পবিত্র কোরআন আল্লাহর প্রেরিত গ্রন্থ পর্ব

পবিত্র কোরআন যে আল্লাহর প্রেরিত গ্রন্থ এতে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। কোরআনের মতো আরেকটি গ্রন্থ রচনা করা মানব ক্ষমতার  উর্ধে। এবং কোরআনকে অন্য যে কোন গ্রন্থের সাথে তুলনা করাটাও ছেলেমানুষী বাতুলতা মাত্র। নিম্নে আমি কোরআনের কিছু মুজেযা তুলে ধরছি। পাঠকই বিচার করবেন।

যে কোন ভাষার অল্ংকার ও বাগ্মিতা সম্পর্কে সে ভাষার নেটিভরাই বেশী ওয়াকীবহাল। অন্য ভাষাভাষি কেউ যতই বুৎপত্তি অর্জন করেন না কেন ঐ ভাষার একজন সাধারণ নেটিভের পর্যায়ে তিনি পৌছতে পারবেন না।

এবার একটু চিন্তা করুন তখনকার আরবের কথা। তখন ছিল আরবী সাহিত্যের স্বর্ণ যুগ। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছিল সাহিত্যিকতার জয়জয়কার। মিটিং, সভা, বিবাহ অনুষ্টান, শেষ কৃত্য অনুষ্ঠান ইত্যাদি সবখানে ছিল সাহিত্যের সমাধর। তখনকার আরবীরা সহিত্যের এত উচ্চপর্যায়ে ছিল এবং তাদের এ ব্যাপারে এত অহংকার ছিল যে তারা অন্যান্য জাতিকে বলত “আযমী” অর্থাৎ বোবা, মূক। এমন এক সময়ে কোরআন ঘোষণা করল “যদি মানব ও জ্বিন এই ক্বোরআনের অনুরুপ রচনা করে আনয়নের জন্যে জড়ো হয়, এবং তারা পরস্পরের সাহয্যকারী হয়; তবুও তারা কখনও এর অনুরুপ রচনা করে আনতে পারবে না।” সমস্ত আরব ছিল মুহাম্মদ সা. এর বিরোধীতায় লিপ্ত। এ চ্যালেন্জ গ্রহণ না করলে তাদের অবশ্যই মানতে হবে কোরআন সত্য। কিন্তু সাহিত্যের স্বর্ণশিখরে আরোহণের দাবীদার হয়েও তারা একটি অনুরুপ সেন্টেনস তৈরি করতে পারেনি। এরপরও যখন আরবের সাহিত্যিকেরা কোরআন গ্রহণ করল না তখন কোরআন আবার ঘোষণা করল “এতদসম্পর্কে যদি তোমাদের কোন সন্দেহ থাকে যা আমি আমার বান্দার প্রতি অবতীর্ণ করেছি, তাহলে এর মত একটি সূরা রচনা করে নিয়ে এস। তোমাদের সেসব সাহায্যকারীদেরকেও সঙ্গে নাও – এক আল্লাহ ছাড়া যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাক।”

পাশ্চাত্যের কে একজন বলেছিলেন হয়ত কেউ কোরআনের অনুরুপ কিছু তৈরি করেছিল কালের আবর্তে তা হারিয়ে গেছে। কিন্তু এ প্রশ্ন অবান্তর। অতীত থেকে আমরা এটাই জানতে পারি যে, যেকোন বড় ঘটনা মানুষ বিভিন্নভাবে ধারণ করে থাকে। সুতরাং এরকম কিছু থাকলে আমরা অবশ্যই এর কিছুটা পেতাম। তবে কেউ যে দুএকবার চেষ্টা করেনি এমন নয়। এবং সেগুলো আজও ইতিহাসের গ্রন্থে লিপিবদ্ধ আছে। যেমন কেউ সূরা “ক্বারিয়া” ও “ফিল” এর ছন্দে এই বাক্য বলল:
“আল ফিলু মাল ফিল
ওয়ামা আদরাকামাল ফিল
লাহু মাশফারুন ত্বাউইলুন
ওয়াযানবুন আছিইলুন
ওয়ামা যালিকা মান খালাকা রাব্বুনা লিক্বালিলুন।”

অথবা কেউ বলল:
“আলাম তারা ইলা রাব্বিকা কাইফা ফায়ালা বিল হুবলা
আখরাজা মিনহা নাসমাতান তাসআ, বাইনা শারাসীঈফু ওয়া হা-শা।”
কিন্তু এগুলো শুধুই হাস্যরস সৃষ্টি করতে পেরেছে। সহিত্যিকেরা আজো এ নিয়ে হাসাহাসিই শুধু করেন।

আরবের বিখ্যাত সাহিত্যিক আব্দুল্লাহ বিন আল মুকাফ্ফাহ (মৃত্যু ১৪৩ হিজরী) একবার কোরআনের জবাব লিখতে ইচ্ছা করেন, কিন্তু এসময় তিনি একস্থানে একটি শিশুকে কোরআনের এই আয়াত “ওয়া ক্বিলা ইয়া আরযু আবলাগী মাআক্বে ওয়াইয়া সামায়ু আক্বলায়ী” পড়তে শুনে চিৎকার করে বলে উঠেন এর মোকাবেলা অসম্ভব।

এবার আমরা কোরআনের কারিশমা কিংবা বিশেষত্বকে দেখার চেষ্টা করব।

(১) শব্দের কারিশমা: যে কোন ভাষার যে যে কোন কবি বা সাহিত্যিক তা তিনি সাহিত্যের যত উচ্চ পর্যায়েই থাকুন না কেন এ দাবী করতে পারবেন না যে তিনি তার কোন বাক্যেই কোন অপটু কিংবা অসাহিত্যিক শব্দ ব্যবহার করেননি। কেননা এক পর্যায়ে মানুষ তার আসল মর্মার্থ/উদ্দেশ্য বুঝাতে গিয়ে বাধ্য হয়ে কিছু শব্দ নিয়ে আসে যা সাহিত্য মানে মোটেই উপযোগী নয়। কিন্তু ….. পুরো কোরআনের “আলহামদু” থেকে “নাস” পর্যন্ত খুজলেও এমন কোন শব্দ পাওয়া যাবে না। বরং যে শব্দ যেখানে আসার উপযুক্ত সেখানেই এসেছে এবং এতই অকাট্য যে কেউ এর পরিবর্তে অন্য কোন শব্দকেই উপযুক্ত বলে এর স্থানে বসাতে পারবে না। আরবী ভাষা বিশ্বের অন্যতম একটি সমৃদ্ধ ভাষা। এ ভাষায় সাধারণ সাধারণ শব্দেরও প্রচুর সমার্থ শব্দ রয়েছে। এখান থেকে কোরআন যে শব্দ চয়ন করেছে তা অসাধারণ ও অসম্ভব একটি ব্যাপার। যেমন:

(ক) সে যুগে “মৃত্যু” শব্দের অর্থ বুঝাতে অনেক আরবী শব্দ ব্যবহৃত হত যেমন- মউত/ হালাক/ ফানা/ হাতফ/ শু’উব/ হিমাম/ মান্নুন/ সাম/ ক্বাযিয়া/ হামিঅ/ নয়ত/ ফাউদ/ মিক্বদার/ জাব্বায/ ক্বাতিম/ হাল্লাক্ব/ ত্বালাত্বিল/ ত্বালাতিলা/ আউল/ যাম/ কুফত/ জিদাঅ/ হুযরাত/ খালিজ ইত্যাদি। উপরোক্ত প্রায় সকল শব্দ দ্বারা আরবরা এটাই বুঝাতো যে এর দ্বারা (অর্থাৎ মৃত্যু) মানুষ সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। এবং তার পুনরায় জীবিত হওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই। যেহেতু তারা পরকালে বিশ্বাস করতো না তাই তারা মৃত্যুর জন্য যে নামই পছন্দ করেছে সবই মৃত্যুর পর পুনরায় জীবিত না হওয়ার বিশ্বাসকে রিফ্লেক্ট করেছে। এবার যদি কোরআন মৃত্যুর কথা উল্লেখ করতে গিয়ে উপরোক্ত শব্দগুলো থেকে যে কোন একটি পছন্দ করে তাহলে কোরআন প্রকারান্তরে এর বিশ্বাসকেই সমর্থন করল। সুতরাং এখানে কোরআন উপরোক্ত সকল শব্দ পরিত্যাগ করে এমন এক সুন্দর, গ্রহণযোগ্য ও বাগ্মী শব্দচয়ন করেছে যে, যার দ্বারা মৃত্যুর আসল কারন প্রকাশ পেয়ে গেছে। এই শব্দ “তাওয়াফ্ফী” প্রকাশ করে দিয়েছে মৃত্যু অনন্ত ধ্বংসের নাম নয় বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে রুহ কবয করার নাম। মৃত্যুর জন্য এই শব্দ কোরআনের পূর্বে কেউ ব্যবহার করেনি।

(খ) প্রত্যেক ভাষায় কিছু শব্দ আছে যা উচ্চারণগতভাবে মোটেই পছন্দ করা হয় না কিন্তু যেহেতু এদের অর্থ প্রকাশ করার জন্য অন্য কোন শব্দ নেই তাই ভাষাভাষিরা ঐ শব্দগুলোকেই ব্যবহার করতে বাধ্য হয়। কিন্তু কোরআন এসব স্থানে এমন সব পন্থা অবলম্বন করে যে বুদ্ধিমান মাত্রই আশ্চর্যে নির্বাক না হয়ে পারেন না। যেমন ঘর তৈরির জন্য পাকা ইটকে বুঝাতে যে শব্দ ব্যবহৃত হয় তা অত্যন্ত ভারি বা জটিল, নীচ আর অপছন্দনীয় শব্দ হিসাবে গণ্য। যেমন: “আ-জুররুন” ‘ক্বারমাদুন’ ‘ত্বোউবুন’। এবার ফেরাউন তার মন্ত্রী হামানকে তার জন্য একটি প্রসাদ নির্মাণের জন্য ইট তৈরির হুকুম দিয়েছে একথা কোরআনকে বলতে হবে। এ কাহিনী বলতে হলে অবশ্যই ইটের কথা বলতে হবে। কিন্তু কোরআন করীম এখানেও এর সমার্থ শব্দ সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছে এভাবে “ফেরাউন বলল হে পরিষদবর্গ, আমি জানিনা যে, আমি ব্যতিত তোমাদের কোন উপাস্য আছে। হে হামান, গলিত মাটি পোড়াও, অত:পর আমার জন্য একটি প্রসাদ নির্মাণ কর।”

(গ) আরবীতে কিছু শব্দ আছে একবচন হওয়ার কারণে তা সহজ ও সুন্দর। কিন্তু বহুবচন হিসাবে জটিল বা ভারি ধরা হয়। যেমন ‘যমীন’ অর্থাৎ পৃথিবি এর অর্থে “আরযুন” একটি সহজ শব্দ। এর দুটি বহুবচন “আরযাউনা” ও “সারাযিউ” আরবীতে ব্যবহৃত হয় দুটিই জটিল। সাহিত্যিকেরা জটিল হলেও এটা ব্যাবহার করতে বাধ্য হন। কিন্তু কোরআন “আসমান” এর বহুবচন (সামাওয়াত) এর সাথে ‘যমীন’ একবচন হিসাবে অনেক বার উল্লেখ করেছে। তবে এক জায়গায় বহুবচন নিয়ে আসা আবশ্যক হওয়ায় এমন সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছে যে ভাবতে আশ্চর্য লাগে। “আল্লাহ সপ্তাকাশ সৃষ্টি করেছেন এবং পৃথিবিও সেই পরিমাণে।” দেখুন এখানে আসমান এর বহুবচন (সামাওয়াত) আনা হয়েছে কিন্তু “আরযুন” এর বহুবচন না এনে এর মর্মার্থ বুঝাতে এমন বাগ্মীতা দেখিয়েছে যে ভাবলে শুধু অলন্কারের কারিশমাই নজরে আসে।

(ঘ) কেউ কেউ কোরআনের কিছু শব্দকে জটিল ও ভারি বলে থাকেন। যেমন “যিইযা”। কিন্তু তারা ভুলে যান এসব শব্দ উৎপত্তিগতভাবেই ভারি। কিন্তু সাহিত্যিকরা এদেরকে এমনভাবে ব্যবহার করেন যে এটা আর জটিল বা ভারি মনেই হয় না। যেমন আরবীতে গর্দানের একটি রগের নাম “আখদাঅ”। আরবী ভাষার দুজন কবি এই শব্দ ব্যবহার করেছেন কিন্তু দুজনের উপস্থাপনার আকাশ-পাতাল তফাত। কবি আবু তাম্মাম বলেন :
“ইয়া দাহরা ক্বাউমিন আন আখদাইকা ফাকাদ
আসজাজতু হাযাল আরামা আন খারকিকা।”
এখানে এ শব্দ (আখদাইকা) অত্যন্ত ভারী মনে হচ্ছে। এবার আব্দুল্লাহ বিন সাম্মাহর কবিতা পড়েন:
“তালাফ্ফাত নাহওয়াল হাইয়্যা হাত্তা উজিদা ছানা
ওয়াজাগতু মিনাল আসগাই লিইতান ওয়া আখদাআ।”
এখানে এই ভারি শব্দটিই এমন সুন্দরভাবে ব্যবহৃত হয়েছে যে কোন কষ্টই হচ্ছে না।

কোরআনে “যিয়যা” শব্দও এমন সুন্দর করে উপস্থাপিত হয়েছে যে এর স্থানে অন্য কোন শব্দ আসতেই পারে না। যেমন: “আলাকুমুয যাকারা ওয়ালাহুল উনছা
“তিলকা ইযান ক্বিসমাতুন যিয়যা।”
আলাদাভাবে যদি দেখা যায় তাহলে “কিসমাতুন জাইরাতুন” অথবা “কিসমাতুন যালিমাতুন” এর শব্দগুলো ‘যিয়যা’ এর মোকাবেলায় সুন্দর মনে হয়। কিন্তু কোরআনে যে ছন্দে এসেছে সেখানে “জাইরাতুন” অথবা ‘যালিমাতুন” যদি রাখা হয় তাহলে বাক্যের সকল সৌন্দর্যই নষ্ট হয়ে যায়।

২. বাক্য গঠন বা বিন্যাসের কারিশমা: শব্দের পরে আসে বাক্যের গঠন, বিন্যাস ও উপস্থাপনের কথা। এ ব্যাপারেও কোরআন করীম অতুলনীয়। কোরআনের এক একটা বাক্যের এতই রস, প্রভাব আর কল্যাণ যে এর নজীর করা যায় না। একটি উদাহরণ দিচ্ছি। হত্যাকারী থেকে বদলা নেওয়া আহলে আরবে অত্যন্ত বাহাদুরী ও প্রশংসার কাজ ছিল। আর এর গুণগান বর্ণনা করে আরবীতে কিছু প্রবাদ প্রচলিত ছিল। যেমন “আল ক্বাতলু এহয়াউন লিলজামিই” ( হত্যা হল সম্মিলিত জীবন ) “আল ক্বাতলু আনফা লিল ক্বাতলি” (হত্যা দিয়েই হত্যা প্রতিহত হয়) এবং “আকছারুল ক্বাতলা লিয়া কিল্লালি ক্বাতলা” (বেশী বেশী হত্যা কর যাতে হত্যা কমে যায় )। এ বাক্যগুলো এতই জনপ্রিয় ছিল যে মানুষের মুখে মুখে থাকত। তাছাড়া এগুলোকে সর্বোচ্চ পর্যায়ের বাগ্মীতা হিসাবে বিবেচনা করা হত। এগুলোর ভাবার্থকে কোরআন কি সুন্দর উপস্থাপন করেছে দেখুন। “ওয়ালাকুম ফিল কিসাসে হায়াতুন।” (আর তোমাদের জন্য কেসাসেই জীবন)। এই বাক্যের সংক্ষিপ্ততা, বিন্যাস, প্রভাব, কল্যাণ ও তাৎপর্যতা এমনই যে পূর্বেকার সকল বাক্য যেন এর পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়ছে।

৩. কায়দার বা সাহিত্যের কারিশমা: কোরআনের কারিশমা বা মুজেযার সবচেয়ে উজ্জল দিক হল এর সাহিত্যে। আর এটা এমনই যে উচু নীচু সবাই তা বুঝতে সক্ষম। যেমন:

(ক) কোরআন এমনভাবে বিন্যস্ত যে কাব্যের কায়দা-কানুন সন্নিবেশিত না থাকলেও এর এমন এক রসবোধ রয়েছে যে যাতে কাব্য থেকেও বেশী স্বাদ আর সৌন্দর্য্য বিদ্যমান। এর ব্যাখ্যা হল:

মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতায় গদ্যে যে স্বাদ পায়, পদ্যে পায় এর চেয়ে অনেক গুণ বেশী। এই রস ও সৌন্দর্যে যদি দৃষ্টি দেয়া যায় তাহলে দেখা যাবে এর হাক্বীকত শব্দের ঐ ছন্দে লুকায়িত যা এক বিশেষ ধ্বনিসূচক অভিলাষ সৃষ্টি করে। আরবী, ফারসী ও বাংলার আদীম কবিতায় এই অভিলাষের স্বাদ এক বিশেষ ছন্দের কারনে সৃষ্টি হয়। যখন একই ধ্বনিসূচক ছন্দের শব্দ বারবার কানে পড়ে তখন বিশেষ এক স্বাদ পাওয়া যায়। ছন্দের সাথে যখন মিত্রাক্ষর থাকে তখন এর স্বাদ দ্বিগুন হয়ে যায় এবং যখন ছন্দ-জ্ঞানের সাথে কাব্য-জ্ঞান ও সাহিত্যিকতার মিশ্রণ ঘটে তখন তা হয়ে উঠে সোনায় সোহাগা। কিন্তু সাহিত্যের পাঠক মাত্রই জানেন ছন্দ আর মিত্রাক্ষরের নিয়ম সকল ভাষায় সমান নয়। প্রত্যেক ভাষাভাষিই তাদের চাহিদা ও মেজাজ অনুযায়ী এর জন্য আলাদা কায়দা তৈরি করে নেয়। উদাহরণস্বরুপ আরবেরা তাদের কবিতাকে খলীল বিন আহমদ গংদের তৈরিকৃত কায়দার আওতাধীন সীমাবদ্ধ রাখে। ফারসী কবিতায় ছন্দের আওতা আরও বিস্তৃত। কিন্তু মিত্রাক্ষর আর বহমানতাকে কঠোরতার মধ্যে রাখা হয়। যেমন: আরবী কবিতায় ‘কবুর’ এবং ‘কবির’ একই মিত্রাক্ষর হিসাবে গণ্য। এক ছত্রে ‘কুবুর’ ও আরেক ছত্রে ‘কবির’ এলে কোন দোষ ধরা হয় না। অন্যদিকে ফারসীতে এটা অসম্ভব। এভাবে আরবীতে যদি একটি বাক্যের অর্ধেক প্রথম ছত্রে ও অর্ধেক দ্বিতীয় ছত্রে আসে তাহলে কোন ভুল নেই, যখন ফারসীতে এটা মারাত্মক ভুল। বরং এমন কবিতা কবিতা হিসাবেই গন্য হয় না।

আরবী ও ফারসীর মধ্যে অসামন্জস্য থাকার পরও ছন্দে অনেকাংশেই মিল পাওয়া য়ায়। কিন্তু পুরনো হিন্দি কবিতা দেখুন। সেখানে ধ্বনিসূচক ছন্দাবদ্ধতা ব্যতিত শুধুমাত্র অক্ষরগণনাই বিবেচিত। দুটি বাক্যের অক্ষর এক হলেই তাদের একই ছন্দ বলে বিবেচিত হত যদিও এর ধ্বনিসূচক ছন্দাবদ্ধতার বিরাট পার্থক্য থাকে। আর এ ব্যাপারে ইংরেজী কবিতা সবচেয়ে মুক্ত মনে হয়। ইংরেজীতে বাহ্যিক ছন্দাবদ্ধতার মধ্যে তো আকাশ-পাতাল ফারাক্ব রয়েছেই, অধিকাংশ মিত্রাক্ষরের কোন বিশেষ আবেদনই থাকে না। বরং শুধুমাত্র এর উচ্চারণের সিলাবল থেকে বিশেষ এক রিদম সৃষ্টি করা হয় এবং এই রিদমই নেটিভদের কাছে এক বিশেষ স্বাদ ও রস নিয়ে আবির্ভূত হয়।

উপরোক্ত ব্যাখ্যা থেকে এটাই বুঝা যায় যে কবিতার স্বাদ ও সৌন্দর্যের জন্য নির্ধারিত কোন ছন্দ কিংবা মিত্রাক্ষর এর কায়দা কোন বিশ্বজনীন মর্যাদা রাখে না। কারন এ কায়দা বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ভাষায় এসে পরিবর্তিত হয়ে যায়। কিন্তু একটা জিনিস রয়েছে যা সকল জাতির নিকট সার্বজনীন ভাবে আবেদন রাখে আর তা হল ‘ছন্দের ধ্বনিবাচক রিদম’। অর্থাৎ বাক্য এমনভাবে বিন্যাস করা যাতে তা উচ্চারণ করলে ও শুনলে মানুষের মন আন্দোলিত হয়। যেহেতু মানুষ এটাকে ছন্দ ও মিত্রাক্ষর থেকে আলাদা করতে অক্ষম তাই তারা তাদের নিজস্ব ভাষার কায়দা অনুসরণে বাধ্য থাকে। এটা শুধু পবিত্র কোরআনেরই মুজেযা যে সে দুনিয়ার বিভিন্ন ভাষার কবিতার কোন কায়দাই অনুসরণ করেনি বরং শুধুমাতও ‘ছন্দের ধ্বনিবাচক রিদম’ কেই অবলম্বন করেছে যা সকল কায়দা-কানুনের আসল মক্বসুদ। এ কারণেই কোরআন গদ্য হওয়ার পরও পদ্যের চেয়েও বেশী স্বাদ ও সৌন্দর্যের মালিক। তাই শুধু আরবরাই নয় দুনিয়ার যে কোন ভাষার লোক এটা শুনে অকল্পনীয় স্বাদ ও প্রভাব অনুভব করে।

এ থেকেই একথা বুঝা যায় যে কোন কোন আরব কেন কোরআনকে পদ্য হিসাবে গণ্য করেছিল। একথা প্রকাশিত যে পদ্যের প্রচলিত সজ্ঞা কোনরুপই কোরআনের উপর ফেলা যায় না এবং আরবের কাফেরেরা তাদের হাজারো মূর্খতার মধ্যেও পদ্য ও গদ্যের পার্থক্য বুঝতে পারতো। এটা তাদের অজানা ছিল না যে পদ্যের জন্য ছন্দ ও মিত্রাক্ষরের অনুসরণ জরুরী। যা কোরআনে অপ্রাপ্য। এরপরও তাদের এঁটাকে পদ্য বলার কারন এর সাবলিলতা আর রিদমে তারা পদ্যের চেয়েও বেশী স্বাদ ও সৌন্দর্য্য অনুভব করেছে। এবং এটা বুঝতে পেরেছিল যে ছন্দ আর মিত্রাক্ষরে পাবন্দী ব্যতিতই এমন এক দু:¯প্রাপ্য সৌন্দর্য্য এতে নিহিত যা ছন্দোবদ্ধ কোন কবিতায় পাওয়া অসম্ভব।
কোরআন এই ‘ছন্দের ধ্বনিসূচক রিদম’ অনুসরণ করতে গিয়ে তাহলে কোন কানুন অনুসরণ করেছে? একথা ব্যাখ্যা করা মানুষের সাধ্যের বাইরে। হ্যা, তবে যে ব্যাক্তির সাহিত্যে সামান্য হিস্যা রয়েছে সে উপরোক্ত ব্যাখ্যার সত্যতা কোরআন তেলাওয়াতের মধ্যেই অটোমেটিকভাবে অনুভব করতে পারবে।

(খ) ভাষা-অল্কংার শাস্ত্রের পন্ডিতেরা সহিত্যের কায়দাকে তিন প্রকার বলেছেন। ১. সম্ভাসন ২. সাহিত্য ৩. জ্ঞান। এ তিনটিই পৃথক পৃথক বিষয়। প্রত্যেকটার বিশেষত্বও আলাদা। একই রচনায় তিনটি একত্রিত করা অসম্ভব। কেউ যখন বক্তব্য দেয় তখন তার মনোযোগ থাকে শ্রোতার দিকে। যখন কেউ কবিতা লেখে তখন তার নজর থাকে সাহিত্যের দিকে। আর যখন কেউ কোন জ্ঞান-গর্ব প্রবন্ধ রচনা করে তখন তার দৃষ্টি থাকে অন্য কায়দার দিকে। কিন্তু কোরআনের মুজেযা হল সে ঐ তিনটি নিয়েই একসাথে চলছে। এতে আছে সম্ভাষনের প্রভাব, কায়দার প্রস্ফুটন আর ইলমের গাম্ভীর্যতা। এবং কোনটাতেই কোন কমতি নেই।

(গ) কোরআনের সম্বোধিত ব্যক্তি যেমন গ্রাম্য মূর্খ, তেমনি পড়া-লেখা জানা ব্যক্তি, তেমনি উচ্চ পর্যায়ের শিক্ষিত-পন্ডিত ও বিভিন্ন বিষয়ের বিশেষজ্ঞেরাও। কিন্তু তার একটি কায়দা সবার উপরেই প্রভাব বিস্তার করে। অশিক্ষিত লোকেরা এখান থেকে সহজ সরল ব্যাখ্যা পেয়ে ভাবতে থাকে তাদের জন্যই যেন কোরআন অবতীর্ন হয়েছে। অন্যদিকে যখন শিক্ষিত-পন্ডিতেরা এদিকে গভীর দৃষ্টি দেন তখন কোরআনের জ্ঞানগর্বতা দৃষ্টিগোচর হয়। মনে হয় এই বই বিভিন্ন বিষয়ের এমন সুক্ষ ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেছে যে সাধারণ জানা-পড়া লোক এটা বুঝতেই অক্ষম।

(ঘ) কোরআন এমন কিছু বিষয়ে বাগ্মীতার চুড়ান্ত দেখিয়েছে যেখানে মানুষ হাজারো চেষ্টা করে কোন সাহিত্য-রস সৃষ্টি করতে পারেনি। যেমন উত্তরাধিকার আইন। এটা এমন এক কর্কশ আর দুর্গম বিষয় যে দুনিয়ার তাবৎ সাহিত্যিক-কবি মিলেও এখানে বাক্যের সাবলিলতা, সাহিত্যিকতা আর সৌন্দর্য্যতা সৃষ্টি করতে পারেনি। কিন্তু কোরআনের সূরা নিসার “ইউসিকুমুল্লাহু ফি আওলাদিকুম…” এই রুকু তেলাওয়াত করুন। আপনি হঠাৎ চিৎকার করে উঠবেন যে, এটা কোন সাধারণ রচনা নয়। এই পুরো রুকুতে উত্তরাধিকার আইন বর্ণিত হয়েছে সাথে সাথে প্রস্ফুটিত হয়েছে সাহিত্যের সৌন্দর্য্যতা।

(ঙ) প্রত্যেক কবি-সাহিত্যিকের বগ্মিতা ও বাকপটুতার বিশেষ একটি ক্ষেত্র থাকে, যেখান থেকে বিচ্যুত হলেই তার রচনা হয়ে উঠে পানসে। কিন্তু কোরআন এতো বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছে যে তার সার্কেল করা সত্যিই কঠিন। উৎসাহ বা নিরুৎসাহ, ওয়াদা বা ভীতি প্রদর্শন, বক্তব্য কিংবা উপদেশ, উদাহরণ হোক কিংবা কাহিনী, বিশ্বাসের কথা কিংবা আইনের ধারা প্রত্যেক স্থানে কোরআন সাবলিল বাগ্মীতা প্রদর্শন করেছে।

আসলে কোরআন নিয়ে কেউ যদি নিরপেক্ষভাবে ভাবনা-চিন্তা করে তাহলে আমি নিশ্চিত মানুষ কোরআনের বিরুদ্ধে কোন কিছুই খুজে পেত না। একটা কথা আছে “দেখতে নারি চলন বাকা”। ঘটনা এখনকার সময়ে তাই ঘটছে। কোরআনের কোন তুলনাই কোন বইয়ের সাথে হতে পারে না।

Permission is taken  from Source    http://prothom-aloblog.com/users/base/hussain/

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: