মানবাধিকারঃ ইসলাম পুঁজিবাদ

Permission taken from Source     http://islamicbanglabd.blogspot.com/

ইসলামই মানবতার ধর্ম, হযরত মুহাম্মদ (সা.) মানবতার প্রকৃত বন্ধু, আল কুরআনই মানবতারএকমাত্র মুক্তির সনদ। ইসলাম ও সন্ত্রাস শব্দ দু’টি ভাবার্থের দিক থেকে পারস্পরিক সাংঘর্ষিক। ইসলামে সন্ত্রাসের কোন স্থান তো নেই বরং ইসলামের আবির্ভাবই ঘটেছে সকল প্রকার সন্ত্রাস, রাহাজানি, মারামারি, কাটাকাটি, জুলুম-নির্যাতন এক কথায় যাকে আরবিতে ফিতনা বলা হয় তা সমাজ থেকে সমূলে উচ্ছেদ করার জন্য। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন, “আর তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে যাও যতক্ষণ পর্যন্ত না ফিৎনা সম্পূর্ণভাবে মিটে যায় এবং একমাত্র আল্লাহর দেয়া জীবন ব্যবস্থা অবশিষ্ট থাকে।” (সূরা বাকারাহঃ ১৯৩)

ইসলামে মানবাধিকারঃ পৃথিবীর সমুদয় সম্পদের একচ্ছত্র মালিক মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন। মানুষ এর ট্রাস্টি মাত্র। তাই এ সম্পদে সকলের অধিকার সমভাবে স্বীকৃত। যারা তাঁকে বিশ্বাস করেনা ও স্বীকৃতি দেয়না তাদেরও সমধিকার রয়েছে। হযরত ইবরাহিম (আ.) যখন মানব জাতির নেতৃত্ব সম্পর্কে আল্লাহকে জিজ্ঞেস করলেন জবাবে বলা হয়েছিল তোমার সন্তানদের মধ্য থেকে একমাত্র মুমিন ও সত্যনিষ্ঠরাই এ পদের অধিকারী হবে। জালেমদেরকে এ অধিকারী করা হবে না। এ ফরমানটি সামনে রেখে তিনি আবার যখন রিযিকের জন্য কেবলমাত্র নিজের মুমিন সন্তান ও বংশধরদের জন্য দোয়া করলেন তখন আল্লাহ জবাবে সঙ্গে সঙ্গে বলে দিলেন যে, সত্যনিষ্ঠ নেতৃত্ব আর রিযিক ও আহার্য এক কথা নয়। দুনিয়ার রিযিক ও আহার্য মুমিন ও কাফের নির্বিশেষে সবাইকে দেয়া হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, “আর স্মরণ কর যখন ইবরাহীম (আ.) দোয়া করলেন- হে আমার রব! এই শহরকে শান্তি ও নিরাপত্তার শহর বানিয়ে দাও। আর এ অধিবাসীদের মধ্য থেকে যারা আল্লাহ ও আখিরাতকে মানবে তাদেরকে সব রকমের ফলের আহার্য দান কর। জবাবে তার রব বললেন, আর যে মানবে না, দুনিয়ার গুটিকয় দিনের জীবনের সামগ্রী আমি তাকেও দিব। কিন্তু সব শেষে তাকে জাহান্নামের আযাবের মধ্যে নিক্ষেপ করবো এবং সেটি নিকৃষ্টতম আবাস।” (সূরা বাকারাঃ ১২৬)

ইসলামের জন্ম পুঁজিবাদ বা সমাজতন্ত্র এর প্রতিক্রিয়ায় হয়নি। রাসূল (সা.) বহুবার প্রতিবেশীদের সাথে সৌজন্য প্রদর্শনের উপর গুরুত্ব প্রদান করেছেন। তিনি বলেন, “আল্লাহ তায়ালা প্রতিবেশীদের প্রতি দায়িত্ব সম্পর্কে এত বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন যে, মাঝে মধ্যে আমার মনে হয়েছে প্রতিবেশীদের হয়ত উত্তরাধিকারীর মর্যাদা দেয়া হতে পারে।”

মুসলমানদের আল্লাহর পথে দান করার সাধারণ নির্দেশ এর অর্থ হচ্ছে মুসলমানকে দানশীল, উদার হৃদয়, সহানুভূতিশীল ও মানবদরদী হতে হবে। স্বার্থসিদ্ধির প্রবণতা পরিহার করে নিছক আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে প্রতিটি সৎকাজে এবং ইসলাম ও সমাজের বিভিন্ন প্রয়োজন পূর্ণ করার জন্য ব্যয় করতে হবে। তাওহীদ তথা এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস থেকে ভ্রাতৃত্বের মূল্যবোধ উদ্ভূত। প্রত্যেকেই এক আল্লাহ ও রাসূল (সা.) এ বিশ্বাসী এবং প্রত্যেকেই এক আদাম (আ.) এর বংশদ্ভূত। কাজেই ভ্রাতৃত্ব, পারস্পরিক নির্ভরশীলতা ও সৌহার্দ ঈমানেরই অঙ্গ।

আল কুরআনের ঘোষণা “ঈমানদার পুরুষ এবং ঈমানদার স্ত্রীলোকেরাই প্রকৃতপক্ষে পরস্পর পরস্পরের দায়িত্বশীল বা সাহায্যকারী বন্ধু। এদের পরিচয় এবং বৈশিষ্ট্য এই যে, এরা নেক কাজের আদেশ দেয়, অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখে, নামায কায়েম করে এবং যাকাত আদায় করে, আল্লাহ ও রাসূলের বিধান মেনে চলে। প্রকৃতপক্ষে এদের প্রতিই আল্লাহ রহমত বর্ষণ করেন।” (সূরা তাওবাঃ ৭১)

প্রতিদিন নামায ধনী-দরিদ্র, রাজা-ফকির সকলকে একই কাতারে একাকার করে মানুষে মানুষে ভেদাভেদকে নিশ্চিন্ন করে দিচ্ছে।

যাকাত সমাজে বিরাজমান ব্যাপক পার্থক্য হ্রাসের একটি কার্যকরী ব্যবস্থা।

রোযাদার নিজে ক্ষুধার্ত ও পিপাসার্ত হওয়ার দরুন খুব ভাল করেই অনুভব করতে পারেন যে, আল্লাহর গরীব বান্দাহগণ দুঃখ ও দারিদ্র্যের মধ্যে কিভাবে দিনাতিপাত করে।

বিশ্বজনিন ভ্রাতৃত্ব সৃষ্টির এক বিশেষ ট্রেনিং এ হজ্ব। রাসূল (সাঃ) জীবনের শেষ হজ্ব অনুষ্ঠানে সোনার বাণী শুনিয়েছিলেন যে, “তোমরা সবাই ভাই এবং প্রত্যেকে সমান। তোমাদের কেউ অন্যের উপর বেশি সুবিধা বা মর্যাদা দাবি করতে পারবে না। একজন আরব অনারব থেকে বেশি মর্যাদাশীল নয় এবং একজন অনারবও আরববাসী থেকে অধিক মর্যাদাশীল নয়।”

ইসলামের আগমনের পূর্বে আরব অধিবাসীরা যে সব ভয়াবহ অবস্থার সম্মুখীন হয়েছিল,  ইসলামের বদৌলতে তারা পরস্পর মিলে একাকার হয়ে গিয়েছিল। এঁদের সম্পর্কে আল্লাহ স্বয়ং বলেছেন, “মোহাম্মদ আল্লাহর রাসূল। আর যারা তার সাথে আছে তারা কাফেরদের ব্যাপারে বজ্র কঠোর, নিজেরা পরস্পর দয়াপরাবশ।” (সূরা আল ফাতাহঃ ১৯)। হিজরত পরবর্তী আনসার মোহাজিরদের পারস্পরিক সাহায্য সহযোগিতা ও সহমর্মিতা পৃথিবীর ইতিহাসে উজ্জ্বল নিদর্শন হয়ে আছে। আল্লাহর রাসূল (সাঃ) মদীনা নামক ইসলামী রাষ্ট্রের প্রধান হয়ে ঘোষণা করলেন আজ থেকে অমুসলিমদের জান-মাল আমাদের পবিত্র আমানত। মানবাধিকার বলতে যা বুঝায় এবং এটিকে যে ভাবেই সংজ্ঞায়িত করা হোক না কেন।

পুঁজিবাদে মানবাধিকারঃ ব্যক্তি তার সম্পদের নিরঙ্কুশ মালিক। সে তার সকল উপায়-উপাদান স্বাধীনভাবে ব্যবহার করার সীমাহীন অধিকার ভোগ করে। তার সম্পদে অন্যের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ। অথচ আল্লাহ তায়ালা আল কুরআনে ঘোষণা করেছেন, “তাদের ধন-সম্পদে প্রার্থী ও বঞ্চিতদের অধিকার রয়েছে।” (সূরা আল জারিয়াহ্‌­ ১৯) পুঁজিবাদের সংজ্ঞাতেই মানবাধিকারকে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। তাই আলোচনা এখানেই ইতি টানা যেত। কিন্তু সামনে বাড়তে হচ্ছে এ জন্য যে, পুঁজিবাদ মানুষের অধিকারকে বঞ্চিত করেও তো ক্ষান্ত হয়নি বরং পুঁজিবাদীরা সমাজের নিম্ন আয়ের লোকদের অবশিষ্ট সামান্য সম্পদটুকুও সুদের মাধ্যমে চুম্বকের ন্যায় চুষে নেয়। পুঁজিবাদীদের শোষণের প্রধান হাতিয়ার হলো সুদ। যে সমাজে এ মরণ ব্যাধি সুদ প্রচলিত, সে সমাজের বাহ্যিক রূপ দেখে যতই সুস্থ ও সুন্দর মনে হক না কেন, ভেতরে ভেতরে কাঠ কীট কুরে কুরে সে সমাজটিকে তুষ করে দিচ্ছে। বর্তমান বিশ্বের আধুনিক রাষ্ট্রগুলো তার সাক্ষী। সে সব সমাজের মানুষগুলোর সামাজিক বন্ধন খুব নড়বড়ে। এর প্রধান কারণ হলো সুদ। সুদখোর ব্যক্তি টাকার পিছনে পাগলের মতো ছুটে ভারসাম্যহীন ব্যক্তিতে পরিণত হয়। নিজের স্বার্থপরতার মাত্রা এতটুকু বৃদ্ধি পায় যে, সে তখন পৃথিবীর কোন কিছুই পরোয়া করে না। তার সুদখোরীর কারণে এক পর্যায়ে মানবিক প্রেম-প্রীতি, ভ্রাতৃত্ব ও সহানুভূতির মাত্রা শূন্যের কোটায় নেমে আসে। তখন সে তার নিজের লোককেও চরম বিপদের সামনে বিনা সুদে ধার দিতে কুণ্ঠাবোধ করে।

এ ব্যক্তি সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, “যারা সুদ খায় তাদের অবস্থা হয় ঠিক সেই লোকটির মত যাকে শয়তান স্পর্শ করে পাগল করে দিয়েছে। তাদের এ অবস্থায় উপনীত হওয়ার কারণ হচ্ছে এই যে, তারা বলে, ব্যবসা তো সুদের মতোই। অথচ আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করে দিয়েছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম।” (সূরা বাকারাঃ ২৭৫)

এ সমাজে ধনী ও গরীবের মধ্যে পাহাড়সম বৈষম্য সৃষ্টি হয় এবং সম্পদ গুটিকয়েক ব্যক্তি বা পরিবারের হাতে কুক্ষিগত হয়। সুদ একটি নিষ্ঠুর জুলুম ছাড়া আর কিছু নয়। ঋণ গ্রহীতা তার শ্রম, মেধা, সময় ব্যয় করে লোকসান করলেও তাতে ঋণদাতার কিছুই যায় আসে না, পূর্বনির্ধারিত হারে সুদ ও আসল তাকে পরিশোধ করতেই হবে। এটি একটি নিদারুণ জুলুম।

লেখকঃ সিনিয়র অফিসার, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লি.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: