হাদীসে কুদ্সী বা রাসূলুল্লাহ (সা) এর জবানে আল্লাহর বাণী

Permission taken from Source   http://prothom-aloblog.com/users/base/samimsikder/

হাদীসে কুদ্সী বা রাসূলুল্লাহ (সা) এর জবানে আল্লাহর বাণী
সকল প্রশংসা বিশ্ব পালনকর্তা আল্লাহর জন্য সমর্পিত। উৎপীড়ক ও সীমালংঘনকারীগণ ছাড়া আর কেউ আল্লাহর ক্রোধানলে নিপতিত হয় না। সাইয়্যেদুল মোরসালীন ও ইমামুল মোত্তাক্বীন হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সা) এর প্রতি সালাম জ্ঞাপন করছি। আরো জ্ঞাপন করছি, তাঁর পরিবারবর্গ ও সাহাবায়ে কেরামের প্রতি।
হাদীসে কুদ্সী কি?
ইসলামী শরীয়তের চার উৎস মূলের অন্যতম হচ্ছে, ‘আল হাদীস’ পবিত্র আল কুরআনের পরেই যার স্খান। হাদীস হচ্ছে – প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সা)- এর মুখনি:সৃত নিজস্ব বাণী ও কর্ম এবং রাসূল (সা) কর্তৃক সাহাবায়ে কেরাম(রা) গনের বক্তব্য ও কর্মের অনুমোদন।
রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কথা, কাজ ও অনুমোদনের বিপরিত নয়, সাহাবায়ে কেরামের এমন সব কথা, কাজ ও অনুমোদন হাদীসের মধ্যে গণ্য।
হাদীসসমূহের মধ্যে এমন কতগুলো হাদীস রয়েছে যেগুলো আল্লাহর নবী (সা) নিজ জবানে বর্ণনা করলেও তা মহান আল্লাহ তায়া’লার নামে বিবৃত হয়েছে। যেমন – ‘আল্লাহ তায়া’লা বলেছেন’ কিংবা ‘মহান আল্লাহ তায়া’লা বলেন’ এভাবে উল্লেখ হয়েছে। হাদীস শাস্ত্র বিশারদ – মুহাদ্দিসদের কাছে এগুলো ‘হাদীসে কুদসী’ নামে পরিচিত।
কুদ্স শব্দের অর্থ হচ্ছে – পবিত্র (দোষ-ক্রটি থেকে)। যা আল্লাহ তায়া’লার গুনবাচক নামসমূহের একটি নাম। যেহেতু এ হাদীসগুলো সরাসরি আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত তাই এগুলোকে ‘হাদীসে কুদ্সী’ নামে নামকরণ করা হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ (সা) যখন এ হাদীসগুলো ব্যক্ত করতেন, তখন তা সরাসরি আল্লাহর পক্ষ থেকে বর্ণনা করতেন। যেমন – আল্লাহ তায়া’লা বলেছেন বা বলেন, আবার কখনও বা বলতেন, ‘জিবরাঈ’ল(আ)কে আল্লাহ তায়া’লা বলেছেন, কিংবা ‘জিবরাঈ’ল (আ) আমাকে বলেছেন।
মোট কথা যেসব হাদীসের মর্ম রাসূলুল্লাহ (সা) আল্লাহর পক্ষ থেকে ‘ইলহাম’ কিংবা জিবরাঈ’ল (আ) এর মাধ্যমে জ্ঞাত হয়ে নিজ ভাষায় প্রকাশ করেছেন, তাই ‘হাদীসে কুদ্সী’ হিসেবে সুপরিচিত।
প্রাথমিক যুগের মুহাদ্দিসগণের মতে – ‘হাদীসে কুদসী’র সংখ্যা একশ’য়ের কিছু বেশি। কিন্তু পরবর্তী কালের মুহাদ্দিসগণ প্রায় সহসন্স হাদীসকে ‘হাদীসে কুদসী’ হিসাবে গণ্য করেছেন।
উপমহাদেশের অন্যতম শেন্সষ্ঠ মুহাদ্দিস হযরতুল আ’ল্লামা মুহাম্মদ মাদানী (রহ)- এর বিখ্যাত ‘হাদীসে কুদসী ’ সংকলন গ্রন্থ ‘আল ইতফা-ফা-তুস্ সুন্নিয়্যাতু ফিল আহা-দীসিল কুদসিয়্যাহ’ থেকে সুনির্বাচিত প্রায় তিনশত ‘হাদীসে কুদসী’ এর বঙ্গানুবাদসহ বিষয় ভিত্তিক রূপে উপস্খাপন করা হল।

১০) রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন- “মহান আল্লাহ আমার প্রতি এমন কতগুলো প্রত্যাদেশ করেছেন যা আমার কানে প্রবেশ করেছে এবং আমার হৃদয়ে বসে গেছে। আমাকে আদেশ দেয়া হয়েছে, আমি যেন তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা না করি যে লোক মুশরিক অবস্খায় প্রাণ ত্যাগ করেছে। আর যে লোক তার অবশিষ্ট সম্পদ অপরকে বিলিয়ে দেয়, তা তার জন্য কল্যানকর। আর যে তা আকড়িয়ে রাখে, তার জন্য তা অনিষ্টকর। আর জীবিকার সমপরিমাণ সম্পদ সঞ্চিত রাখার জন্য আল্লাহ্ কাউকেও অভিসম্পাত করেন না।”
ইবনে জারীর এ হাদিসটি হযরত কাতাদা (রা) থেকে মুরসাল হাদীস হিসাবে বর্ণনা করেছেন।
১১) রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন- সুমহান আল্লাহ বলেছেন, “নিশ্চয়ই তোমার উম্মতগণ সর্বদা (তর্কচ্ছলে) বলতে থাকবে-এটা কিভাবে হল? এটা কিভাবে হল? এমনকি ‘পরিশেষে বলবে, “এ সৃষ্টিকুলকে আল্লাহ্ সৃষ্টি করেছেন; কিন্তু আল্লাহকে সৃষ্টি করেছে কে? ”
ইমাম মুসলিম ও আবূ আওয়ানা এ হাদীসটি হযরত আনাস (রা) থেকে সংগ্রহ করেছেন।
১২) রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন- সুমহান আল্লাহ বলেছেন, “যাদেরকে আমার অংশী সাব্যস্ত করা হয় আমার সাথে তাদের কোন সম্পর্ক নেই। যে লোক আমার সাথে (কোন কিছু বা কাউকে) অংশী সাব্যস্ত করে কোন আমল করে, তাকে আমি পরিত্যাগ করি এবং আমার সাথে সে যা শরীক করে আমি তা প্রত্যাখান করি।”
মুসলিম ও ইবনে মাজা এ হাদীসটি হযরত আবূ হুরায়রা (রা) থেকে সংগ্রহ করেছেন।
১৩)রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন- তোমাদের প্রভূ বলেছেন, “যে লোক আমার সৃষ্টির অনুরূপ সৃষ্টি করেছে তার চেয়ে বড় অত্যাচারী আর কে আছে! সামর্থ্য থাকলে তাকে একটি মশা, কিংবা একটি কণা সৃষ্টি করতে বল।”
ইবনুন নাজ্জার এ হাদিসটি হযরত আবূ হুরায়রা (রা) থেকে সংগ্রহ করেছেন।
১৪) রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন- কেয়ামতের দিন জাহান্নামিদের কোন একজনকে জিজ্ঞেস করা হবে, “তুমি কি মনে কর তোমার কাছে যদি পার্থিব কোন বস্তু থাকত তবে তুমি মুক্তির বিনিময়ে তা দান করতে?” তখন সে বলবে “হ্যাঁ”। অনন্তর আল্লাহ্ বলবেন, “তোমার কাছে আমি এর চেয়েও নগণ্য বস্তু চেয়েছিলাম। আদমের পিঠে থাকাকালে তোমার কাছে চেয়েছিলাম, তুমি আমার সাথে কোন কিছু অংশী সাব্যস্ত করবে না। তখন তুমি অংশী স্খির না করার অংগীকার করেছিলে।”
আহমদ ও শায়খাইন, আবূ আওয়ানা ও ইবনে হাব্বান হযরত আব্বাস (রা) থেকে এ হাদীসটি সংগ্রহ করেছেন।
১৫)রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন- সুমহান আল্লাহ্ বলেন, “হে আদম সন্তান! একটি তোমার জন্য, আরেকটি আমার জন্য এবং আরেকটি আমার ও তোমার জন্য। অনন্তর আমার জন্য যা রয়েছে তা এই যে, তুমি আমার উপাসনা করবে, আমার সাথে কোন কিছু অংশী স্খির করবে না। আর যা তোমার জন্য তা এই যে, তুমি কিছু বা কোন আমল করলে তোমাকে তার পূরো প্রতিদান দেব। আর যা কিছু আমার ও তোমার জন্য তা এই যে, তুমি প্রার্থনা করবে আর আমি তা মঞ্জুর করবে।”
নাসায়ী এ হাদীসটি হযরত আনাস (রা) থেকে সংগ্রহ করেছেন। তবে তিনি একে দূর্বল হাদীস বলে উল্লেখ করেছেন।
শিরক না করার পুরস্কার:
১৬) রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন- সুমহান আল্লাহ বলেছেন, “হে আদম সন্তান! যতক্ষন পর্যন্ত তুমি আমাকে ডাকতে থাক এবং আমার আশা পোষণ করতে থাক সে পর্যন্ত আমি তোমাকে মার্জনা করতে থাকি, তোমার যত পাপই হোক না কেন। আর আমি কোন ভয় করি না। হে আদম সন্তান! যদি তোমার পাপরাশি আসমান পর্যন্তও পৌছে, তারপর তুমি আমার কাছে মাফ চাও, আমি তোমাকে মাফ করে দিই এবং আমি কাউকে গ্রাহ্য করি না।”
“হে আদম সন্তান! যদি তুমি আমার কাছে পৃথিবী পরিমাণ পাপ নিয়ে আস আর আমার কোন অংশী স্খির না করে আমার সাথে সাক্ষাত কর, নিশ্চয়ই আমি সে পরিমাণ ক্ষমা নিয়ে তোমার কাছে আসব।”
তিরমিযী, তিবরানী ও বায়হাকী এ হাদীসটি হযরত আবূ যর (রা) থেকে সংগ্রহ করেছেন।
১৭) রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন- মহান মর্যাদাশালী আল্লাহ বলেছেন, “হে আদম সন্তান! যে পর্যন্ত তুমি আমার উপাসনা কর এবং আমার কাছে কামনা কর, আর আমার সাথে কোন শরীক না কর, সে পর্যন্ত আমি তোমার সকল পাপ মার্জনা করে দেই। আর তুমি যদি আকাশসমূহ ভরা অপরাধ ও পাপ নিয়ে আমার দিকে এগুতে থাক, আমিও অনুরূপ ক্ষমা নিয়ে তোমার দিকে এগিয়ে আসি এবং তোমাকে ক্ষমা করে দেই। আর আমি সকল পরিণামের ঊর্দ্ধে।”
শীরাযী এ হাদীসটি হযরত আবুদ্ দারদা (রা) থেকে সংগ্রহ করেছেন।
১৮) রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন- মহান ও পরাক্রান্ত আল্লাহ্ বলেন, “যে লোক কোন ভাল কাজ করে তার জন্য ওর দশগুন এবং তার চেয়েও বেশি পুরস্কার রয়েছে। আর যে লোক কোন খারাপ কাজ করে, এর প্রতিদান ওর সমপরিমান কিংবা আমি তা ক্ষমা করে দেই। আর যে লোক আমার সাথে কোন কিছু শরীক না করে পৃথিবী সমান পাপ করে তারপর আমার সাথে সাক্ষাত করে, আমি তাকে ওর সমপরিমাণ মার্জনা করে থাকি। আর আমার দিকে এক হাত অগ্রসর হয়, আমি তার দিকে দু’হাত অগ্রসর হই। যে লোক আমার দিকে হেটে অগ্রসর হয়, আমি দন্সুত পায়ে তার দিকে অগ্রসর হই।”
আহমদ, মুসলিম, ইবনে মাজা ও আবূ আওয়ানা এ হাদীসটি হযরত আবূ যর (রা) থেকে সংগ্রহ করেছেন।
১৯) রাসূলুল্লাহ (সা বলেছেন- মহান মর্যাদাশীল আল্লাহ্ বলেছেন, “যে লোক জানে যে, আমি যাঁবতীয় গুনাহ মাফের অধিকারী, তাকে আমি মাফ করে দেই। আর আমার সাথে কোন কিছুকে শরীক না করা পর্যন্ত আমি কারো কোন দোষ ধরি না।”
তিবরানী ও হাকেম এ হাদিসটি হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে সংগ্রহ করেছেন।
সময় ও কালকে গালি দেয়াও শিরক:
২০) রাসূলুল্লাহ (সা বলেছেন- মহান মর্যাদাশীল আল্লাহ বলেছেন, “আদম সন্তান কালকে গালি দিয়ে আমাকে কষ্ট দেয়, অথচ আমিই কাল, কর্তৃত্ব আমারই হাতে, আমিই রাত-দিনের পরিবর্তন করি।”
আহমদ, আবূ দাউদ ও শায়খাইন এ হাদীসটি হযরত আবূ হুরায়রা (রা) থেকে সংগ্রহ করেছেন।
২১) রাসূলুল্লাহ (সা বলেছেন- সময়কে গালি দিও না; মহান আল্লাহ বলেছেন, “আমিই সময়। দিন ও রাতকে আমি নতুন রূপ দান করি, আর আমিই শাসকদের উপর আরেক শাসকদেরকে চাপিয়ে থাকি।”
বাহয়াকী এ হাদীসটি হযরত আবূ হুরায়রা (রা) থেকে সংগ্রহ করেছেন।
২২) রাসূলুল্লাহ (সা বলেছেন- মহান আল্লাহ্ বলেন, “আমি আমার বান্দার কাছে ঋণ চেয়েছিলাম, কিন্তু সে আমাকে ঋণ দেয়নি। আর আমার বান্দা আমাকে গালি দিয়েছে, অথচ সে তা জানে না। সে বলে, হায়রে সময়! হায়রে সময়! মূলত আমিই সময়।”
২৩) রাসূলুল্লাহ (সা বলেছেন- নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ বলেন, “আমি তো কোন বিচক্ষণ ব্যক্তির কথাই কবূল করি না; বরং আমি তার উদ্দেশ্য ও বাসনাই কবুল করে থাকি। অত:পর তার ইচ্ছা ও প্রত্যাশা যদি আল্লাহ যা ভালবাসেন ও পছন্দ করেন তাই হয়; তবে তার উদ্দেশ্যকে আমি আমার প্রশংসা ও মর্যাদায় পরিবর্তিত করে দেই, যদিও সে কথা সে নাও বলে থাকে।”
হামযাহা সাহমী এ হাদীসটি হযরত মুহাজির ইবনে হাবীব (রা) থেকে সংগ্রহ করেছেন।
লোক দেখানো আমলের পরিণতি:
২৪) রাসূলুল্লাহ (সা বলেছেন- কেয়ামতের দিন কিছু লোককে বেহেশতের দিকে যাওয়ার জন্য নির্দেশ দেয়া হবে। তারা যখন বেহেশতের কাছাকাছি হবে তখন তারা ওর সুঘ্রাণ পাবে এবং বেহেশতের প্রাসাদগুলো এবং আল্লাহ্ তাতে তার অধিবাসীদের জন্য যা কিছু তৈরী করেছেন, তার দিকে তাকাবে। তখন ডেকে বলা হবে, “তাদেরকে ফিরিয়ে আন, ওতে ওদের কোন অংশ নেই।” তখন তারা হতাশ হয়ে ফিরে আসবে যেমনটি পূর্ববর্তীগণ কখনো ফিরে আসেনি। তারপর তারা বলবে-“হে আমাদের রব, যদি তুমি আমাদেরকে তোমার প্রতিদানের বেহেশতে এবং তাতে তোমার বন্ধুদের জন্য যা তৈরি করে রেখেছ তা দেখানোর আগেই দোযখে প্রবেশ করাতে, তবে আমাদের জন্য সহজ হত।” আল্লাহ বলবেন, “ওরে পাপিষ্টরা, তোদের (শাস্তির) জন্য আমি এই মনস্খ করেছি। তোমরা যখন নিরালায় থাকতে তখন বড় বড় পাপ করে আমার মুকাবিলা করতে, আর যখন লোকদের মধ্যে আসতে তখন তাদের সাথে বিনয়ের সাথে দেখা করতে। মনে মনে তোমরা আমাকে যেরূপ বড় মনে করতে, মানুষদেরকে তার উল্টা দেখাতে। তোমরা মানুষকে ভয় করতে কিন্তু আমাকে আমাকে করতে না, মানুষকে বড় মনে করতে, কিন্তু আমাকে করতে না তোমরা মানুষের জন্য নিজেকে পবিত্র সাজাতে, কিন্তু আমার জন্য সাজাতে না এ জন্য আমি যে আজ তোমাদেরকে বেহেশতে থেকে বঞ্চিত করেছি (তার উদ্দেশ্য ) তা দিয়ে তোমাদেরকে শাস্তি দিব।”
তিবরানী এ হাদীসটি হযরত আদী ইবনে হাতিম (রা) থেকে সংগ্রহ করেছেন।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: