অগ্রদূত ইমাম বোখারী (রঃ)

ইমাম বোখারী (রঃ) ছিলেন হাদীস শাস্ত্রের এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং বর্তমানে উজবেকিস্তানের অধীনে সুসলিম অধ্যুষিত একটি নগরীর নাম বোখারা। মুসলিম বিশ্বের প্রায় সকলেই এই শহরটির নাম জানেন। বিশ্ববরেণ্য হাদীস শাস্ত্রবিদ ইমাম রোখারী (রঃ) এই নগরীতে ১৯৪ হিজরী সালের শাওয়াল মাসের ১৩ তারিখ জুমু’আর নামাযের পর জন্মগ্রহণ করেণ। ইমাম বোখারী (রঃ)-র পূর্ণ নাম মাহাম্মদ ইব্‌ন ইসমাই’ঈল ইব্‌ন ইবরাহীম ইব্‌ন মুগীরাহ ইবন বারদিযবাহ আল- বোখারী আল-জুফী। উপনাম আবু আব্দিল্লাহ। তিনি বোখারী নগরে জন্মগ্রহণ করার কারণেই বোখারী নামে পরিচিতি লাভ করেন। তাঁর পিতা ইসমা’ঈল ছিলেন একজন খ্যাতিসম্পন্ন ও বিশিষ্টি মুহাদ্দিস এবং তিনি ইমাম মালিক (রঃ) এর একজন অন্যতম ছাত্র ছিলেন। তিনি অত্যন্ত পূতঃপবিত্র চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। অবশ্য তাঁর দাদা ইবরাহীম সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায় না। ইমাম বোখারী (রাঃ) এর মাতা ছিলেন বিদূষী ও মহীয়সী নারী। নেককার মহিলা হিসেবে তাঁর বিশেষ পরিচিতি ছিল। ইমাম বোখারী (রাঃ) শৈশবকালেই পিতৃহারা হন। এরপর তিনি তাঁর মাতার তত্ত্বাবধানে প্রতিপালিত হন। বাল্যকালে ইমাম বোখারী (রঃ) বসন্ত রোগে আক্রান্ত হন। এর ফলে তাঁর দুটি চোখ প্রায় অন্ধ হয়ে যায়। স্নেহময়ী মাতা এর ফলে অত্যন্ত ব্যাকুল হয়ে পড়েন এবং মহান আল্লাহর দরবারে ছেলের আরোগ্য প্রার্থনা করেন। মায়ের দু’আ আল্লাহ পাকের দরবারে গৃহীত হয় এবং তিনি চোখের জ্যোতি ফিরে পান। এ সম্পর্কে আল্লামা কিরমানী (রঃ) বলেন, “তার মাতার দু’আ আল্লার নিকট কবুল হত। শৈশবে ইমাম বোখারী (রঃ) দৃষ্টিহীন হয়ে যান। এক রাতে তিনি স্বপ্নে দেখলেন হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাঁকে বলছেন, “ওহে ! তোমার অধিক দু’আ অথবা ক্রন্দনের কারণে আল্লাহ তা’আলা তোমার ছেলের দৃষ্টিশক্তি ফিরেয়ে দিয়েছেন। অতঃপর তিনি দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন হয়ে যান।”

ইমাম বোখারী (রঃ) এর পিতা মৃত্যুর সময় প্রচুর ধন-সম্পদ রেখে যান। এর ফলে তাঁকে অর্থনৈতিক দিক থেকে কোনরূপ প্রতিকূল অবস্থর সম্মুখীন হতে হয়নি। তাঁর মাতাই পুত্রের শিক্ষা-দিক্ষার যাবতীয় ব্যবস্থা সম্পন্ন করেন। ইমাম বোখারী (রঃ) বাল্যকাল থেকেই শিক্ষার ব্যাপারে অত্যন্ত অনুরক্ত ছিলেন। তিনি প্রথমে পবিত্র কোরআন পাঠ শুরু করেন। মাত্র নয় বছর (অথবা ছয় বছর) বয়সে তিনি কোরআন মুখস্থ করেন। কোরআন মুখস্থ করার পর তিনি হাসীস শাস্ত্রে মনোনিবেশ করেন। এ পর্যায়ে প্রথমেই তিনি ইবনে মুবারক (রঃ) ও আকীহ (রঃ) সংকলিত হাদীস গ্রন্থসমূহ মুখস্থ করে ফেলেন। ইমাম বোখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন আমি লেখাপড়া আরম্ভ করার পর দশ বৎসর বয়সে আমার অন্তরে এলহাম হয় যে, আমি যেন হাদিস কক্তস্থ করায় তৎপর হই । তখন থেকেই তিনি সবকিছু বাদ দিয়ে হাদীস শিক্ষার প্রতি নিজেকে নিয়োজিত করেন। ইমাম বোখারী (রঃ) স্বয়ং বর্ণনা করেন, যৌবনের প্রারম্ভে একদা স্বপ্নে দেখলাম আমি একটি পাখা হাতে নিয়ে নবী করিম (সাঃ)-এর নিকট দন্ডায়মান অবস্থায় আছি। ঐ পাখার সাহায্যে আমি নবী করিম (সাঃ) এর নিকট হতে মশা-মাছ ইত্যাদি দূর করে দিচ্ছি। ভাল একজন তা’বীরি বর্ণনাকারী এই স্বপ্ন শ্রবণপূর্বক ইমাম বোখারী (রঃ) কে বলেন যে, তুমি এমন কোন কাজ করবে যা দ্বারা নবী কারিম (সাঃ) এর প্রতি ‘মৌজু বা জাল ও মিথ্যা হাদীসের সম্বন্ধ করার মূল দূর হয়ে যাবে। ইমাম বোখারী (রঃ) বলেন এই বর্ণনা শ্রবণ করে আমার মনে এমন প্রেরণার উদ্ভব হল যে, আমি এমন একটা কিতাব লিখব যার মধ্যে সন্দেহমুক্ত সহীহ হাদীস অন্তভূêক্ত থাকবে। যে হাদীস সম্বন্ধে কোন প্রকারের সন্দেহের অবকাশ থাকবে তা গ্রহণ করব না। এমন সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার পর পবিত্র মক্কা শরীফের মসজিদে হারামে অবস্থান করে তিনি হাদীস লেখা শুরু করেন। তিনি আরো বলেন যে, আমি এই কিতাবের মধ্যে প্রতিটি হাদীস এতদূর সতর্কতার সাথে গ্রহণ করেছি যে, আল্লাহ প্রদত্ত স্বীয় ক্ষমতা, জ্ঞান, ইলম ও অভিজ্ঞতার দ্বারা প্রতিটি হাদীসকে সূক্ষ্নরূপে বাছাই ও পরখ করার পরও প্রতিটি হাদীস লিখার পূর্বে গোসল করে দুই রাকাত নামায পড়ে আল্লাহ তায়ালার নিকট ইস্তেগফার করার পর যখন আমার দৃঢ় বিশ্বাস হয়েছে যে, এই হাদীসটি সন্দেহ-লেশহীন ও সহীহ্‌, তখনই আমি সেটিকে এই কিতাবের অন্তর্ভুক্ত করেছি। এর পূর্বে নয়। তিনি আরও বলেন, এই কিতাবের পরিচ্ছেদসমূহ পবিত্র মদীনায় নবী করিম (সঃ)-এর রওজা পাকের নিকটে বসে বিন্যাস করেছি এবং প্রতিটি পরিচ্ছেদ লিখতে গিয়ে দুই রাকাত নামায পড়েছি। এভাবে আমি স্বীয় কক্তস্থ ছয় লক্ষ হাদীস হাতে বাছাই করে ষোল বৎসরের অক্লান্ত পরিশ্রমে এই কিতাবটি সংকলন করেছি- এই আশায় অনুপ্রাণিত হয়ে যে, আমি যেন এই কিতাবটিসহ আল্লাহর দরবারে হাজির হতে পারি। হাদীস শিক্ষার জন্য তিনি সিরিয়া, মিসর, আল যাজায়ের, বসরা, কুফা, বাগদাদ, হেজায ইত্যাদি বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করেন। ইমাম বোখারী (রঃ) এর বয়স যখন ষোল বছর তখন তিনি তাঁর মা ও ভ্রাতাসহ হজ্জব্রত পালনের উদ্দেশ্যে মক্কায় যাত্রা করেন। ইমাম বোখারী (রঃ) বিভিন্ন শহরে পরিভ্রমণ করে যে সমস্ত মুহাদ্দিসের নিকট থেকে হাদীস শ্রবণ করেন তাদের সংখ্যা এক হাজারের অধিক। তিনি সতের বছর বয়সে হাদীস শিক্ষা-দীক্ষা সমাপ্ত করেন। আঠার বছর বয়সে উপনীত হওয়ার পূর্ব থেকে লোকেরা তাঁর নিকট জ্ঞানার্জনের জন্য আগমন করতে থাকেন। ইমাম বোখারী (রঃ) ইলমে হাদীসে গভীর পান্ডিত্য অর্জন করেন। তিনি যখন হাদীস শিক্ষা দান শুরু করেন তখন তাঁর মুখে দাড়িই উঠেনি।

Permission is taken from Source   http://prothom-aloblog.com/users/base/lovelu1977/

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: