ইসলামের দৃষ্টিতে আমানতদারী

সুরা নিসা-আয়াত ৫৮-“নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদিগকে র্নিদেশ দেন যে, তোমরা যেন প্রাপ্য আমানতসমূহ প্রাপকদের নিকট পৌছে দাও। আর যখন তোমরা মানুষদের কোন বিচার-মীমাংসা করতে আরম্ভ কর, তখন মীমাংসা কর ন্যায়ভিত্তিক। আল্লাহ তোমাদিগকে সদুপদেশ দান করুন। নিশ্চয়ই আল্লাহ শ্রবণকারী আর দর্শনকারী।”

প্রথমে এ আয়াতটি নাযিল হওয়ার পেছনের ঘটনা জেনে নেই। জাহেলিয়াত আমল থেকেই কা’বা ঘরের চাবি নিজের কাছে রাখা এবং র্নিধারিত সময়ে তা খুলে দেয়া ও বন্ধ করার ভার ছিল ওসমান ইবনে তালহার উপর। হিজরতের র্পূবে একবার মহানবী( সা) কতিপয় সাহাবীসহ বায়তুল্লা হতে প্রবেশের উদ্দেশ্যে তশরীফ নিয়ে গেলে ওসমান ( যিনি তখনো ইসলাম গ্রহণ করেননি) তাঁকে ভেতরে প্রবেশে বাধা দিলেন এবং অত্যন্ত বিরক্তি প্রকাশ করলেন।কিন্তু মহানবী ( সা) অত্যন্ত র্ধৈয ও গার্ম্ভীয সহকারে ওসমানের কটূক্তিসমূহ সহ্য করে নিলেন। অত:পর বললেন, হে ওসমান! হয়ত তুমি একসময় বায়তুল্লাহর এই চাবি আমার হাতেই দেখতে পাবে। তখন যাকে ইচ্ছা এ চাবি অর্পণ করার অধিকার আমারই থাকবে। ওসমান বলল, তাই যদি হয় তবে সেদিন কোরাইশরা অপমানিত অপদস্থ হয়ে পড়বে। নবীজী (সা) বললেন, না, তা নয়। তখন কোরাইশরা আযাদ হবে, তারা হবে যর্থাথ সম্মানে সম্মানিত। এ কথা বলতে বলতে তিনি বায়তুল্লাহর ভেতর থেকে তশরীফ নিয়ে গেলেন। ওসমানের মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মালো যে, তা অবশ্যই ঘটবে। তিনি তখনই মুসলমান হয়ে যেতে চাইলেন। কিন্তু তার সম্প্রদায়ের লোকেরা তাকে র্ভৎসনা করে নিরস্ত করল।

অত:পর মক্কা বিজিত হয়ে গেলে রসূলে করীম (সা) ওসমানকে ডেকে চাবি চাইলেন। তিনি তা পেশ করলেন। কোন কোন র্বণনামতে, এ সময় ওসমান চাবি নিয়ে বায়তুল্লাহর উপরে উঠে যেতে চাইলে হযরত আলী (রা) বলর্পূবক তার কাছ থেকে চাবি ছিনিয়ে নিয়ে হুযুরের হাতে অর্পণ করেন। বায়তুল্লায় প্রবেশ ও সেখানে নামাজ আদায় শেষে নবীজী (সা) বেরিয়ে এসে সে চাবি পুনরায় ওসমানের হাতে ফিরিয়ে দিয়ে বললেন, এই নাও, এখন থেকে এ চাবি কেয়ামত র্পযন্ত তোমার বংশধরদের হাতেই থাকবে। অন্য কেউ তোমাদের হাত থেকে এ চাবি ফিরিয়ে নিতে চাইবে সে হবে যালেম, অত্যাচারী। সেই সাথে তিনি বললেন, বায়তুল্লাহর খেদমত করে তোমরা যে সম্পদ প্রাপ্ত হবে, তা শরীয়তের রীতি মোতাবেক ব্যবহার করবে।

যখন ওসমান হৃষ্টচিত্তে চাবি নিয়ে চলে আসছিলেন তখন নবীজী (সা) তাকে হিজরতের আগের দিনটির কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন আর ওসমান তখনই কলেমা পড়ে মুসলমান হয়ে গেলেন।

হযরত ওমর (রা)এর বর্ণনামতে, সেদিন যখন মহানবী (সা) বায়তুল্লাহ থেকে বেরিয়ে আসেন তখন তাঁর মুখ থেকে আলোচ্য আয়াতটি আবৃত হচ্ছিল। এ হুকুমের লক্ষ্য সাধারণ মুসলমানরাও হতে পারে, আবার বিশেষভাবে ক্ষমতাসীন শাসকর্বগও হতে পারেন। তবে একটা বিষয় স্পষ্ট, এমন সকলে যারা আমানতের রক্ষক বা আমানতদার- তারা সকলে এর লক্ষ্য।

এখন জানা প্রয়োজন – কে বা কারা আমানতদার। কোরআন করীম আমানতের বিষয়টিকে আরবী ‘আমানাত’ শব্দ দিয়ে বহুবচনে উল্লেখ করেছে। কারো নিকট অপর কারো কোন বস্তু বা সম্পদ গচ্ছিত রাখাটাই শুধুমাত্র আমানত নয়। যদিও আমরা সাধারণত তা-ই মনে করে থাকি। আলোচ্য আয়াতের শানে-নুযুল প্রসঙ্গে যে ঘটনার উল্লেখ করেছি, তা কোন বস্তুগত আমানত ছিল না। বরং তা ছিল বায়তুল্লাহর খেদমতের পদের একটা র্নিদশন। এতে প্রতীয়মান হয় যে, বস্তুগত আমানত ছাড়াও কোন পদের নিয়োগ-বরখাস্তের অধিকার রয়েছে যাদের হাতে এমন ব্যক্তির নিকট সেই পদটিও আমানতস্বরূপ- তা রাষ্ট্রীয় পদ হোক বা আধুনিক কোন প্রাইভেট-পাবলিক কোম্পানি বা ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের পদই হোক। এমন র্কমর্কতাদের পক্ষে কোন পদ এমন কাউকে অর্পণ করা উচিত নয়, যে লোক সেই পদের যোগ্য নয়। বরং প্রতিটি কাজের জন্য নিজের ক্ষমতা ও সাধ্য অনুযায়ী যোগ্য ব্যক্তির সন্ধান করা র্কতব্য। আর সেই যোগ্য ব্যক্তি যদি নিয়োগর্কতার বিরোধী পক্ষেরও হয় তবুও নিয়োগে সততা অবলম্বন করতে হবে, অনুপযুক্ত লোকের হাতে ক্ষমতা দেয়া যাবে না।

একদা হযরত নবী করীম (সা) এক মজলিসে সাহাবাদের সাথে কথার্বাতা বলছিলেন। এ সময় হঠাৎ এক গ্রাম্য ব্যক্তি সেখানে আগমন করে নবীজীকে (সা) প্রশ্ন করল, কেয়ামত কখন সংঘটিত হবে। নবীজী (সা) তাকে কিছু না বলে লোকদের সাথে কথার্বাতা বলতে লাগলেন। তা দেখে কেউ কেউ বললেন, নবী করীম (সা) তার প্রশ্ন শুনেছেন, কিন্তু তাঁর তা পছন্দ হয়নি।আবার কেউ কেউ বললেন, তিনি তার কথা অবশ্যই শুনেছেন। কিছুক্ষণ পর নবীজী (সা) সাহাবীদের সাথে কথা সমাপ্ত করে বললেন, কেয়ামত সর্ম্পকে প্রশ্নকারী কোথায়? প্রশ্নকারী বললেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ (সা) ! আমি এখানে হাজির আছি। তখন নবীজী (সা) বললেন, যখন আমানতের খেয়ানত করা হবে তখন কেয়ামতের অপেক্ষা কর। অত:পর প্রশ্নকারী বললেন, খেয়ানত কিভাবে হবে? নবীজী (সা) বললেন, যখন অনুপযুক্ত ব্যক্তিদের হাতে নেতৃত্ব প্রদান করা হবে, তখনই কেয়ামতের অপেক্ষা কর। (সহীহ বোখারী – ৫৪)
অতএব যে পদের জন্য যেরূপ এলেম, অভিজ্ঞতা দরকার সেই পদের জন্য তেমন ব্যক্তির উপস্থিত থাকা সত্বেও তার চেয়ে কম যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিকে স্বজনপ্রীতি বা আর্থিক বা অন্যকোন সুবিধা লাভের আশায় নিয়োগ দেয়া হলে তা হবে নিয়োগকারীর জন্য আমানতের খেয়ানত।

বোখারী ও মুসলিমে হযরত আবু হোরায়রা (রা) ও হযরত ইবনে ওমর (রা) থেকে বর্ণিত যে, রাসুলুল্লাহ (সা) একদিন মুআফেকীর লক্ষণ বর্ণনা প্রসঙ্গে একটি লক্ষণ এটাও বলেছিলেন যে, যখন তার কাছে আমানত রাখা হয় তখন সে তাতে খেয়ানত করে। সুতরাং অযোগ্য ব্যক্তিকে নিয়োগদাতা মুনাফিকও বটে।

রাষ্ট্রীয় পদের নিয়োগদাতাদের দায়িত্ব সাধারণ নিয়োগদাতার চেয়ে অনেক বেশী এ কারণে যে, রাষ্ট্রীয় পদে নিয়োগলাভকারী একটি র্নিদিষ্ট এলাকায় নিয়োগ পেলেও তার কাজের, তার সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়বে সেই এলাকার ত বটেই সমস্ত দেশের জনগণের উপর। তাই কাজের যোগ্যতা আর আমানতদারীর ব্যাপারে নিয়োগলাভকারীর উপর র্পূণ আস্থা থাকতে হবে।

যোগ্য ব্যক্তি নিয়োগ পেলেই যে আমানতদারীর দায়িত্ব শেষ হয়ে গেল – তা নয়। যোগ্য ব্যক্তি যেন বংশ, গোত্র, র্বণ, ভাষা এমনকি র্ধম ও মতবাদের র্পাথক্য না করে সঠিক ও ন্যায়সঙ্গত সিদ্ধান্ত নেয়, সঠিক মীমাংসা করে – তা তার উপর ফরজ। এ ব্যাপারে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা) র্কতৃক র্বণিত, তিনি বলেন, নবী করীম (সা) বলেছেন, তোমরা সাবধান হও! তোমরা প্রত্যেকেই এক একজন দায়িত্বশীল। আর কেয়ামত দিবসে তোমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব সর্ম্পকে জিজ্ঞাসা করা হবে। জনগণের শাসকও একজন দায়িত্বশীল। সুতরাং তার দায়িত্ব সর্ম্পকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। স্ত্রীও তার স্বামীর পরিবার এবং সন্তানের উপর দায়িত্বশীল। ঐদিন তার দায়িত্ব সর্ম্পকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। এমনকি কোন ব্যক্তির গোলাম বা দাস তার প্রভুর সম্পদের ব্যাপারে একজন দায়িত্বশীল। তাকেও ঐদিন তার দায়িত্ব সর্ম্পকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। অতএব সাবধান! তোমরা প্রত্যেকেই এক একজন দায়িত্বশীল। আর এ দায়িত্ব সর্ম্পকে তোমাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। (সহীহ বোখারী – ৩৮৩০)

প্রকৃত হুকুম ও র্নিদেশদানের মালিক আল্লাহসুবহানাহুতাআলা। পৃথিবীর শাসকর্বগ তাঁর আজ্ঞাবহ। এতে প্রতীয়মান হয় যে, শাসনক্ষেত্রে সার্বভৌমত্বের মালিকও আল্লাহতাআলাই।

আল্লাহসুবহানাহুতাআলা আমাদের সকলকে নিজ নিজ দায়িত্ব – পারিবারিক, রাষ্ট্রীয় কি র্কমক্ষেত্র সর্ম্পকিত দায়িত্ব আমানতদারীর সাথে পালনের তৌফিক দিন। আমিন।

Permission is  taken from Source  http://prothom-aloblog.com/users/base/tasnima/

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: