সিরাতুল মুস্তাকিম

চরমপন্থার একটি অন্যতম পরিণাম হচ্ছে এটি সমাজকে বিপজ্জনক ও নিরাপত্তাহীন পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেয়। অথচ ঈমান, ইবাদত, আচার-আচরণ, আইন-বিধি তথা জীবনের সর্বক্ষেত্রে ইসলাম মধ্যম সুষমপন্থা অবলম্বনের সুপারিশ করেছে। এটাকেই আল্লাহতায়ালা ‘সিরাতুল মুস্তাকিম’ বা সহজ-সরল পথ বলে উল্লেখ করেছেন। মোট কথা, আল্লাহর নির্দেশিত সিরাতুল মুস্তাকিমই হচ্ছে সুপথ আর এর উল্টো পথই হচ্ছে কুপথ বা বিপথ। তাই মধ্যম বা ভারসাম্যময় পন্থা ইসলামের শুধু সাধারণ বৈশিষ্ট্য নয়, বরং এর মধ্যেই ইসলামের মৌলিক পরিচয় নিহিত। এ প্রসঙ্গে কুরআনের ঘোষণাঃ ‘এমনিভাবে আমরা তোমাদেরকে একটি মধ্যপন্থী উম্মাহ হিসেবে সৃজন করেছি যাতে তোমরা মানবজাতির জন্য সাক্ষী হবে আর রাসূল সাঃ তোমাদের জন্য সাক্ষী হবেন।’ (২ঃ১৪৩)
ইসলাম বাড়াবাড়িতে শুধু নিরুৎসাহিত করেনি, বরং এর বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে। নিম্নোক্ত হাদিসগুলোতে এর সত্যতা পাওয়া যায়।

‘ধর্মে বাড়াবাড়ি সম্পর্কে সাবধান! তোমাদের পূর্ববর্তী (জাতিগোষ্ঠী) এরূপ বাড়াবাড়ির পরিণামে নিশ্চিহ্ন হয়েছে।’
আল্লাহ পাকও কুরআনুল কারিমে তাদের ভর্ৎসনা করে বলেছেন, ‘ধর্মীয় বিষয়ে তোমরা সীমালঙ্ঘন কোরো না।’ (৪ঃ১৭১)

মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাঃ সর্বদা ধর্মীয় বাড়াবাড়ির প্রবণতাকে প্রতিহত করতে চেয়েছেন। তিনি তার সাহাবিদের মধ্যে যাদের ইবাদত-বন্দেগিতে বাড়াবাড়ি করতে দেখেছেন, সংসার-ধর্ম পালনে বিমুখ দেখেছেন তাদের প্রকাশ্যে ভর্ৎসনা করেছেন। কারণ এ সবই হচ্ছে ইসলামের মধ্যপন্থার পরিপন্থী। মানুষের আত্মিক পরিশুদ্ধি এবং ব্যক্তিগতভাবে ও সমষ্টিগতভাবে তার নৈতিক ও বৈষয়িক উৎকর্ষের লক্ষ্যে ইসলাম ইবাদতের সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি নির্ধারণ করে দিয়েছে। এভাবে ইসলাম এমন এক সমাজ গড়তে চায় যেখানে ভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতি বিরাজ করবে এবং এটা করতে গিয়ে ইসলাম সমাজ, সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে না। তাই দেখা যায় নামাজ, রোজা ও হজের মতো ফরজ ইবাদতগুলোর একই সাথে ব্যক্তিগত ও সামাজিক ভূমিকা রয়েছে। স্বভাবত এই দায়িত্বগুলো পালন করতে গিয়ে একজন মুসলমান জীবনের মূলস্রোত থেকেও বিচ্ছিন্ন হয় না, আবার সমাজ থেকেও তাকে নির্বাসিত হতে হয় না। বরং ভাবগত, বাস্তব ও উভয় দিক দিয়ে সমাজের সাথে তার সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ঠ হয়। এ কারণে ইসলাম বৈরাগ্যবাদকে অনুমোদন করে না। ইসলামের দৃষ্টিতে গোটা পৃথিবী মানুষের ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্র। তাই সিরাতুল মুস্তাকিমের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ মানুষের প্রতিটি কাজই ইবাদত ও জিহাদ বলে গণ্য করা হয়।  এ ব্যাপারে কুরআনের ঘোষণা দ্ব্যর্থহীনঃ ‘হে আল্লাহ, আমাদের ইহকালকে সুন্দর করুন এবং সুন্দর করুন আমাদের পরকালকে।’ (২ঃ ২০১)

হাদিসেও আমরা একই বাণীর প্রতিধ্বনি শুনতে পাইঃ ‘হে আল্লাহ, আমার সব কাজকর্মের হিফাজতকারী ধর্মকে সঠিকরূপে উপস্থাপিত করুন; আমার জাগতিক কর্মকাণ্ডকে পরিশুদ্ধ করুন যেখানে আমি জীবন নির্বাহ করি এবং আমার পরকালীন জীবনকেও পবিত্র করুন এবং সার্বিক কল্যাণের লক্ষ্যে আমার জীবনকে প্রাচুর্যের উৎস বানিয়ে দিন এবং সব অপকর্ম থেকে আমাকে রক্ষা করে আমার মৃত্যুকে শান্তির উৎসে পরিণত করুন।’ (মুসলিম)

কুরআনুল কারিমে পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্যকে উপেক্ষা করার প্রবণতা অনুমোদন করা হয়নি বরং এটাকে বান্দার প্রতি আল্লাহর দান বলে উল্লেখ করা হয়েছে। মক্কায় অবতীর্ণ একটি আয়াতে আল্লাহ পাক বলছেনঃ ‘হে আদম সন্তানরা! সুন্দর পরিচ্ছদে ভূষিত হও সব সময় এবং নামাজের স্থানেও। খাও ও পান করো কিন্তু অপচয় কোরো না। আল্লাহ অপচয়কারীকে ভালোবাসেন না।’

‘বলুন, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জীবিকা সৃষ্টির জন্য যেসব শোভন বস্তু এবং বিশুদ্ধ ও পবিত্র জীবিকা সৃষ্টি করেছেন তাকে কে নিষিদ্ধ করেছে?’ (৭ঃ৩২)। মদিনায় অবতীর্ণ একটি সূরায় আল্লাহতায়ালা বিশ্বাসীদের সম্বোধন করে বলছেনঃ ‘হে ঈমানদাররা! আল্লাহতায়ালা যেসব উৎকৃষ্ট বস্তু তোমাদের জন্য হালাল করেছেন তাকে তোমরা হারাম কোরো না এবং সীমালঙ্ঘন কোরো না। আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীকে পছন্দ করেন না। আল্লাহ তোমাদের যে হালাল ও উৎকৃষ্ট জীবিকা দিয়েছেন তা থেকে আহার করো আর আল্লাহকে ভয় করে চলো যাঁর প্রতি তোমরা ঈমান এনেছ।’ (৫ঃ ৮৭-৮৮)

আনাস ইবনে মালিক রাঃ বর্ণনা করেন, ‘একদল লোক নবী সহধর্মিণীদের কাছে এসে রাসূলুল্লাহ সাঃ-এর ইবাদত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। এ ব্যাপারে অবহিত হওয়ার পর তারা তাদের ইবাদত-বন্দেগিকে অপর্যাপ্ত বিবেচনা করে একজন বললেন, আমি সর্বদা সারারাত নামাজ পড়ব; আরেকজন বললেন, আমি সারাবছর রোজা রাখব এবং কখনো ভাঙবো না। এ সময় আল্লাহর নবী তাদের কাছে এলেন এবং বললেনঃ আল্লাহর শপথ, আল্লাহর প্রতি আনুগত্য আমারই সবচেয়ে বেশি এবং তাঁকে বেশি ভয় করি তোমাদের চেয়ে; তথাপি আমি রোজা রাখি এবং ভাঙ্গিও, আমি ঘুমাই এবং নারীকে বিয়ে করি। সুতরাং যে আমার সুন্নাহকে অনুসরণ করে না সে আমার অনুসারীদের অন্তর্ভুক্ত নয়।’

প্রকৃতপক্ষে রাসূলুল্লাহ সাঃ-এর সুন্নাহর মধ্যেই ইসলামের ধ্যানধারণা এবং তার বাস্তব রূপায়ণের সমগ্র চিত্র ফুটে উঠেছে। এতে আল্লাহর প্রতি, পরিবারের প্রতি, নিজের প্রতি, তথা প্রতিটি ক্ষেত্রে দায়িত্ব ও কর্তব্যের এক সুষম ও সমন্বিত রূপ মূর্ত হয়েছে।

Permission taken from Source     http://islamicbanglabd.blogspot.com/

ড. ইউসুফ আল কারজাভি

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: