হাদীস পড়ি জীবন গড়ি পর্ব ১

Permission taken from Source   http://prothom-aloblog.com/users/base/lovelu1977/

হাদীস কোথায় পাবো?

এখন যদি প্রশ্ন করা হয়, আল্লাহর কিতাব কুরআন তো আমাদের ঘরে ঘরে আছে। কিন্তু নবীর হাদীস কোথায় পাবো? জবাব কিন্তু সোজা। আল্লাহর কিতাবের মতো নবীর হাদীসও কিন্তু আমরা ঘরে ঘরে রাখতে পারি। সেই ব্যবস্থা আমাদের দেশে আছে। কথাটি বুঝিয়ে বলছি।
নবীর সাহবীগণ নবীর কাছ থেকে তার হাদীস জেনে ও শিখে নিয়েছিলেন। সাহাবীদের কাছ থেকে তাদের পরবর্তী লোকেরা হাদীস জেনে ও শিখে নেন। অতঃপর তাদের থেকে তাদের পরবর্তী লোকেরা হাদীস জেনে ও শিখে নেন। এভাবে এক দেড়শ বছর চলতে থাকে।
এ সময় কিছু লোক হাদীস লিখেও রাখতেন, আবার কিছু লোক মুখস্থও করে রাখতেন।
এরপর খলীফা উমর ইবনে আবদুল আযীয হাদীসের শিক্ষকগণকে নির্দেশ দেন, যেখানে যার যে হাদীস জানা আছে, তা সব যেনো সংগ্রহ করে লিখে ফেলা হয়। ইসলামের বিজয়ের সাথে সাথে সাহাবীগণ ছড়িয়ে পড়েছিলেন দেশে দেশে। সেই সাথে নবীর হাদীসও ছড়িয়ে পড়ে দেশে দেশে। তাই হাদীসের ছাত্র ও শিক্ষকগণ হাদীস সংগ্রহের জন্যে ছুটে বেড়ান দেশ থেকে দেশান্তরে। এভাবে তারা সীমাহীন কষ্ট স্বীকার করে বিশ্বময় ছড়িয়ে থাকা নবীর সমস্ত হাদীস সংগ্রহ করে ফেলেন। যিনি যেখানে যে হাদীস পেয়েছেন, তিনি তা সংগ্রহ ও সংকলন করে ফেলেন।
এভাবেই সংকলিত হয়ে যায় নবীর হাদীসের বিরাট বিরাট গ্রন্থ। তাদের সংকলন করা হাদীসের গ্রন্থগুলো আমাদের কাছে এখন ছাপা হয়ে মওজুদ রয়েছে। কয়েকজন বড় বড় হাদীসের উস্তাদ এবং তাদের সংগ্রহ ও সংকলন করা হাদীস গ্রন্থগুলোর নাম বলে দিচ্ছি :
১. মালিক ইবনে আনাস (৯৩-১৬১)। তার সংকলিত গ্রন্থের নাম ‘মুয়াত্তা’ বা ‘মুয়াত্তায়ে ইমাম মালিক।’
২. আহমদ ইবনে হাম্বল (১৬৪-২৪১) হিজরী)। গ্রন্থ: মুসনাদে আহমদ।
৩. মুহাম্মদ ইবনে ইসমাঈল আল বুখারী (১৯৪-২৫৬ হিজরী)। গ্রন্থ: ‘আল জামেউস সহীহ’। সহীহ বুখারী নামে সুপরিচিত।
৪. মুসলিম ইবনে হাজ্জাজ নিশাপুরি (২০২-২৬১ হিজরী)। গ্রন্থ: সহী মুসলিম।
৫. আবু দাউদ আশআস ইবনে সুলাইমান (২০২-২৭৫ হিজরী) । গ্রন্থ: সুনানে আবু দাউদ।
৬. আবু ঈসা তিরমিযী (২০৯-২৭৯ হিজরী)। গ্রন্থ: সুনামে তিরমিযী।
৭. আহমদ ইবনে শুয়াইব নাসায়ী (মৃত্যু-৩০৩ হিজরী)। গ্রন্থ: সুনানে নাসায়ী।
৮. মুহাম্মদ ইবনে ইয়াযীদ ইবনে মাজাহ (মৃত্যু ২৭৩ হিজরী)। গ্রন্থ: সুনানে ইবনে মাজাহ।
এই বিখ্যাত আটজন মুহাদ্দিসের সংকলিত এই আটখানা হাদীস গ্রন্থ সবচাইতে বেশী খ্যাতি অর্জন করেছে। শেষের ছয়খানা গ্রন্থ ‘সিহাহ সিত্তা বা বিশুদ্ধ ছয়গ্রন্থ’ নামে পরিচিত।
এই আটখানা এবং এ রকম অন্যান্য বড় বড় গ্রন্থ থেকে বিষয় ভিত্তিক হাদীস বাছাই করে আবার অনেকগুলো গ্রন্থ সংকলিত হয়েছে। এগুলো হলো বাছাই করা সংকলন। এগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলোঃ
১. মিশকাতুল মাসাবীহ। সংকলন করেছেন অলীউদ্দীন আল খতীব।
২. বুলূগুল মারাম। সংকলন করেছেন বিখ্যাত মুহাদ্দিস হাফেযে হাদীস এবং সহীহ্‌ বুখারীর ব্যাখ্যাতা ইবনে হাজর আসকালানী।
৩. রিয়াদুস সালেহীন। সংকলন করেছেন সহীহ মুসলিমের ব্যাখ্যাতা ইয়াহিয়া ইবনে শরফ নববী ।
৪. মুনতাকিল আখবার। সংকলন করেছেন আবদুস সালাম ইবনে তাইমিয়া। ইনি ইমাম ইবনে তাইমিয়ার দাদা।
এগুলো ছাড়াও আরো অনেকগুলো সংকলন রয়েছে। বাংলা ভাষায়ও বেশ কিছু সংকলন তৈরী হয়েছে, অনুবাদ হয়েছে ও প্রকাশ হযেছে। সুতরাং হাদীস কোথায় পাবো? সে প্রশ্নের জবাবও আমরা পেয়ে গেলাম।

এই আটখানা গ্রন্থের প্রায়গুলোই বাংলায় প্রকাশ হয়েছে। বাকীগুলোও হওয়ার পথে।

হাদীস কেন পড়বো?

ইসলাম আল্লাহর দেয়া জীবন ব্যবস্থা। মানুষ যেনো তাঁর পছন্দনীয় পন্থায় জীবন যাপন করতে পারে, সে জন্যে আল্লাহ তায়ালা দয়া করে মানুষকে সে পথ ও পন্থার কথা জানিয়ে দিয়েছেন। কোন পথে চললে তিনি খুশী হবেন, তা তিনি জানিয়ে দিয়েছেন। কোন্‌ পথে চললে তিনি নারাজ হবেন, তাও বাতলে দিয়েছেন। জীবন যাপনের সঠিক নিয়ম কানুন বলে দিয়েছেন। এভাবে তিনি মানুষকে তার মুক্তির পথ দেখিয়ে দিয়েছেন। সফলতা লাভের উপায় বলে দিয়েছেন্‌ আর এই যে মুক্তির পথ আল সফলতা লাভের উপায়, তারই নাম হলো ‘ইসলাম’।
সুতরাং মানুষ যদি আল্লাহর পছন্দনীয় পথে চলতে চায়, তবে তাকে অবশ্যি জানতে হবে, আল্লাহর পছন্দনীয় পথ কোনটি? তাকে অবশ্যি জানতে হবে, তার মুক্তির পথ কোনটি? তার সফলতা অর্জনের উপায় কি? অর্থাৎ তাকে আল্লাহর দেয়া জীবন ব্যবস্থা ইসলাম সম্পর্কে জানতে হবে। কিন্তু , ইসলাম সম্পর্কে জানার উপায় কি?
শেষ যামানার মানুষ যেনো ইসলাম সম্পর্কে জানতে পারে, আল্লাহর পছন্দীয় পথের সন্ধান পেতে পারে, সে জন্য আল্লাহ তায়ালা আরব দেশের একজন অত্যন্তভালো মানুষকে তার বানীবাহক নিযুক্ত করেন । তার নাম মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আল্লাহ তার কাছে মানুষেরর জন্যে তার পছন্দনীয় জীবন ব্যবস্থা ইসলাম অবতীর্ণ করেন। তার কাছে একখানা কিতাব নাযিল করেন। এ কিতাবের নাম আল কুরআন। এ কিতাবের সমস্ত অর্থ ও মর্ম তিনি তাকে বুঝিয়ে দিয়েছেন। এ জন্য কুরআন ছাড়াও তিনি আরেক ধরনের বাণী তার উপর অবতীর্ণ করেছেন। মানুষ কিভাবে আল কুলআন অনুযায়ী জীবন যাপন করবে, তা বুঝিয়ে দেবার দায়িত্বও তিনি তার উপর অর্পণ করেছেন।
মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে গেছেন্‌ তিনি সঠিকভাবে আল্লাহর কিতাব মানুষকে বুঝিয়ে দিয়ে গেছেন। তিনি তা বুঝিয়ে দিয়েছেনঃ
১. তার বাণী, বক্তব্য ও কথার মাধ্যমে,
২. তার কাজকর্ম এবং চরিত্র ও আমলের মাধ্যমে,
৩. অন্যদের কথা ও কাজকে সমর্থন করা এবং অনুমতিদানের মাধ্যমে।
নবী হিসেব তার এই তিন প্রকারের সমস্ত কাজকেই হাদীস নলা হয়। এই তিন ধরনের কাজকে তিন ধরনের হাদীস বলা হয়ঃ
১. তিনি তার বাণী, বক্তব্য ও কথার মাধ্যমে মানুষকে যা কিছু বলে গেছেন ও বুঝিয়ে দিয়েছেন, তার নাম হলো, বক্তব্যগত হাদীস।
২. তিনি তার কর্ম, চরিত্র ও আমারৈর মাধ্যমে যা কিছু বুঝিয়ে দিয়েছেন তার নাম কর্মগত হাদীস।
৩. তিনি যা কিছুর সমর্থন ও অনুমোদন দিয়ে গেছেন, তার নাম হলো, সমর্থনগত বা অনুমোদনগত হাদীস।
তাহলে আমরা এখন বুঝতে পারলাম, আল্লাহর পছন্দনীয় পথ কোনটি? তার অপছন্দনীয় পথই বা কোনটি? আর কিভাবেই বা তার পছন্দনীয় পথে চলতে হবে? এসব কথা ও নিয়ম কানুন আল্লাহর তায়ালা তার নবীকে জানিয়ে দিয়েছেন। আর আল্লাহ তায়ালার পাঠানো এসব বানী, বক্তব্য ও নিয়ম কানুনের সমষ্টির নাম হলো ইসলাম।
আমরা একথাও জানতে পারলাম, আল্লাহ তায়ালা যে তার নবীর মাধ্যমে আমাদের জন্যে তার পছন্দনীয় জীবন যাপনের পথ ইসলাম পাঠিয়েছেন, সে ইসলামকে আমরা দু’টি মাধ্যমে জানতে পারিঃ
একঃ নবীর প্রতি আল্লাহর অবতীর্ণ কিতাব আল কুরআন এর মাধ্যমে। দুইঃ নবীর বাণী, কাজ ও অনুমোদনসমূহের মাধ্যমে। অর্থাৎ নবীর হাদীসের মাধ্যমে।
এখানে আরেকটি কথা বলে নিই। কথাটা হলো, আমাদের প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কথা, কাজ ও অনমোদনের মাধ্যমে অর্থাৎ হাদীসের মাধ্যমে আমাদেরকে ইসলাম পালন করার যেসব নিয়ম কানুন, বিধি বিধান, আচার আচরণ ও রীতিপদ্ধতি জানিয়ে ও শিখিয়ে দিয়ে গেছেন, তার নাম হলো, সুন্নতে রসূল বা রসূলের সুন্নাহ।
এখন এ আলোচনা থেকে আমাদের কাছে একটি কথা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে গেলো। তাহলো, যারা আল্লাহর পছন্দনীয় জীবন যাপনের পথ ইসলামকে জানতে চায় এবং ইসলাম অনুযায়ী জীবন যাপন করতে চায়, তাদেরকে অবশ্যি :
১. আল্লাহর কিতাব আল কুরআন পড়তে হবে, বুঝতে হবে এবং তা মেনে চলতে হবে।
২. নবীর হাদীস ও সুন্নাহকে পড়তে হবে, বুঝতে হবে এবং সে অনুযায়ী জীবন যাপন করত হবে।
তাহলে হাদীস কেন পড়বো? এ প্রশ্নটির জবাব এখন সুন্দরভাবে আমাদের জানা হয়ে গেলো!

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: