হাদীস পড়ি জীবন গড়ি পর্ব ২

Permission taken from Source   http://prothom-aloblog.com/users/base/lovelu1977/

জামাত ছাড়লে শয়তান ঘেঁষে

প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জামাতের গুরুত্ব সম্পর্কে বলেছেন :
কোনো গ্রামে বা এলাকায় যদি তিনজন মুসলমানও থাকে, আর তার যদি নামাযের জামাত কায়েম না করে, তবে শয়তান তাদের উপর প্রভাব বিস্তার করে। সুতরাং জামাতে নামায় আদায় করা তোমাদের জন্যে অবশ্য কর্তব্য। কারণ, পাল ত্যাগ করা ভেড়াকে বাঘে খাইয়া ফেলে। (আবু দাউদ : আবু দারদা রাঃ)
ব্যাখ্যাঃ হাদীসের উদাহরণটা খুব চমৎকার। কোনো ভেড়া পাল ত্যাগ করে যদি একা একা বিচ্ছিন্নভাবে চরতে যায়, তখন তাকে যেমন বাঘে খেয়ে ফেলা সহজ, তেমনি জামাত থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া লোককে ধোকা দেয়া শয়তানের পক্ষে খুবই সহজ। অর্থাৎ মুসলমান দলবদ্ধ থাকলে তাদের কাছে শয়তান ঘেষতে ভয় পায়।

নামায পড়ো রীতিমতো

কোন মুসলমান নামায ত্যাগ করতে পারেনা। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
“যে ব্যক্তি নামায ত্যাগ করলো, সে কুফরী করলো।” (তিরমিযী)
ব্যাখ্যাঃ অন্য হাদীসে প্রিয় নবী বলেছেন, নামায ত্যাগ করলে মুসলমান আর কাফিরের মধ্যে পার্থক্য থাকেনা। সুতরাং মুসলমান কোনো অবস্থাতেই এক ওয়াক্ত নামাযও ত্যাগ করবেনা। হাতে যতো কাজই থাকুক না কেন, যতো অসুবিধাই থাকুক না কেন, সময় মতো নামায পড়ে নিতে হবে। কারণ, নামায পড়া আল্লাহর হুকুম।

নামায পড়লে ক্ষমা পাবে

আমাদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাযের সুফল সম্পর্কে বলেছেনঃ
“আল্লাহ তায়ালা তার বান্দাদের উপর পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরয করেছেন। যে ব্যক্তি এই নামায গুলো আদায় করার জন্যে সুন্দরভাবে ওযু করে, প্রত্যেক ওয়াক্ত নামায সময়মতো পড়ে, ঠিক ঠিক মতো রুকু সিজদা করে আর আল্লাহর ভয়ে বিনীতভাবে নামায আদায় করে, তাকে ক্ষমা করে দেয়া আল্লাহর দায়িত্ব।” (আবু দাউদ)

শিক্ষককে শ্রদ্ধা করো

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
“তোমরা জ্ঞান শিক্ষা করো এবং শিক্ষকদের প্রতি বিনয়ী ও শ্রদ্ধাশীল হও।” (তিবরানী : আবু হুরাইরা)

সমানে সমান

যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে চলে, আল্লাহর হুকুম পালন করে, সে তার প্রতিটি নেক কাজের জন্যেই আল্লাহর কাছে পুরস্কার পাবে। কিন্তু যে অন্যদেরকে আল্লাহর দিকে ডাকে, আল্লাহর পথে চলতে বলে এবং দীনের শিক্ষা দান করে, সে কী পাবে?

প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
“যে ব্যক্তি ভালো কাজে উদ্বুদ্ধ করে, সে ভালো কাজ সম্পাদনকারীর সমতুল্য (পুরস্কার পাবে)।” (তারগীব ও তারহীবঃ আবু হুরাইরা রাঃ)
ব্যাখ্যাঃ যে ব্যক্তি মানুষকে সৎ ও কল্যাণের কাজে উদ্বুদ্ধ করে, পরকালে সে বিরাট লাভবান হবে। কারণ সে নিজের ভালো কাজরে পুরস্কার তো পাবেই, আবার সেই সাথে অন্যদেরকে ভালো কাজে উদ্বুদ্ধ করার পুরস্কারও পাবে। তার পুরস্কার হবে ডাবল।

কুরআন শিখো কুরআন শিখাও

আমরা তো জানি গোটা বিশ্ব জগত সৃষ্টি করেছেন মহান আল্লাহ তায়ালা। আমাদের এবং আমাদের পূর্বপুরুষদের তিনিই সৃষ্টি করছেন। তিনিই সমস্ত জ্ঞানের উৎস। আমরা কিভাবে জীবন যাপন করলে দুনিয়ায় শান্তি পাবো এবং পরকালে মুক্তি পাবো, জান্নাত পাবো, তা কেবল তিনিই জানেন। তিনি দয়া করে কুরআনের মাধ্যমে আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন সঠিক জীবন যাপন করার পথ। তাই কুরআনকে জানা, বুঝা এবং মানা আমাদের সবচাইতে বড় কর্তব্য। এ কর্তব্য যারা পালন করে তাদের চাইতে উত্তম মানুষ আর হয় না।
প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
“তোমাদের মাঝে সবচেয়ে ভালো মানুষ সে, যে নিজে কুরআন শিখে এবং অপরকে শিখায়। (বুখারী : উসমান রাঃ)

এসো কুরআন পথে এসো আলোর পথে
প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
“এই কুরআন আল্লাহর রশি, অনাবিল আলো, নিরাময়কারী ও উপকারী বন্ধু। যে তাকে শক্ত করে ধরবে তাকে সে রক্ষা করবে। যে তাকে মেনে চলবে সে তাকে মুক্তি দেবে। (মুসতাদিরকে হাকিম : ইবনে মাসউদ)

জ্ঞানের পথে পা ফেলো

প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
যে ব্যক্তি জ্ঞান লাভের জন্য কোনো পথ চলে, আল্লাহ তায়ালা তার জন্যে বেহেশতের পথ সহজ করে দেন। (মুসলিম : আবু হুরাইরা রাঃ)
ব্যখ্যা : হাদীসটি থেকে জানা গেলো, জ্ঞান লাভের কাজে বিরাট ফায়দা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যারা পড়ালেখা জানে না, তারা কিভাবে দীন ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করবে?
হ্যা, যারা পড়ালেখা জানে, তাদের জন্যে জ্ঞানার্জন করা তো খুবই সহজ। আর যারা পড়ালেখা না শিখেই বড় হয়েছে, তারাও জ্ঞানার্জন করতে পারে।
নবীর সাথীরা সবাই পড়ালেখা জানতেননা। এমনকি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও পড়ালেখা জানতেননা। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অহীর মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করেছেন। আর তার সাহাবীরা তার থেকে শুনে শুনে জ্ঞানার্জন করেছেন। পড়েও জ্ঞানার্জন করা যায়। শুনেও জ্ঞানার্জন করা যায়। সাহাবীগণ শুনেই জ্ঞানার্জন করেছেন।
প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
“(দীনের) জ্ঞানার্জন করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্যে ফরজ”।
সাহাবীগন শুনে শুনেই এ ফরয আদায় করেছেন। বর্তমানেও যারা পড়ালেখা জানেননা, তাদেরকে শুনে শুনেই দীন ইসলামের জ্ঞানার্জন করতে হবে। যারা দীন সম্পর্কে নির্ভুল জ্ঞান রাখেন, তাদের থেকেই দীন সম্পর্কে শুনতে হবে।
আরেকটি হাদীসে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
“যে জ্ঞান লাভের জন্যে চেষ্টা করে, তার এ কাজের দ্বারা তার অতীতের অপরাধসমূহ মাফ হয়ে যায়”।
সুতরাং এতোদিন জ্ঞানার্জনের কথা চিন্তা না করে থাকলেও এখন থেকে শিশু কিশোর, শিক্ষিত অশিক্ষিত, পুরুষ নারী সকলকেই দীন ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞানলাভের চেষ্টা করা একান্ত দরকার। যারা আমল করার নিয়তে দীন ইসলাম সম্পর্কে ইলম হাসিল করার চেষ্টা করবে, আল্লাহ তায়ালা এই নেক নিয়তের কারণে তাদের অতীত অবহেলার অপরাধ ক্ষমা করে দেবেন।

পরকালের জন্যে কাজ করাই বুদ্ধিমানের কাজ

আমাদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
আসল বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি, যে নিজের অবস্থা সম্পর্কে চিন্তা করলো এবং মরণের পরের জন্য আমল করলো। আর বোকা দুর্বল সেই ব্যক্তি, যে নিজের নফসকে কামনা বাসনার অনুসারী করে দিয়েছে, অথচ আল্লাহ তাকে বেহেশত নিয়ে যাবে বলে মিথ্যা আশা করে বসে আছে। (তিরমিযী : শাদ্দাদ ইবন আউস রাঃ)

প্রকৃত মুমিন

সত্যিকার ঈমানদান কিভাবে হওয়া যায়, হাদীসে আমাদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই কথাও জানিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন :
ঐ ব্যক্তির ঈমানদের স্বাধ পেয়েছে (অর্থাৎ সত্যিকার ঈমানদার হয়েছে), যে ব্যক্তি সন্তুষ্টির সাথে আল্লাহকে রব মেনে নিয়েছে। ইসলামকে দীন মেনে নিয়েছে। আর মুহাম্মদকে রসূল মেনে নিয়েছে। (মুসলিমঃ আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব।)
ব্যাখ্যাঃ হাদীসটিতে বলা হয়েছে, প্রকৃত মুমিন হতে হলে মনের সন্তুষ্টির সাথে তিনটি কথা স্বীকার করতে হবে। সেগুলো হলোঃ
১. আল্লাহকে রব হিসেবে স্বীকার করতে হবে।
২. ইসলামকে দ্বীন বা জীবন চলার পথ হিসেবে মেনে নিতে হবে এবং
৩. মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রসুল মেনে নিতে হবে।

ইচ্ছা বাসনার দীনের অধীন করো

হযরত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
তোমাদের চিন্তা ভাবনা, কামনা বাসনা ও মতামত আমার নিয়ে আসা দীন ও শরীয়ত অনুযায়ী না হওয়া পর্যন্ত তোমাদের কেউ মুমিন হতে পারবে না। (মিশকাতঃ আবদুল্লাহ ইবন আমর রাঃ)
ব্যাখ্যাঃ হাদীসটির বক্তব্য হলো, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিয়ে আসা দীন ইসলাম অনুযায়ী নিজের চিন্তা ও জীবনকে গঠন করলেই প্রকৃত মুমিন হওয়া যাবে। তবে ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন না করলে ইসলাম অনুযায়ী চিন্তা ও জীবন গঠন করা যায়না। কারণ কোনো জিনিস সম্পর্কে জ্ঞান না থাকলে, সে জিনিসের আকাংখা করা এবং সে অনুযায়ী নিজের জীবন গড়া কেমন করে সম্ভব?

মৃত্যুর আগে জীবনকে কাজে লাগাও

নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
পাঁচটি খারাপ সময় আসার আগে পাঁচটি ভালো সময়কে কাজে লাগাও :
১. বুড়ো হবার আগে যৌবনের শক্তিকে,
২. অসুখ হবার আগে সুস্থ থাকার সময়কে,
৩. অভাব অনটন আসার আগে সচ্ছলতাকে,
৪. ব্যস্ত হয়ে পড়ার আগে অবসর সময়কে এবং
৫. মরণ আসার আগে জীবিত থাকার সময়কে। (তিরমিযী : আমর ইবনে মাইমুন রাঃ)
ব্যাখ্যাঃ অনেক মানুষ কেবল এই দুনিয়ার অর্থ সম্পদ এবং মান মর্যাদা লাভ করবার ও ভোগ করবার চিন্তায় ব্যস্ত থাকে। পরকালের মুক্তির জন্য কি আমল করলো আর মরণের পরে কি অবস্থার সম্মুখীন হতে হবে, সে বিষয়ে কোনো চিন্তা ভাবনা করেনা। আসলে দুনিয়ার জীবনটা একটা সুযোগ। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে পরকালের মুক্তির ব্যবস্থা করা সকলেরই কর্তব্য।

দুনিয়ার জীবন সম্পর্কে পরকালে প্রশ্ন করা হবে

মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
১. কিয়ামতের দিন পাঁচটি প্রশ্ন জিজ্ঞিসা করার আগে বনী আদমের পা এক কদমও নড়তে পারবেনা। সেগুলো হলোঃ
১. সে নিজের জীবনটা কোন্‌ পথে কাটিয়েছে?
২. যৌবনের শক্তি কোন্‌ কাজে লাগিয়েছে?
৩. ধন সম্পদ কোন পথে উপার্জন করেছে?
৪. কোন পথে ধন সম্পদ ব্যয় করেছে?
৫.দীন ইসলাম সম্পর্কে যতোটুকু জানতো, সে অনুযায়ী কতটুকু আমল করেছে। {তিরমিযী : ইবনে মাসউদ রাঃ}
ব্যাখ্যা : এই হাদীসে আমাদের প্রিয় নবী আমাদেরকে একথাই বুঝাতে চেয়েছেন যে, আমাদের জীবনের একটি মুহূর্তও অকারণে নষ্ট করা যাবেনা। অন্যায় পথে একটি পয়সাও খরচ করা যাবেনা। আল্লাহর মর্জির খেলাফ কাজে একটি পয়সাও খরচ করা যাবেনা। আর দীন ইসলাম সম্পর্কে জানতে হবে এবং সেই অনুযায়ী চলতে হবে। কারণ, আল্লাহর কাছে একদিন এগুলোর হিসাব দিতে হবে। আমাদের প্রত্যেককেই মরতে হবে এবং আল্লাহর কাছে হাযির হতে হবে। তাই সেদিনকার মুক্তির ব্যবস্থা পৃথিবী থেকেই করে যেতে হবে।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: