ইসলামে সামাজিক দায়বদ্ধতা

সামাজিক জীবন-যাপনে অনেক নিয়ম-কানুন ও পদ্ধতি প্রতি পালন করতে হয়; কর্তব্য কর্ম দায়িত্বসমূহ নিষ্ঠার সাথে অনুশীলন করে প্রতিনিয়ত তৎপর হওয়া অপরিহার্য। আর এরই মধ্যে সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রতিফলন ঘটে থাকে। আরবের অরাজক এক অবস্থায় বিশ্ব নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর আবির্ভাব ঘটায় নবুয়্যতলাভের পর ইসলামের দাওয়াত মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিয়ে মানুষের উপর মানুষের প্রভূত্বকে উৎখাত করেন এবং এক আল্লাহ্‌র প্রভুত্বের ভিত্তিতে এক নতুন সমাজ ব্যবস্থা কায়েম করেন। সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ সমাজ সংস্কারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে তিনি (সাঃ) ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন। তৎকালীন বিশৃঙ্খল আরব জাতিকে সুসংগঠিত করে বিশৃঙ্খল জীবন-প্রবাহ থেকে সুশৃঙ্খল সমাজ ব্যবস্থায় নিয়ে আসেন। তিনি অনুকরণযোগ্য নিয়ম-কানুন, নীতি-পদ্ধতি সুসংগঠিত সমাজ গঠনে প্রতিষ্ঠা করেন।
হাদীসে এসেছে -“সকল মুসলমান (সম্মিলিতভাবে) যেন একটি প্রাচীর, যার প্রতিটি অংশ বাকি অংশগুলোকে দৃঢ় করে। এমনিভাবে তারা নিশ্চয়ই প্রতিষ্ঠিত হবে একে অন্যের সহায়তায়”। ‘মুসলমান ভাইকে মুসলমান ভাই সাহায্যে করবে, সে অত্যাচারিত হোক বা অত্যাচারী হোক’। কিন্তু সে অত্যাচারী হলে কিভাবে আমারা সাহায্য করব? রাসূলে আকরাম (সাঃ) বললেন, ‘তাকে অত্যাচার করা থেকে নিষেধ ও নিরস্ত করবে’।
হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ) বলেছেন, “সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না, যে ব্যক্তি আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে” (মিশকাত শরীফ)। হাদীসে আরো পাই “সেই ব্যক্তি মু’মিন হতে পারে না, যে ব্যক্তি নিজে পেট ভরে পানাহার করে, কিন্তু তার পার্শ্বেই প্রতিবেশী খাদ্যের অভাবে অভুক্ত থাকে।” (মিশকাত-বায়হানী)।
প্রিয় নবী (সাঃ)বলেছেন- “সে আমার উম্মত নয়, ‘যে প্রতিবেশীর খোঁজ-খবর করে না।” তিনি এও পরামর্শ দিয়েছেন, পিতা-মাতা, স্ত্রী-সন্তানসহ সকল আত্মীয়-স্বজন ও মুসলমানদের হক আদায়ে সচেষ্ট থাকতে হবে। মোট কথা, মানুষের হকের ব্যাপারে খুব বেশি ফিকির রাখা অবশ্যম্ভাবী, নতুবা সমস্ত ইবাদত বিফলে যাবে। ওই ‘হক’ হচ্ছে পারিবারিক-সামাজিক দায়বদ্ধতা। এ দায়বদ্ধতা থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখলে ব্যক্তির ইবাদতসমূহ কোন কাজে আসবে না।
সূরা-নাহ্‌ল-এর ১৯ আয়াতে আছে “তোমরা যা গোপন রাখ এবং যা প্রকাশ কর আল্লাহ তা জানেন”। সমাজে তথা পৃথিবীতে যারা অশান্তি সৃষ্টি করে তাদের জন্য  সূরা-রা’দ এর ২৫ আয়াতে আল্লাহ্‌ ইরশাদ করেছেন, ‘যে সম্পর্ক অক্ষুণ্ন রাখতে আল্লাহ আদেশ করেছেন, তা ছিন্ন করে এবং পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করে বেড়ায়, তাদের জন্য আছে লা’নত এবং তাদের জন্য আছে মন্দ আবাস।’ সূরা আল বাকারার ৮৩ আয়াতে আল্লাহ্‌ ইরশাদ করেন, ‘মাতা-পিতা, আত্মীয়-স্বজন, পিতৃহীন ও দরিদ্র্যদের প্রতি সদয় ব্যবহার করবে এবং মানুষের সঙ্গে সদালাপ করবে, সালাত কায়েম করবে ও যাকাত দিবে—’। অন্যত্র ৮৪ আয়াতে আছে— ‘তোমরা পরস্পরে রক্তপাত করবে না এবং আপনজনকে স্বদেশ হতে বহিষ্কার করবে না’,–। সূরা তাহ্‌রীম -এর ৬ আয়াতে আল্লাহ ইরশাদ করেছে ‘হে মু’মিনগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার পরিজনকে রক্ষা কর দোজখ হতে, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর’।
হ্যাঁ, ওই দোজখের আগুন থেকে বাঁচার জন্যই সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রতি অবশ্য যত্নবান হতে হবে।
রাসূলে আকরাম (সাঃ) স্বীয় পরিবারের লোকদের ব্যাপারেও খুব লক্ষ রাখতেন। যাতে তার জন্য তাদের কোন রকম কষ্ট না হয়। এজন্য রাতে ঘর থেকে বের হওয়ার প্রয়োজন হলে অত্যন্ত ধীরস্থির ভাবে উঠে জুতা পরিধান করতেন এবং নিঃশব্দে দরজা খুলে বের হতেন। অনুরূপ ভাবে ঘরে প্রবেশ করার সময়ও নিঃশব্দে প্রবেশ করতেন, যাতে কারো ঘুমের কোন প্রকার ব্যাঘাত না ঘটে (মিশকাত-১৮১-১৮২)।
মুসা (আঃ) আল্লাহকে এক সময় বলেন, আল্লাহ্‌ আমি তো তোমার জন্য ইবাদত করি, রোজা রাখি, তোমার নির্দেশ অন্তর দিয়ে পালন করি, তুমি কি আমাকে ক্ষমা করবে না? তখন-এর জবাবে আল্লাহ্‌ বলেন, তুমি নামাজ পড়ো দোজখের শাস্তি থেকে রক্ষা পেতে, রোজা রাখো আগুন থেকে রক্ষার ঢাল হিসেবে, ইবাদত করো তোমার কল্যাণের নিমিত্তে এগুলো সব তোমার নিজের জন্য আমার জন্য কিই বা করলে? হে আল্লাহ্‌ তাহলে! তুমি কি মানুষকে ভালোবাসা দাও! মানুষকে ভালোবাস তবেই আমার জন্য কিছু করা হবে। এখানেও মানুষ তথা সামাজিকবৃন্দের প্রতি অশেষ গুরুত্ব প্রদান করেছেন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন।
হাদীসে আছে-অন্যের রক্ত, সম্পদ ও ইজ্জত তোমার কাছে পবিত্র আমানত, এর খেয়ানত করা হারাম।’ হাদীসে সামাজিকতাকে অনেক গুরুত্ব দেয়ায় আমরা সেখানে পাই- ‘যে বড়দের সম্মান করে না, ছোটদের স্নেহ করে না, সে আমার উম্মত নয়’। এর চাইতে শক্ত কথা আর কি হতে পারে।
নবী করীম (সাঃ) পারিবারিক দায়িত্ববোধ থেকে এবং সামাজিক কর্তব্য থেকেও দিনের সময়কে তিন ভাগ করে এক ভাগ আল্লাহর ইবাদত ও দ্বীনের কাজ, একভাগ পরিবার -পরিজনের খোঁজ খবর নেয়ার জন্য এবং আর এক ভাগ ব্যক্তিগত কাজ ও নিজের শারীরিক সুস্থতা বজায় রাখার জন্য নির্দিষ্ট করে নেয়ার তালীম দিতেন (উসওয়ায়ে রাসূলে আকরাম, ১০৪)
অন্যদিকে মুসলিম হাদীসে উল্লেখ রয়েছে- “যে বান্দা তার ভাইয়ের সাথে শত্রুতা পোষণ করে সে ছাড়া প্রত্যেক মুমিন বান্দাকে মাফ করে দেয়া হয়।”

সামজের মাঝে মানুষে মানুষে বিরোধ দেখা দিলে তা মিটিয়ে ফেলার প্রয়াস নিতে হবে। এ ব্যাপারে পবিত্র কোরআনের সূরা-শূরার ৪০ আয়াতে আছে” যে ক্ষমা করে দেয় ও আপোষ নিষ্পত্তি করে তার পুরস্কার আল্লাহর নিকট আছে। আল্লাহ জালিমদেরকে পছন্দ করেন না।’ অন্য এক আয়াতে (সূরা-শূরা-আয়াত-৪৫) আছে— ‘ক্ষতিগ্রস্ত তারাই যারা নিজেদের ও নিজেদের পরিজনবর্গের ক্ষতিসাধন করেছে।’ জেনে রাখ জালিমরা অবশ্যই ভোগ করবে স্থায়ী শাস্তি।
সমাজে নানারকম বৈষম্য দেখা যায়। বৈষম্যের কারণে মানুষে মানুষে নানারকম অবস্থার সৃষ্টি হতে থাকে। ফলে সমাজ হয়ে পড়ে বন্ধনহীন, ওই বন্ধন অটুট রাখার লক্ষে আল্লাহ পাক ইরশাদ করেছেন- যারা সচ্ছল ও অসচ্ছল অবস্থায় ব্যয় করে (দান খয়রাত দেয়, অপরকে সাহায্য করে) এবং যারা ক্রোধ সংবরণকারী এবং মানুষের প্রতি ক্ষমাশীল; আল্লাহ্‌ সৎকর্মপরায়ণদেরকে ভালোবাসেন, (সূরা-আল-ইমরান-আয়াত-১৩৪১)।মানবতার সেবায় যিনি নিজের জীবন নিঃশেষে বিলিয়ে দিতে পারেন, তিনিই মহামানব। যার থেকে (প্রতিবেশীর) ক্ষতির কোন আশঙ্কা নেই তিনি উত্তম একজন মানুষ, ঈমানদার একজন মানুষ।’ এমনকি বিপদগ্রস্তের পাশে দাঁড়াতে হাদীসে তাগিদ রয়েছে। এও বলা হয়েছে, ‘রোগীর সেবা ও শুশ্রূষাকারী নিজ গৃহে ফিরে না আসা পর্যন্ত বেহেস্তের পথে চলতে থাকে’।
মুসলমানদের গোষ্ঠীতে গোষ্ঠীতে ভাগ হতে বলেননি, বরং ধ্বংসের/বিনাশের হাত থেকে বাঁচার জন্য নবী করীম (সাঃ) ও তাঁর প্রিয়জনের অনুগামী থাকার মতাদর্শে সংলগ্ন থাকারই জন্য সতর্কতা প্রদান করেছেন। এ ব্যপারে আল্লাহ্‌ পাক ইরশাদ করেছেন- ‘তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জু দৃঢ়ভাবে ধর এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হইও না। তোমাদের পতি আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ কর, তোমরা ছিলে পরস্পর শত্রু এবং তিনি তোমাদের হৃদয়ে প্রীতির সঞ্চার করেন, ফলে তাঁর অনুগ্রহে তোমরা পরস্পর ভাই হয়ে গেলে। তোমরা তো অগ্নিকুণ্ডের প্রান্তে ছিলে আল্লাহ তা থেকে তোমাদের রক্ষা করেছেন”—

আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করতে হলে সামাজিক দায়বদ্ধতাকে অনুশীলনের প্রয়াস ঐকান্তিকতার সাথে চালাতে হয়।”
মূলকথা হচ্ছে ইসলামের গুরত্বনুযায়ী মহানবী (সাঃ)- এর জীবনাদর্শ ও শিক্ষাকে অনুশীলন করে সামাজিক দায়বদ্ধতার গুরুত্বকে যথাযথ অনুধাবনের মাধ্যমে জীবন-যাপন করতে হবে। দুনিয়ার সুখ-শান্তি অক্ষুণ্ন রাখার স্বার্থে আমাদের সকল প্রকার বিদ্বেষ, ঈর্ষা ভুলে গিয়ে আত্মীয়-স্বজন ও সামাজিকবৃন্দের সাথে সুসম্পর্ক গড়ায় আরো সর্তক, সচেতন ও আন্তরিক হওয়া সমীচীন!

Permission is Taken from Source http://islamicbanglabd.blogspot.com

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: