হাজরে আসওয়াদের ইতিকথা

আল-ফারাবী একজন খ্যাতনামা দার্শনিক ও বহুভাষাবিদ পন্ডিত। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যে তাঁর প্রভাব সুদূর প্রসারী।
হাজরে আসওয়াদ বা কালো পাথর একটি নাম, একটি ইতিহাস, একটি নিদর্শন ও আত্মনিবেদনের প্রধান উপকরণ। বাইতুল্লাহ বা কাবাগৃহ তাওয়াফ এবং প্রদক্ষিণের সময় ওই পাথর স্পর্শ করা ও চুম্বন করা সুন্নত। হাজরে আসওয়াদ উভয় হস্ত দ্বারা স্পর্শ ও চুম্বনের মাধ্যমে স্পর্শকারী ও চুম্বনকারী বান্দাহ আল্লাহ ও তার রাসূলের হস্ত মোবারক বায়আত করার গৌরব অর্জন করবেন। হযরত আবু হোরায়রা (রা·) থেকে বর্ণিত হয়েছে, যে লোক হাজরে আসওয়াদ বা কালো পাথর ধরল সে যেন আল্লাহর (কুদরতের) হস্ত ধরল। অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, যে ব্যক্তি প্রিয় নবী (সা·)-এর হাত ধরে বায়আত করার সুযোগ লাভ করেনি, সে যদি হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ ও চুম্বন করে তবে সে যেন আল্লাহ ও তার রাসূলের কাছেই বায়আত গ্রহণ করল।

প্রিয় নবী (সা·)-এর সুন্নাতের অনুসরণে সাহাবায়ে কেরাম হাজরে আসওয়াদকে স্পর্শ এবং চুম্বন করেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রা·) হাজরে আসওয়াদ বা কালো পাথরকে তিনবার চুম্বন করতেন। হযরত জাবির (রা·) সম্পর্কে বলা হয়েছে, তিনি হাজরে আসওয়াদের কাছে হাজির হয়ে অশ্রুসিক্ত নয়নে প্রথমে একে স্পর্শ করেছেন, জড়িয়ে ধরেছেন ও চুম্বুন করেছেন এবং হাত দ্বারা তা স্পর্শ করে উভয় হাত দ্বারা মুখমণ্ডল মাসেহ করেছেন।

বিশ্ব মুসলিম নর-নারীর কাছে এ পাথর অতি মূল্যবান। তিরমিজি শরিফের হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, হাজরে আসওয়াদ (হযরত আদম (আ·)-এর সঙ্গে) জান্নাত থেকে অবতীর্ণ হয়। তখন তা দুধের চেয়েও সাদা ছিল; কিন্তু আদম সন্তানের গুনাহ একে কালো করে দিয়েছে। তিরমিজি, ইবনু, খুযাইমা, ইবনু হিব্বান ও হাকেম বর্ণিত সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে, এ পাথরের একটি জিহ্বা ও দুটি ঠোঁট রয়েছে, তারা কিয়ামতের দিন চুম্বনকারীদের পক্ষে সাক্ষ্য দেবে। বায়তুল্লাহ শরিফ তাওয়াফের সময় এ পাথর চুম্বন দিয়ে অথবা হাতে ইশারা দিয়ে হাতে চুম্বন দিয়ে তাওয়াফ শুরু করতে হয়।

আমাদের মধ্যে কিছু লোক আছে যারা বায়তুল্লাহ তাওয়াফের সময় হাজরে আসওয়াদ চুম্বনের জন্য রীতিমতো যুদ্ধ শুরু করেন। এভাবে ধাক্কাধাক্কি করে লোকদের কষ্ট দিয়ে তাওয়াফ করা ঠিক নয়। যদি চুম্বন দেয়া সম্ভব না হয়, ডান হাত দিয়ে ইশারা করলেও হবে। এর দিকে সম্প্রসারিত করে স্বীয় হস্তে চুম্বন করলেও সুন্নত আদায় হয়ে যাবে এবং আল্লাহপাক হাজরে আসওয়াদ চুম্বনের বরকত দান করবেন।

হাজরে আসওয়াদ বা কালো পাথরের ইতিহাসগত তথ্য থেকে জানা যায়, পবিত্র কাবাগৃহের পূর্ব-দক্ষিণ কোণে প্রায় চার ফুট উচ্চ দেয়ালের কিছুটা ভেতরে পুঁতিত কালো থালার মতো গোল পাথর আছে। তার নাম হাজরে আসওয়াদ বা কালো পাথর। তার বর্ণ কালো বলে হয়তো নাম রাখা হয়েছে হাজরে আসওয়াদ। হাজরে আসওয়াদ ছিল একটি ছোট পাথর। কোন এক দুর্ঘটনায় তা পাঁচ টুকরা হয়ে গিয়েছিল। এ টুকরাগুলো মূল্যবান ধাতুর সাহায্যে জোড়া দিয়ে এক করা হয়েছে। একটি চাঁদির পাত্রে কাবাগৃহের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে দেয়ালের সঙ্গে এমনভাবে স্থাপিত করা হয়েছে যা দেখলে ও স্পর্শ করলে একটু উঁচু অনুভব হবে। হাজরে আসওয়াদকে চুম্বন বা সম্মান দেখানোর কারণ সম্বন্ধে বিভিন্নরকমের মতামত ও কাহিনী বর্ণিত আছে। অধিকাংশের অভিমতের কাহিনীতে বলা হয়েছে, হযরত ইব্রাহিম (আ·) যখন আল্লাহতায়ালার নির্দেশে কাবাঘর পুনঃতৈরির কাজ সমাপ্ত করেন তখন একটি পাথর ঘরের কাজে না লেগে অবশিষ্ট থেকে যায়। এ অবশিষ্ট পাথরটি আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ করে বলেছিলেন, হে আল্লাহ, আমি কি অপরাধ করেছি যে আমার সঙ্গী-সাথীরা তোমার ঘরে স্থান পেয়েছে কেবলমাত্র আমি তা থেকে বঞ্চিত হলাম। রাহমানুর রাহিম আল্লাহতায়ালা তার ফরিয়াদের প্রতি-উত্তরে হযরত ইব্রাহিমকে (আ·) যে নির্দেশ দিয়েছিলেন সেই নির্দেশ অনুযায়ী এ পাথরটিকে কাবা ঘরের এক কোণে স্থাপন করা হয় এবং তাওয়াফকারীকে এ পাথরে চুম্বন দেয়ার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়। এরূপে কাবাঘরের মধ্যে যেসব পাথর স্থান পেয়েছিল এ পাথরের মর্যাদা তাদের সমতুল্য রাখা হয়। অন্য এক বর্ণনায় পাওয়া যায়, হাজরে আসওয়াদ মূলে একজন ফেরেশতা। হযরত আদম (আ·) ও বিবি হাওয়াকে যখন বেহেশতে অবস্থান করার জন্য আদেশ দেয়া হয়, তখন একজন ফেরেশতাকে তাদের পাহারাদার নিযুক্ত করা হয়েছিল যেন তিনি নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল ভক্ষণ থেকে হযরত আদম (আ·) ও বিবি হাওয়াকে বিরত রাখেন। কিন্তু হযরত আদম (আ·) ও বিবি হাওয়া (আ·) শয়তানের প্ররোচণায় প্রলুব্ধ হয়ে নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল ভক্ষণ করেন, এ ফেরেশতা অন্যমনস্ক থাকার দরুন আল্লাহর আদেশ অমান্য করার সময় সে কোন বাধা প্রদান করতে অক্ষম হয়। অবাধ্যতার জন্য যখন হযরত আদম (আ·) ও হযরত বিবি হাওয়াকে (আ·) বেহেশত থেকে বহিষ্কৃত হতে হয় ও পাপ মোচনের জন্য নির্দিষ্ট সময় এ পৃথিবীতে থেকে প্রায়শ্চিত্ত করতে, তখন তাদের সঙ্গে ওই দারোয়ান ফেরেশতাকেও পৃথিবীতে পাঠিয়ে দেয়া হয়। এ ফেরেশতাকে শাস্তিস্বরূপ পাথরে রূপান্তরিত করে কাবা ঘরের এক কোণে অবস্থান করতে নির্দেশ দেয়া হয়। সে কিয়ামত পর্যন্ত কাবা ঘরের তাওয়াফকারীদের চুম্বন খেতে থাকবে এবং তাদের পাপ শুষে নেবে, পাপ শুষে এ পাথর সব সময় কালো হয়ে থাকছে। উপরে বর্ণিত তথ্যের মধ্যে প্রথম ঘটনাটি সর্বজনস্বীকৃত। অন্য এক বর্ণনা থেকে জানা যায়, হযরত নূহ (আ·) এর তুফানের সময় হযরত জিবরাইল (আ·) পাথরটি আবু কুবাই পাহাড়ে লুকিয়ে রাখেন হযরত ইব্রাহিম (আ·) কতৃêক কাবাঘর নির্মিত হলে তাওয়াফ শুরু করার স্থান চিহ্নিত করার লক্ষ্যে হযরত ইসমাইল (আ·) একটি পাথর তালাশ করার সময় হযরত জিবরাইল (আ·) ওই পাথরটি এনে দেন। অতঃপর হযরত ইব্রাহিম (আ·) তা বাইতুল্লাহ শরিফের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে স্থাপন করেন। রাহমানুর রাহিম আল্লাহতায়ালার কাছে ফরিয়াদ জানাচ্ছি তিনি যেন আমাদের স্মৃতিবিজড়িত পাথরটিকে চুম্বন করার তাওফিক দান করেন। আমিন।

***************************নেট থেকে
Permission is taken from Source   

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: