যে কাহীনি হৃদয় নাড়ায়

এক সাথে মহান আল্লাহ ও মায়ের হক

আউলিয়ায়ে কেরামের জীবনি গ্রন্থ তাজকেরাতুল আউলিয়া নামক কিতাবে হযরত শেখ ফরিদ উদ্দিন আত্তার (রহ.) এমন একজন অলীর জীবনি সংকলন করেন তিনি হলেন হযরত সুলতান বায়েজিদ বোস্তামী (রহ.)। আল্লাহ তায়ালার বন্ধু হযরত সুলতান বায়েজিদ (রহ.) তার শ্রম, ইবাদত, রেয়াজত ও সাধনার মাধ্যমে শ্রেষ্ঠত্বের স্থান অর্জন করেন। তিনি মায়ের সেবায় মুসলমানদের ইতিহাসে অনন্য নজির স্থাপন করেছেন। বর্তমান অশান্ত পৃথিবীতে তার মত মহান ব্যক্তিত্বের আদর্শ গ্রহণ করলে শান্তিকামী মুসলমানদের সফলতা অর্জন সম্ভব। তাজকেরাতুল আউলিয়া নামক কিতাবে হযরত শেখ ফরিদ উদ্দিন আত্তার (রহ.) উল্লেখ করেন-হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রহ.) বাল্য বয়সে প্রাথমিক শিক্ষা অর্জনের জন্য তার মা পার্শ্বস্থ একটি মাদ্রাসায় কোরআন মাজীদ শিক্ষার উদ্দেশ্যে ভর্তি করেন। উস্তাদের নিকট কুরআনে কারীমের পাঠদান অস্থায় সূরা লোকমানের
[وَوَصَّيْنَا الإِنْسَانَ بِوَالِدَيْهِ حَمَلَتْهُ أُمُّهُ وَهْنًا عَلَى وَهْنٍ وَفِصَالُهُ فِي عَامَيْنِ أَنِ اشْكُرْ لِي وَلِوَالِدَيْكَ إِلَيَّ المَصِيرُ] {لقمان:١٤}
অর্থ : আর আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহারের জোর নির্দেশ দিয়েছি। তার মাতা তাকে কষ্টের পর কষ্ট করে গর্ভে ধারণ করেছে। তার দুধ ছাড়ানো দু বছরে হয়। নির্দেশ দিয়েছি যে, আমার প্রতি ও তোমার পিতা-মতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। অবশেষে আমারই নিকট ফিরে আসতে হবে।
– সূরা লোকমান : ১৪
এই আয়াত পাঠ করে ওস্তাদের কাছে এর মর্মার্থ জিজ্ঞাসা করলে তিনি এর অর্থ বিস্তারিত আকারে বললেন। আয়াতের মর্ম শুনে তার মনের এক প্রকার তোলপাড় সৃষ্টি হলে তিনি তৎক্ষনাৎ ওস্তাদের অনুমতিক্রমে গৃহে ফিরে আসলেন। অসময়ে গৃহে আসতে দেখে মা তাকে কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন আম্মা আমি আজ কুরআনের একটি আয়াত তেলাওয়াত করলাম আল্লাহ বলেন, “আমার এবং তোমার পিতা মাতার শুকর আদায় কর”। মা আমিতো শিশু অবস্থায় মহান পিতাকে হারিয়েছি। এবার বল আমি কি তোমার এবং আমার স্রষ্টার একসাথে শুকর আদায় করতে পারব। তাতো আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই মা তোমার নিকট ছুটে আসলাম হয়তো আমার থেকে তোমার দাবী ছাড়িয়ে নাও। নয়তোবা এই ব্যাপারে তোমার অধিকার আল্লাহর হাতে ছেড়ে দাও। আমি মনে প্রাণে একজনের শুকর আদায়ে আত্ম নিয়োগ করব। জননী পুত্রের কথা শুনে আনন্দে বলেন, “বাবা আমি পরম খুশীতে আমার দাবী ও অধিকার পরিত্যাগ করে তোমাকে আল্লাহর হাতে সপর্দ করলাম। অতঃপর আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য লাভে তিনি একাধারে ত্রিশ বৎসর জঙ্গল ও পর্বতে অবস্থান করেন। শুধু নির্জনেই ইবাদত নয় এসময় তিনি এক এক করে অন-ত ১১৩ জন কামেল অলীর দরবারে গিয়ে তাদের নেক সোহবত ও ফয়ুজাত হাছিল করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন হযরত জাফর সাদিক (রা.)। হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রহ.) বলেন, আমি যত আল্লাহর অলীর দরবারে যাইনা কেন আমার মায়ের খেদমতের মত আত্মতৃপ্তি আর কোথাও পাইনি।

হযরত উমর ও তাঁর মেয়ের কিচ্ছা

একদা হযরত উমর ফারুক রাদ্বিঃ যমানায় কিছু গনিমতের মাল এসেছিল এবং এ খবর উম্মুল মুমিনীন হযরত হাফছা রাঃ বিন্‌তে উমরের নিকট পৌছেচে। তখন হযরত হাফছা হযরত উমর রাদ্বিঃ এর খিদমতে এসে বললেন, আমীরুল মুমিনীন এ যে সমস্ত গনিমতের মাল আসল তা হতে আমার হক্ব দিয়ে দিন। কেন না আমি আপনার আপনজন হয়ে থকি।
হযরত উমর উত্তর দিলেন, প্রিয় বেটি, নিশ্চয় তুমি আমার মাল থেকে হক্ব ও হিস্যা রয়েছে কিন্তু এ সমস্ত মাল হল গনিমত যার মালিক হল জনগন তুমি এথেকে এক দিরহাম নেওয়ারও হক্ব নাই । যদি আমি এখান থেকে কিছু দিয়ে দেয় তখন আমি আত্মসাতকারীর মধ্যে গন্য হব। তুমি এটা চাও, তোমার পিতা ধোঁকাবাজি ও আত্নসাতকারী হউক? যদি আমি জনগণের এ মাল থেখে একটিও দিরহাম তোমাকে দেয় কাল ক্বিয়ামতের দিবসে আল্লাহর সামনে অপরাধী হিসাবে দন্ডয়মান হব এবং আমার জন্য আত্মসাৎ এর হিসাব দেওয়া অতি মুশকিল হবে। উম্মুল মুমিনীন হযরত হাফছা রাঃ যখন এ কথা শুনলেন চুপে চুপে উঠে চলে গেলেন ।

শিক্ষা নিন এ কাহিনী থেকে কেমন ছিল স্বর্ণালী যুগের মানুষগুলো। অর্ধজাহানের বাদশাহী পেয়েও নিজের ভোগবিলাসের জন্য এক কানাকড়িও খরচ করেননি।
আর আজ আমাদের নেতারা, পাতি নেতারা, আমাদের নেতাদের খেতা গায়ে দেয় এমন মানুষরা কি করছে?

 
মাতৃভক্তির আশ্চর্য নিদর্শন

হযরত দাউদ (আ.) একদা যবুর কিতাব তেলাওয়াত করার সময় মনে মনে চিন্তা করলেন বর্তমান যুগে আমার চাইতে বড় ইবাদতকারী আর কেউ হতে পারে না। এই কথা চিন্তা করতে না করতেই আল্লাহ তায়ালা অহি নাযিল করে দিলেন, ‘হে দাউদ তোমার এ রকম চিন্তা করা উচিত হয়নি।’ কারণ তোমার চাইতেও বড় ইবাদতকারী বর্তমানে রয়েছে। তুমি অমুক পাহাড়ের পাদদেশে একটি জঙ্গল আছে সেখানে যাও। ওখানে একজন কৃষককে পাবে। সে তোমার চাইতেও ইবাদত বেশি করেছে। ঘটনা হল সে একদা তার ঘরের ছাদের উপর পাঁয়চারি করছিল। ঘটনাক্রমে তার মা ছাদের নিচে ছিল। সে মনে করেছিল তার মায়ের গায়ে তার পায়ের ধুলা পড়েছে। এই ভুলে অনুতপ্ত হয়ে আমার কাছে তাওবার উদ্দেশ্যে আজ ৭০০ বৎসর যাবত ক্ষমা প্রার্থনা করে ইবাদত করে আসছে। তার কাছে গিয়ে তাকে সুসংবাদ বলে দাও –
وَ بَشِّرْه بِالمَغْفِرَةِ مِنِّيْ.
“ওয়াবাশ্‌শিরুহু বিল মাগফিরাতি মিন্নী” তার সমস- জীবনে সব গুনাহ ক্ষমা করে দিয়েছি। হযরত দাউদ (আ.) পাহাড়ের পাদদেশে গিয়ে দেখলেন এক বৃদ্ধ লোক সেখানে ইবাদতে মগ্ন। তার জীর্ণ শীর্ণ শরীরের হাড়ের জোড়া গুলি দেখা যাচ্ছে এবং প্রাণ যেন ওষ্ঠগত হয়ে যাচ্ছে। তাকে নামাযের তাহরীমা বাঁধা অবস’ায় দেখতে পেলেন। নামায শেষ হলে হযরত দাউদ (আ.) সালাম দিয়ে বললেন আমি আপনার সাথে কিছু আলোচনা করতে চাচ্ছি। বৃদ্ধ বললেন আপনি কে? আমি আল্লাহর নবী হযরত দাউদ (আ.)। লোকটি বললেন আমি যদি জানতাম যে, আপনি দাউদ (আ.) তাহলে আমার ইবাদত হতে পৃথক হতাম না। কারণ আপনি আল্লাহর একজন নবী। আল্লাহ আপনার উপর সন’ষ্ট। কিন’ আমি আল্লাহর একজন বিতাড়িত বান্দাহ। কারণ আজ থেকে ৭০০ বৎসর পূর্বে আমার ঘরের ছাদ অতিক্রমকালে কিছু মাটি আমার দয়াময়ী মায়ের শরীরে পড়েছিল। এটি আমার জন্য মায়ের কাছে বড় বেয়াদবী। তাই আজ ৭০০ বৎসর যাবত এই জঙ্গলে আল্লাহর কাছে তাওবা করছি। জানিনা আমার মা আজও বেঁচে আছে কিনা? মা আমার প্রতি সন’ষ্ট রয়েছে কিনা তাও আমার জানা নাই। তাই আজ শত শত বৎসর যাবত খানা পিনা ছেড়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাচ্ছি যেন মহান আল্লাহ ও আমার মা আমার প্রতি সন’ষ্ট হয়ে যায়। এই অবস্থায় বাকী দিনগুলি অতিবাহিত করতে চাই। তাই আপনি আমার কাছ থেকে চলে যান এবং আমার জন্য দোয়া করুন। দাউদ (আ.) বললেন শোন আল্লাহ আমাকে তোমার প্রতি শুভ সংবাদ দিয়ে পাঠিয়েছেন। মহান আল্লাহ তোমার প্রতি সন’ষ্ট এবং তোমার মাও তোমার প্রতি সন’ষ্ট অবস্থায় ইন্তেকাল করেছেন। এ কথাও উল্লেখ্য যে তোমার মা সে সময় সেই ছাদের নিচে ছিল না। এ সংবাদ শুনে লোকটি বললেন এতো আমার জন্য মহান সুসংবাদ। এই বলে
قَالَ وَاللهِ لاَ يُحِبُّ الْحَيَاةَ بَعْدَ هَذَا فَسَجَدُوْ قَالَ رَبِّ أَقْبِضْنِيْ إِلَيْكَ فَمَاتَ مِنْ سَاعَتِه رَحِمَهُ اللهُ تَعَا لَي.
‘আল্লাহর কসম আমি এর পর জীবিত থাকাকে পছন্দ করিনা। সে বলল হে আমার রব আপনি আমাকে আপনার কাছে তুলে নিন। ফলে তৎক্ষণাৎ তিনি ইন্তেকাল করলেন।’

এতীম অবস্থায় মহানবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম

যার সৃষ্টির উৎস ধরে সমস্ত আঠার হাজার মাখলুকাত মহান আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন তিনি হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। একদা মহানবী অশ্রুসিক্ত নয়নে মা আমেনার কাছে পিতার কথা বলছিলেন। বিশ্ব নবীর মুখে হযরত খাজা আবদুল্লাহর কথা শুনে মা আমেনাও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লেন। মহানবী বলেন মা আমার বয়সের ছেলেরা পিতার কাছ থেকে অনেক আদর পায়। কিন্তু আমি পিতার সাক্ষাত পর্যন্ত পেলাম না। মা আমার বাবা কোথায়? কি’ন্তু মা আমেনা বুক ফাটা কান্নায় কোন উত্তর দেওয়ার মত ভাষা পাচ্ছেন না। এমন সময় মহানবীর দাদা হযরত আবদুল মুত্তালিব এসে বিষয়টি বুঝতে পেরে মা আমেনাকে বললেন তুমি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে নিয়ে মদীনায় আবদুল্লাহর কবর জেয়ারত করে আস। হয়ত এতে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মনে একটু সান-না পাবে। মা আমেনা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এবং উম্মে আয়মান দাসীকে সাথে করে মদীনা জেয়ারতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে গেলেন। হযরতে মা আমেনা (রা.) মদীনায় হযরত খাজা আবদুল্লাহর কবরের সামনে দাড়িয়ে যখন দুচোখের পানি নিরবে ছাড়ছিল তখন হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মায়ের সামনে দাড়িয়ে বললেন এটি কার কবর যার সামনে দাড়িয়ে আপনি কাঁদছেন? হযরত আমেনা বললেন এটিই তোমার পিতা আবদুল্লাহর কবর। তুমি দোয়া কর হয়ত তোমার মনে সান-না পাবে! বিশ্ব মানবতার মুক্তির কাণ্ডারী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাজা আবদুল্লাহর কবরের সামনে গিয়ে কবর জড়িয়ে ধরে কাঁদছেন আর বাবা বলে ডাকছেন। সেই মুহূর্তের এক করুণ দৃশ্য আবির্ভূত হয়। কবির ভাষায় : ‘এমন সময় হয়ত আবদুল্লাহ কবর হতে আল্লাহকে ডাকছেন হে আমার প্রভু আমার কবর দিখণ্ডিত করে দাও, আমি দুনিয়ায় একবার গিয়ে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে আদর করে আসব।’ কিন্তু এত খোদার হুকুম। তা কি সম্ভব হয়। কবর যেয়ারত শেষে মক্কার পথে রওয়ানা দিলেন হযরত মা আমেনা সহ সবাই। মক্কা ও মদীনার মাঝখানে “আবওয়া” নামক বসি-র মাঝে যাত্রা বিরতি কালে তাবু ঘাড়লেন। রাতে মা আমেনার গায়ে অধিক জ্বর আসল। মা আমেনা হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছেন এবং বলছেন হে আমার প্রভু আমি মনে করেছিলাম আমার পুত্র মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বড় হবে। আমার খেদমত করবে। তার ভালবাসা পাব। কিন্তু আমার আশা আশাই রয়ে গেল। তা পূর্ণ হল না। আমার মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তোমার হাতে সোপর্দ করে গেলাম, তার হেফাজত তুমি করবে। মা আমেনা এ বলে এই পৃথিবী ত্যাগ করে আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে গেলেন। মাকে হারিয়ে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুচোখের পানি ছেড়ে মায়ের বুকে পড়ে কাঁদছেন এবং বলছেন মা আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছ। আমি কি করে আজ এই অন্ধকারময় জাহিলী যুগে তোমাকে বিনে বেচে থাকব। অন্যদিকে আল্লাহর আরশে আজীম থেকে অদৃশ্য আওয়াজ আসছে ‘হে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমার সঙ্গে আমি রয়েছি। আমার আঠার হাজার সৃষ্টি তোমার অনুগত করে দিলাম।’ সেদিন মাকে হারিয়ে সৃষ্টির শ্র্রেষ্ঠ মহা মানব হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এতীম হিসাবে জীবনের সূচনা হয়।

Permission taken from Source http://prothom-aloblog.com/users/base/sadi/

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: