ইসলাম প্রচার সেই সব মনিষীদের ভূমিকা : পর্ব -০১

ইমাম আল গাযযালী (রহঃ)

নবুয়ত রিসালাতের ধারা বন্ধ হবার পর থেকে আজ পর্যন্ত যে সকল মহামনীষী জ্ঞানের রাজ্যের অতুলনীয় অবদান রেখে মুসলমান ও ইসলামের ঝাণ্ডাকে সমুন্নত রেখে গেছেন হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম আল গাযযালী (রহঃ) নিঃসন্দেহে তাদের অন্যতম। যার জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও দর্শনের আলোকচ্ছটা ইসলামী জগতকে আলোকময় করে রেখেছে। মুসলমানদের এবং জ্ঞান তাপসদের পথিকৃৎ হয়ে থাকবেন যুগ যুগ ধরে।

তার পূর্ণ নাম আবু হামিদ মুহাম্মদ ইবনে মুহাম্মদ আত-তুসী আশ-শাফেয়ী। ইমাম গাযযালী (রহঃ) ইরানের প্রাচীন খোরাসান প্রদেশের তুস নামক জেলার তাহেরান মতান্তরে গাযাল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার শুভাগমন কালটি চারশ পঞ্চাশ হিজরী। ইমাম গাযযালী প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন তুস নগরেই। তিনি নায়সাবুর নগরে বিশেষত ইমামুল হারামাইন আল-জুওয়ায়নীর সান্নিধ্য থেকে শিক্ষা লাভ করেন। তাঁর মৃত্যুকাল পর্যন্ত তিনি তাঁর সংস্পর্শেই ছিলেন। জীবনের প্রারম্ভেই তিনি সংশয়ের মধ্যে ছিলেন।

সূফী পারিপার্শ্বিক প্রভাবাধীন থেকে সূফী কার্যকলাপের অুনসরণ সত্ত্বেও তখন সূফী মনোভাব তাঁর মনে শিকড়গাড়তে পারেনি। তিনি আকাঈদ ফিক্‌হে শাস্ত্রের বিষয়াদি সম্পর্কে গবেষণা করতে ভালোবাসতেন যখন, তখন তার বয়স বিশ বছরও হয়নি। তিনি প্রথম যৌবনেই তাকলীদ তথা অন্ধ অনুকরণ পরিত্যাগ করেন। নায়সাবুর ত্যাগ করে তিনি সালজুক ওয়াযীর নিযামুল মূলক এর দরবারে আইনজ্ঞ আলেম হিসেবে অমাত্যপদ গ্রহণ করেন। এই পদে তিনি হিজরী ৪৮৪ সাল পর্যন্ত বহাল ছিলেন। অতঃপর তিনি বাগদাদের নিযামিয়া মাদরাসায় অধ্যাপক পদে নিযুক্ত হন। এসময় তিনি শুধু ধর্ম-তত্ত্বে নয় বরং নিশ্চিত জ্ঞান লাভের ব্যাপারে পুরোপুরি সংশয়বাদী হয়ে ওঠেন। দর্শন শাস্ত্রে তিনি কখানো সংশয়বাদ কাটিয়ে উঠতে পারেননি। বাগদাদে তিনি ফিকহ বিষয়ে অধ্যাপনা এবং পুস্তক প্রণয়ন করতেন। ধর্মীয় ও বুদ্ধিলব্ধ জ্ঞানের মধ্যে সমম্বয় সাধনের ব্যাপারে কঠোর সাধনা করতে থাকেন। ফলশ্রুতিতে হিজরী, ৪৮৩ হতে ৪৮৭ হিজরী পর্যন্ত সমসাময়িক বিভিন্ন দার্শনিক মতবাদ পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে অধ্যয়ন করতে থাকেন। অবশেষে তিনি সাধনায় সফল হন।

বিচার দিবসের ভয় তাঁকে অভিভূত করেছিল। এ ভয় তিনি তীব্রভাবে অনুভব করতে থাকেন। ফলে তাঁর তীব্র যন্ত্রণায় হিজরী ৪৮৮ সালে স্বাস্থ্যহানি ঘটে চরমভাবে। অবশেষে যুলকায়দা মাসে পার্থিব উচ্চাকাঙক্ষা ও মর্যাদা ত্যাগ করে বাগদাদ নগর ছেড়ে দরবেশী জীবন ও বৈরাগ্যবাদ গ্রহণ করেন। যদিও ইসলামে বৈরাগ্যবাদ স্বীকৃত নয়। ভ্রাম্যমাণ সাধকের জীবন গ্রহণ করার পর তিনি প্রয়োগবাদী মনোভাবে উদ্বুদ্ধ হন। তিনি প্রচার করতে থাকেন যে, বুদ্ধিবৃত্তির ওপর পূর্ণ আস্থা স্থাপনের প্রবণতাকে বিনষ্ট করার কাজেই বুদ্ধিবৃত্তি প্রযুক্ত হওয়া উচিত এবং অভিজ্ঞতা প্রসূত জ্ঞানই একমাত্র নির্ভরযোগ্য জ্ঞান। নিছক দর্শনাশ্রয়ী কোনো ভিত্তি জ্ঞানের নেই। এই ব্যাপারে ঔলবণ- এর ন্যায় তার যুক্তি ধারা ছিল বিশেষভাবে অনমনীয়।

তাঁরমতে ‘দূরকল্পী’ যুক্তির সাহায্যে কোনো দার্শনিক মতবাদ প্রমাণ করা যায় না। আধ্যাত্মবাদ সংক্রান্ত বিষয়ে আল-মুনকিযমিনাদ দালায়েল গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করে গেছেন।

ব্যক্তিগতভাবে গাযালীর নিজের জন্য এবং ইসলামী চিন্তাধারায় বিকাশের জন্য দর্শনের প্রয়োজন ছিল সুস্পষ্ট। আশআরী যে কার্য সমাপ্তকরে যেতে পারেননি গাযালী তার পূর্ণতা দান করেন। দুই বছর সিরিয়ার অবসর জীবন যাপনের পর হিজরী ৪৯০ সালের শেষভাগে তিনি হজ্ব করতে যান। অতঃপর আরো নয় বছর নানা স্থানে ঘুরে বেড়ান। এসময় মাঝেমধ্যে পরিজনের সাহচর্যে আসতেন এবং জাগতিক কাজ করতেন।

তাঁর মতবাদ ও প্রভাবঃ তিনি ফিকহের গঠন যুগের একজন উচ্চমর্যাদা-সম্পন্ন আলেম ছিলেন। কালামশাস্ত্রেও তিনি অনুরূপ নীতিই অবলম্বন করেন। জনসাধারণের ধর্ম বিশ্বাসকে যুক্তি বিজ্ঞানের সাহায্যে বিন্যস্ত কতগুলি আকাঈদ সূত্রে পরিণত করার প্রবণতাকে প্রকাশ্যভাবে নিন্দা করেন। তিনি শাফেয়ী মতবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। দর্শনকেও গাযযালী প্রকাশ্যে আক্রমণ করে বলেন, দর্শন নিছক একটি চিন্তাধারা। যে কেউ তা উপলব্ধি করতে সক্ষম। তিনি সূফী মতবাদকে দৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর অনেক গ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ক’টি হলো- ইহ্‌ইয়াউল উলুম আদ-দীন, রুবউলআদা অর্থাৎ দৈনন্দিন কার্যাবলি, রুবউল মুলকিয়াত, আল কিসতাসুল মুসতাকিম (এটি বাতেনী মত খণ্ডনকারী) ইলমুল কালামঃ আররিসালাতুল কুদসিয়া, জাওয়াহিরুল কুরআন, আররিসালাতুল লাদুনিয়া ও আততিবরুল মাসবুক এসব গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থাবলি রচনা করে তিনি অমর হয়ে আছেন।

শেষ জীবনে নির্জনবাস ও ধ্যান-সাধনার প্রতি গভীর আগ্রহ তাঁকে আকৃষ্ট করেছিল। অতঃপর তিনি তুস নগরীতে ফিরে এসে ক’জন শিষ্য অনুরক্তসহ নির্জনবাস আরম্ভ করেন। সেখানে একটি মাদরাসা এবং একটি খানকাহ-এর ভারও গ্রহণ করেন। অতঃপর এই জ্ঞানতাপস দার্শনিক কল্যাণব্রতা ইমাম গাযযালী অল্প বয়সেই ৫০৫ হিজরী ১৪ জামাদিউস সানিয়া, ১১১১ খৃঃ ১৯ ডিসেম্বর ইহকাল ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল ৫৫ বছর।

Permission is taken from Source   http://prothom-aloblog.com/users/base/lovelu1977/

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: