হযরত খাজা গরীব নেওয়াজ (রহ•)

হিজরী ৫৩৭ সন ছিল হযরত খাজা গরীব নেওয়াজ (রঃ)-এর জন্ম কাল। এ সময় গোটা উত্তর পশ্চিম এশিয়া জুড়ে সামাজিক নৈরাশ্য, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক সঙ্কট বিরাজ করতে ছিল। সর্বত্র নিরাপত্তাহীন ও অরাজকতার মাঝে লোকজনের দিনাতিপাত হত। অবশ্যই বলতে হয় হিজরী ষষ্টম শতাব্দী ছিল বিশ্ব মুসলমানদের জন্য এক কঠিন ক্রান্তিকাল।

হযরত খাজা গরীব নেওয়াজ (রঃ) এর দাদা হযরত সাইয়েদ নজম উদ্দিন তাহের আল হোসাইনী (রঃ) সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণে নিরাপদ অবস্থানের উদ্দেশ্যে আরব ভূমি থেকে খোরাসান প্রদেশের সিস্তানে হিজরত করেন। এখানে তাঁর পিতা হযরত সাইয়েদ গিয়াস উদ্দিন হাসান (রঃ) জন্ম গ্রহণ করেন। পরিণত বয়সে হযরত সাইয়েদ গিয়াস উদ্দিন হাসান (রঃ) একজন আবিদ, আরিক সূফী বুযুর্গ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। তাকেও ঐ নাজুক পরিস্থিতির শিকার হয়ে বা‘ভিটা ত্যাগ করতে হয়। তিনি স্বপরিবারে খোরাসান-এর সিস্তান এলাকা থেকে সানজার এলাকায় চলে আসেন। তখন গজনীর সুলতানগণের রাজপ্রদীপ নিভুনিভু প্রায়। পক্ষান্তরে ঘূরী বংশের প্রভাব প্রতিপত্তি দিনে দিনে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঘূরী রাজ বংশ ঝড়ের বেগে দূর দূরান্তের রাজ্যগুলোর দিকে ধাবিত হচ্ছে। এ যাবতকালে ভারতবর্ষের যে সমস্ত স্থানে বিজাতীয় শাসন ব্যবস্থা কায়েম হয়নি সেই সব স্থানসমূহ তারা জয় করে নিতে শুরু করেছে।

ইতিহাসের এক নিষ্ঠুর ক্রান্তিলগ্নে, হিজরী ৫৩৭ সনে গরীব নেওয়াজ হযরত খাজা মুঈন উদ্দিন হাসান চিশতী (রঃ) জগৎ ভূমি রওশন করেন। প্রসিদ্ধ গ্রন্থ খাজিনাতুল আসফিয়া-তে তাঁর জন্ম তারিখ হিজরী ৫৩৭ সনের ১৪ই রজব উল্লেখ করা হয়েছে। জন্ম সময় ছিল রোজ শনিবার সুবেহ সাদেক। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক বৃন্দ এ তারিখ নির্ভুল বলে সাব্যস্ত করেছেন। ইমামে মুজতবা অনুসরণ করে হিসাব করা হলেও তাঁর জন্ম সন হিজরী ৫৩৭ সন-ই বের হয়ে আসে।

হজরত খাজা গরীব নেওয়াজ (রঃ)-এর বাল্য জীবন কাহিনী কোন গ্রন্থে পাওয়া যাচ্ছে না। এটা এমন এক অসম্পূর্ণ বিষয় হয়ে আছে যার পূর্ণতা প্রদান করা বর্তমান যুগে আর সম্ভব নয়। আমরা বিস্মিত হয়ে পড়ি এজন্য যে, এক জগৎ বিস্ময়ী ব্যক্তিত্ব যে জীবন স্মৃতি চারণে অসংখ্য ভক্ত অনুরাগী শ্রদ্ধা নিবেদন করছেন অথচ তাঁর শৈশব জীবনের কোন কিছুই আমরা অবহিত হতে পারছিনা। সমসাময়িক ইতিহাস পর্যালোচনা করে খোরাসান ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকাসমূহের ওপরে তাতারদের নির্যাতন, লুটতরাজ, খুন-খারাবী কাহিনী থেকে হযরত খাজা গরীব নেওয়াজ (রঃ)-এর শৈশব জানার উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা আপন গতিতে দূর হয়ে যায়। হযরত খাজা গরীব নেওয়াজ (রঃ)-এর বাল্য জীবন যে এক করুণ দুর্বিসহ অবস্থায় কেটেছে, যে কারণে তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা কিভাবে সম্পন্ন হয়েছে তাও কোন কিতাবে উল্লেখ নাই।

হযরত খাজা গরীব নেওয়াজ (রঃ)-এর পিতা খাজা গিয়াস উদ্দিন হাসান (রঃ) খোরাসানে একজন আরিফ বিল্লাহ বুযুর্গ ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি কি পরিমাণ বিত্ত সম্পদ রেখে যান তা সঠিকভাবে কোন লেখক উল্লেখ করতে পারেন নি। কোন কোন লেখক লিখেছেন হযরত খাজা গরীব নেওয়াজ (রঃ)-এর আরও দুই ভাই ছিলেন। আবার অন্য সব গ্রন্থে লেখা হয়েছে তাঁরা চার ভাই ছিলেন। গভীর অনুসন্ধান ও তথ্য নির্ভর গ্রন্থসমূহ থেকে এতটুকু জানা যায় যে, হযরত খাজা গরীব নেওয়াজ (রঃ) পৈত্রিক ওয়ারিশ সূত্রে একটা পানি সেচের চাক ও একটা ছোট্ট বাগান প্রাপ্ত হয়েছিলেন। এই বাগান হযরত খাজা গরীব নেওয়াজ (রঃ)-এর ভবন-পোষণ বা জীবনযাপনের জন্য যথেষ্ট ছিল। তিনি নিজেই বাগান দেখা-শুনা করতেন, সেচ দিতেন ও ফসল তুলতেন। তাঁর বাগানে প্রচুর পরিমাণে আঙ্গুর ফল উৎপন্ন হত এবং এ আঙ্গুর বাগানের আয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে তাঁর জীবিকানির্বাহ হয়ে যেত।

একদা হযরত খাজা গরীব নেওয়াজ (রঃ) বাগানে সেচ দিচ্ছেন, এমন সময় দরবেশ হযরত ইব্রাহিম কানুদশী (রঃ) তাঁর বাগানের পথ অতিক্রম করে যাচ্ছেন। হযরত খাজা গরীব নেওয়াজ (রঃ)-এর দৃষ্টি পড়লে তাঁর দিকে, দরবেশের প্রতি তাঁর মন আকৃষ্ট হয়েছে, তিনি এক দৌড়ে দরবেশের সম্মুখে হাজির হয়ে বা আদব সালাম পেশ করেন। তাঁর বিনীত আবেদনে হযরত ইব্রাহিম কানদুশী (রঃ) একটা ছায়াঘেরা গাছের নীচে বসলেন। তিনি গাছ থেকে টাটকা আঙ্গুর ফল নিয়ে দরবেশের খেদমতে পেশ করেন। দরবেশ তাঁর আপ্যায়নে মুগ্ধ হয়েছেন। খুশী মনে তিনি আঙ্গুর ফল গ্রহণ করেন।

কিছুক্ষণ মৌনতায় কেটেছে অতঃপর হযরত ইব্রাহিম কানদুশী (রঃ) স্বীয় ঝোলা থেকে একটা খোরমা বের করেন। নিজ মুখে খোরমা পুরে দেন, ক্ষাণিক চিবিয়ে তা হযরত খাজা গরীব নেওয়াজ (রঃ)-এর হাতে তুলে দেন। হযরত খাজা গরীব নেওয়াজ (রঃ) গোটা খোরমা গিলে ফেললেন।

মনে অজান্তে নিমিষে হযরত খাজা গরীব নেওয়াজ (রঃ)-এর অন্তরে এক অব্যক্ত আলোড়ন সংঘঠিত হয়ে যাচ্ছে। খোরমা উদরে যেমন প্রবেশ করছে, না যেন তাঁর দিব্য দৃষ্টি অন্তরালকারী পর্দাসমূহ একে একে অপসারিত হয়ে যাচ্ছে। হযরত খাজা গরীব নেওয়াজ (রঃ)-এর আত্মার অন্তরালে এক পলকে আমূল পরিবর্তন ঘটে গেল। স্বাভাবিক জীবন থেকে তাঁর খেয়াল দূর হয়ে গেল। অন্তরে অব্যক্ত অস্থিরতা এশকে এলাহিতে তাঁর অন্তর-দহন জ্বালার সূচনা ঘটেছে। এতদিনের স্বাভাবিক জীবনযাপন তিনি ত্যাগ করলেন। যে বাগানের আয়ের ওপর তিনি নির্ভরশীল ছিলেন, সেচ যন্ত্রসহ তা বিক্রি করে ফেলেন। বিক্রয়লব্ধ মুদ্রা তিনি দান করে দেন। এক্ষণে তিনি এমন ইবাদত রিয়াজতে মগ্ন যে এক পলক দুনিয়ার দিকে ফিরে তাকানোর অবকাশ তাঁর যেন নেই। কিছু দিন এভাবে কেটে যায়। একদা তিনি আত্মীয়-স্বজন পাড়া-প্রতিবেশী সকলকে শুভেচ্ছা জানিয়ে পরম সত্যের সন্ধানে বের হয়ে পড়েন এবং দেশ-দেশান্তরে ঘুরে ফিরেন। বেশ কিছুদিন দেশ ভ্রমণে তিনি ধর্ম তত্ত্বজ্ঞান অর্জনের তাগিদ উপলব্ধি করেন। এতদ উদ্দেশ্যে তিনি সমরকন্দ বোখরা এর পথে যাত্রা শুরু করেন। সে যুগে মধ্য এশিয়ার এ শহর দুটো জ্ঞান-বিজ্ঞানের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিবেচিত হত। দূর-দূরান্ত থেকে জ্ঞানপিপাসু ব্যক্তিবর্গ সেখানে ভীড় জমাতেন। সেখান থেকে জ্ঞান সাধনায় পূর্ণতা প্রাপ্ত হয়ে তারা বিশ্বের বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়তেন।

বোখারা শরীফের তিনি হযরত মাওলানা হিশাম উদ্দিন বোখারী (রঃ)-এর খেদমতে অবস্থান করেন। তৎকালে হযরত হিশাম উদ্দিন বোখারী (রঃ) একজন প্রখ্যাত আলেম হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাঁর সান্নিধ্যে হযরত খাজা গরীব নেওয়াজ (রঃ)-এর কোরআন মজিদ হেফজসহ তফসির, হাদিস শরীফ ও ফিকাহ শাস্ত্রে জ্ঞান অর্জন করে।

অবশেষে হিজরী ৫৬০ সনের ১০ই শাওয়াল রোজ বৃহস্পতিবার হযরত খাজা মুঈন উদ্দিন হাসান চিশতী (রঃ) হযরত খাজা ওছমান হারুনী (রঃ)-এর খিলাফত লাভের যোগ্যতা অর্জন করেন। অতঃপর দীর্ঘদিনের কঠোর সাধনা ও রিয়াজত বন্দেগীর বদৌলতে হযরত খাজা গরীব নেওয়াজ (রঃ) হযরত খাজা ওছমান হারুনী (রঃ)-এর প্রধান খলিফা নিযুক্ত হলেন।

সম্রাট শাহজাহানের কন্যা জাহানারা বেগম মৌনেসুল আরোয়াহ কিতাবে হযরত নেওয়াজ (রঃ)-এর জীবন কাহিনী তুলে ধরেছেন। অবশ্যই এই কিতাব খানা হচ্ছে সর্বজনবিদিত নির্ভরযোগ্য ও তথ্যবহুল কিতাব। উক্ত কিতাবে তিনি হযরত খাজা ওছমান হারুনী (রঃ)-এর হাতে হযরত গরীব নেওয়াজ (রঃ) স্বয়ং ইরশাদ করেন- একদা আমি পীর মুর্শিদ কেবলার খেদমতে এক মজলিশে হাজির হই। সেখানে বেশ কয়েকজন উঁচু স্তরের শায়েখ উপস্থিত ছিলেন। সঙ্গতঃ কারণে সেখানে বা-আদব মাথা নীচু করে বসেছিলাম। এমন অবস্থায় হযরত হুজুর আকদাস নির্দেশ করেন-দু’রাকাত নামাজ আদায় কর। সাথে সাথে আমি হুকুম তামিল করলাম। অতঃপর ইরশাদ করেন- কেবলামুখী হয়ে বস। আমি কেবলামুখী হলাম। অতঃপরে তিনি ইরশাদ করেন-সূরায়ে বাক্বারা তিলওয়াত কর। আমি বিনীত কণ্ঠে সূরা বাক্বারা তিলওয়াত করি। আবার ইরশাদ হলো আটবার ছোবাহান আল্লাহ পড়। আমি হুকুম তালিম করলাম। এবারে হুজুর কেবলা দাঁড়িয়ে পড়েন। আমার হাত তাঁর হাতে তুলে নেন। মুর্শিদ পাক এমতাবস্থায় আকাশের দিকে মুখ ফিরালেন, দৃষ্টি তাঁর ঊর্ধ্ব আকাশে, অনন্ত পথে। এহেন হালে তিনি ইরশাদ করেন- তোমাকে আজ আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছে দিলাম।

জাহানারা বেগমের কথায় এ হচ্ছে মুরীদ হওয়া আর মুরীদ করার আবিস্মরণীয় কাহিনী। এক অলি আল্লাহ মুরীদ হয় আর এক আরেফ বিল্লাহ মুরীদ করেন। একদিকে এক রাত একদিনের ইবাদত, অপর পক্ষে ছিল এক পলকের দৃষ্টি সংযোগ। এতেই আল্লাহ তায়ালার সমূহ সূক্ষ্মতত্ব এবং হাকিকতে এলাহির আড়ালকৃত পর্দাসমূহ উন্মোচন হয়ে গেল। এতটা স্বল্প সময়ের ভেতর সবকিছু দেখিয়ে দেয়া হল, যা-কিনা হাজার বছরের ইবাদত রিয়াজতে সম্ভব নাও হতে পারে। বাস্তবে তা ছিল শুধু একদিন এক রাতের মোজাহিদার ফলশ্রুতি।

**************************
মূলঃ হযরত সাইয়েদ মঞ্জুর ফরিদী (রঃ)
খাদেম দরগাহ শরীফ, আজমীর
অনুবাদ ফকির আলতাফ হোসাইন
দৈনিক ইত্তেফাক, ১৮ জুলাই ২০০৮

http://prothom-aloblog.com/users/base/samimsikder/

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: