হজরত হাজেরার কোরবানি

হজরত ইসমাঈল (আ.)-এর বয়স যখন ১১ বছর তখন হজরত ইবরাহিম (আ.) স্বপ্নে কোরবানির আদেশ পেলেন, তিনি পশু কোরবানি দিলেন, আবারও স্বপ্ন দেখলেন, এবারও পশু কোরবানি দিলেন, না, আবারও স্বপ্নে দেখলেন। এবার আলাহ যেন হজরত হাজেরা ও হজরত ইসমাঈলের পরীা নিতে চান, এবার দেখলেন সবচেয়ে প্রিয় বস্তুকে কোরবানি দিতে।

মসউদ-উশ-শহীদ

হজরত আছিয়া (রা.), হজরত রহিমা (রা.) এই দুই মহীয়সী নারীর মতো হজরত হাজেরা (রা.)ও ছিলেন আলাহর কাছে আÍসমর্পণকারী অন্যতম ত্যাগী মহীয়সী নারী। হজরত আছিয়া (রা.) ছিলেন ফেরাউনের স্ত্রী। তিনি পরম যত্নে লালন-পালন করেন হজরত মূসা (আ.)-কে। তিনি ছিলেন আলাহভীরু ঈমানদার। ফেরাউনের ভয়ভীতি তাকে কোনদিন স্পর্শ করেনি। ফেরাউন শেষমেশ তাকে পুত্র-সস্তানসহ নির্মমভাবে হত্যা করে। তিনি শাহাদতবরণের আগে বেহেশতে তার জন্য সুরম্য দালানের প্রার্থনা করেছিলেন দুনিয়ার এই কষ্টের বিনিময়ে। আলাহতায়ালা তার এই প্রার্থনা কবুল করেছেন। হজরত রহিমা (রা.) হজরত আইয়ুব (আ.)-এর স্ত্রী। তিনি অসুস্থ, রোগাক্রান্ত স্বামীকে নির্জন প্রাস্তরে ১৮ বছর সেবাশুশ্রষা করেছিলেন। হজরত আছিয়া (রা.) আর হজরত রহিমা (রা.) ঈমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন।

হজরত হাজেরা (রা.)ও তাদের মতো একজন ঈমানদার নারী। শৈশবকাল থেকেই তিনি বারবার অগ্নিপরীক্ষার সম্মুখীন হন। তিনি মিসরের বাদশাহ দ্বিতীয় ফেরাউনের কন্যা ছিলেন। তার নাম ছিল জুলাইন, তিনি অত্যন্ত- ধার্মিক বাদশাহ ছিলেন। তিনি তার স্ত্রী ও ১০ বছর বয়সী একমাত্র কন্যা হাজেরাকে নিয়ে তীন শহরের এক প্রাচীন মসজিদসংলগ্ন নববর্ষের মেলায় যান। সেখান থেকে ফেরার পথে ধার্মিক বাদশাহ জুলাইন ও তার স্ত্রীকে হত্যা করে ধনসম্পদ লুট করে নেয় ডাকাতরা। হজরত হাজেরাকে দেখে তাদের মায়া হল। তারা তাকে হত্যা না করে সঙ্গে নিয়ে গেল। ডাকাতরা লুণ্ঠিত মালামাল সাধুক নামক এক লোকের কাছে বিক্রি করতে গেলে যে হাজেরার পরিচয় জানতে চাইল। সাধক ছিল নিঃসন্তান। সে হাজেরাকে দত্তক নিতে চাইলে ডাকাতরা সানন্দে হাজেরাকে তার হাতে অর্পণ করল। সাধুক তাকে নিজের মেয়ের মতো আদর-যত্নে লালন-পালন করতে লাগল। পরে সাধুকের এক পুত্রসন্তানের জন্ম হলে সাধুকের স্ত্রী তার ওপর অমানুষিক অত্যাচার শুরু করে দিল। চাকর-বাকরের মতো তার ওপর নির্যাতন চালাত। পালিত পিতা সাধুকও তেমন নজর দিত না তার প্রতি। এভাবেই কষ্টের জীবনযাপন শুরু হল।

এদিকে সাধুকের স্বভাবেরও পরিবর্তন হতে লাগল। সে তার বাদশাহীকে অত্যাচারের চরমে নিয়ে গেল। ঠিক সেই সময় আলাহর অদৃশ্য ইচ্ছায় ইবরাহিম (আ.) তার স্ত্রী হজরত সারাকে নিয়ে গেলেন সেই বাদশাহর দেশে। বাদশাহ তাকে কারাগারে বন্দি করে হজরত সারাকে তার কুপ্রবৃত্তি চরিতার্থ করার জন্য নিয়ে গেল রাজঅন্দরে। আর যতবারই সে হজরত সারার দিকে হাত বাড়ায় ততবারই সে পঙ্গু হয়ে যায়। পরে সে মাফ  চেয়ে হজরত হাজেরাকে তাদের হাতে অর্পণ করে ইবরাহিম (আ.) ও হজরত সারাকে মুক্ত করে দেয়। এটুকুই ছিল হজরত হাজেরার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। কিন্তু খ্রিস্টানদের কুৎসা রটনার অনুসারে অনেক ঐতিহাসিক তাকে ক্রীতদাসী হিসেবে বর্ণনা করেন। তৎকালে পরাজিত সম্রাটরা বিজয়ীদের কাছে উপঢৌকন প্রদানের সাজে নিজের বংশের কোন নারীকেও দেয়া হতো প্রীতির নিদর্শনস্বরূপ। সে যা হোক, পিতৃ-মাতৃহারা হজরত হাজেরা ছিলেন সতীসাধ্বী। তিনি সব সময় আলাহর ইবাদতে মগ্ন থাকতেন এবং সবার ওপর আলাহর ইচ্ছাকে মর্যাদা দিতেন। এদিকে হাজেরাকে পেয়ে হজরত সারাও খুব খুশি। তিনি নিঃসন্তান হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর সঙ্গে হজরত হাজেরার বিয়ে দিলেন। হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর ৮৬ বছর বয়সে হজরত হাজেরার গর্ভে  হল হজরত ইসমাঈলের। হজরত সারা মর্মাহত হলেন। তিনি হজরত হাজেরাকে আর সহ্য করতে পারছিলেন না। সাধুকের ঘরে পুত্র সন্তানের জন্ম হলে এতিম হজরত হাজেরা (র.)-এর ওপর যেভাবে নির্যাতন নেমে এসেছিল তেমন এক অসহনীয় পরিবেশ তৈরি হল হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর পরিবারে। তখন আলাহর নির্দেশ এলো হজরত হাজেরাকে নির্বাসিত করার। হজরত ইবরাহিম (আ.) বিনাবাক্যে আলাহতায়ালার সব নির্দেশ পালন করতেন। হজরত হাজেরাও তাঁর অনুসারী ছিলেন। তিনিও আলাহর নির্দেশ বিনাবাক্যে মেনে নিতেন। হজরত ইবরাহিম (আ.) তাঁকে বললেন, আলাহর হুকুম হয়েছে তাঁর নির্দেশিত স্থানে তোমাকে ইসমাঈলসহ নির্বাসন দিতে।

হজরত হাজেরা (আ.)কে সাফা ও মারওয়ার নিুবর্তী উপত্যকায় নিয়ে গেলেন হজরত ইবরাহিম (আ.)। নির্জন এ উপত্যকায় কোন পশু-পাখিও ছিল না। গাছপালাও নেই। হজরত হাজেরা (র.) হাসিমুখে এ নির্বাসন মেনে নিলেন। কিছু খাবার ও পানি দিয়ে হজরত ইবরাহিম (আ.) হজরত সারার কাছে চলে গেলেন।

এদিকে কঠিন পরীা শুরু হল হজরত হাজেরার। কয়েক দিন যেতে না যেতেই খাবার শেষ, এক ফোঁটা পানিও নেই। এখন কি করবেন তিনি। মনে মনে আলাহর ওপর ভরসা করে এক ফোঁটা পানির জন্য সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে দৌড়াদৌড়ি করতে লাগলেন। এক ফোঁটা পানি পেলেও শিশুপুত্র ইসমাঈলকে বাঁচানো যাবে। সন্তানের জন্য তিনি প্রাণ দিতেও প্রস্তুত। আলাহতায়ালার পরিকল্পনা তো ব্যাপক। তিনি হজরত ইবরাহিম (আ.) হজরত হাজেরা ও হজরত ইসমাঈল (আ-এর মাধ্যমে নূহ (আ.)-এর পাবনে ধ্বংসপ্রাপ্ত কাবাঘর পুনঃনির্মাণ করতে চেয়েছিলেন। তাই এই নির্বাসন প্রক্রিয়া। হজরত হাজেরা অবশেষে ক্লান্ত–পরিশ্রান্ত- হয়ে সন্তানের কাছে এসে দেখেন সন্তানের পদাঘাতে নিচ থেকে সুমিষ্ট পানির ফোয়ারা বেরিয়ে আসছে তীব্রবেগে। তিনি সঙ্গে সঙ্গে আলাহর কাছে শুকরিয়া জানিয়ে সেই ফোয়ারার চতুর্দিকে পাথরের বাঁধ দিয়ে ফোয়ারাকে বললেন থামো, থামো। এই ‘থামো থামো’ মানে জমজম, এই নির্জন মরুভূমিতে কিভাবে তাঁর নিঃসঙ্গ জীবন কেটেছে তা আলাহই ভালো জানেন। অসহায় এক শিশুকে নিয়ে নির্জন মরুভূমিতে একাকী জীবনযাপন কি কল্পনা করা যায়। কিন্তু হজরত হাজেরা যেই শুনেছেন এটি আলাহর ইচ্ছায় হচ্ছে তিনি তখনই আলহামদুলিলাহ বলে খুশি মনে তা মেনে নিয়েছেন। শিশুপুত্রের জীবন রার্থে তিনি সাফা মারওয়ায় সাতবার দৌড়াদৌড়ি করেছেন। আলাহতায়ালা তা স্মরণীয় করে রাখার জন্য হজের সময় হাজীদেরও সাতবার দৌড়াদৌড়ি করার নির্দেশ দিয়েছেন। এরপর পরমসহিষ্ণুতার মাধ্যমে তিনি জমজমের চতুর্দিকে গাছপালা লাগালেন। হজরত ইসমাঈল (আ.)-এর বয়স যখন ১১ বছর তখন হজরত ইবরাহিম (আ.) স্বপ্নে কোরবানির আদেশ পেলেন, তিনি পশু কোরবানি দিলেন, আবারও স্বপ্ন দেখলেন, এবারও পশু কোরবানি দিলেন, না, আবারও স্বপ্নে দেখলেন। এবার আলাহ যেন হজরত হাজেরা ও হজরত ইসমাঈলের পরীা নিতে চান, এবার দেখলেন সবচেয়ে প্রিয়বস্তুকে কোরবানি দিতে। সকালে সবাইকে বললেন, সবাই সানন্দে রাজি হয়ে গেলেন, তারা তিনজনই একত্রে আলাহর কাছে আÍসমর্পণ করলেন। এরপর কোরবানির উদ্দেশ্যে মিনায় রওনা দিলেন, এতে শয়তান বিচলিত হল, সে প্রথমে হাজেরাকে বোঝাতে চেষ্টা করল। তিনি শয়তানকে ভর্ৎসনা করে বিদায় করলেন, সে এবার হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর পিছু নিলো। জামরাতুল আকাবায় তিনি শয়তানের প্রতি কংকর ছুড়ে তাকে তাড়িয়ে দিলেন। জামরাতুল ওসতায় আবার তার দেখা হলে তিনি সাতটি কংকর ছুড়ে মেরে তাকে তাড়িয়ে দেন। একটু পরে আবার দেখা হলে আবারও সাতটি কংকর ছুড়ে তাকে সম্পূর্ণ পরাভূত করে পুত্রকে যথাস্থানে নিয়ে কাত করে শোয়ালেন। তখনই ওহি নাজিল হল : হে ইবরাহিম তুমি তো সত্যি সত্যিই স্বপ্নাদেশ পালন করলে, এভাবে আমি নেককার বান্দাদের প্রতিদান দিয়ে থাকি।

এরপর আলাহ সেখানে একটি দুম্বা পাঠালে তিনি সেটা কোরবানি দেন। এই অভূতপূর্ব ঘটনাকে চিরস্মরণীয় করে রাখার জন্য আলাহ আমাদের জন্য হজ ও কোরবানি ফরজ করে দেন। অসম্ভব কষ্টসহিষ্ণু, ত্যাগী মহীয়সী নারী হজরত হাজেরা সব ত্যাগ স্বীকারে হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর চির অনুগামী ছিলেন। তাঁর ত্যাগ স্বীকারের মাধ্যমে পৃথিবীর প্রথম গৃহ পবিত্র কাবার চারিপাশে গড়ে উঠে সমৃদ্ধ নগরী।

সূত্র — যুগান্তর
Permission is taken from Source : http://prothom-aloblog.com/users/base/nimpatajorajora/

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: