সহনশীলতা

পবিত্র কুরআনে বারবার ঘোষণা করা হয়েছে­ মানুষের মাঝে গাত্রবর্ণ, ভাষা, জাতি বা সম্পদের তারতম্যজনিত যে প্রভেদগুলো রয়েছে তা নিতান্তই স্বাভাবিক (৩০ঃ ২২); এমনকি স্বয়ং আল্লাহতায়ালা মানুষের মাঝে আদর্শগত ও ধর্মমতগত বৈচিত্র্যকে তাঁর নিজেরই সৃষ্টি প্রক্রিয়ার অংশ বলে ঘোষণা করেছেনঃ
‘…আল্লাহ্‌তায়ালা চাইলে তোমাদের সবাইকে একই উন্মতের অন্তর্ভুক্ত করে দিতে পারতেন। তিনি বরং চেয়েছেন তার দেয়া অনুগ্রহের ভিত্তিতে তোমাদের যাচাই-বাছাই করে নিতে। অতএব ভালো কাজে তোমরা সবাই (একে-অপরের সাথে) প্রতিযোগিতা করো…’ [সূরা আল-মায়েদা (৫ঃ ৪৮)]
এমনকি ইসলামের নবী সাঃ স্বয়ং ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, অতিরিক্ত বহুমত সহিষ্ণুতার কারণে তাঁর নিজের অনুসারীরাও দলে দলে বিভক্ত হয়ে পড়বে।
এই মনোবৃত্তি ইসলামের অনুসারীদের পরমতসহিষ্ণু হতে বাধ্য করে, যা খোদ কুরআনেই সমর্থিত হয়েছেঃ
‘(হে নবী) তুমি বলো, এই সত্য (কুরআন) তোমাদের মালিকের পক্ষ থেকে এসেছে। সুতরাং যার ইচ্ছে সে ঈমান আনুক, আর যার ইচ্ছে সে অস্বীকার করুক…’ [সূরা আল-কাহফ (১৮ঃ ২৯)]
‘(হে নবী) তোমার মালিক চাইলে এ জমিনে যত মানুষ আছে তারা সবাই ঈমান আনত। তুমি কি জবরদস্তি করে চাইবে যে, তারা সবাই মুমিন হয়ে যাক।’ [সূরা ইউনুস (১০ঃ ৯৯)]
যে ধরনের জবরদস্তিমূলক প্রচারণা ও ধর্মবিশ্বাসকে জোর করে চাপিয়ে দেয়ার পদ্ধতি ইসলাম অনুমোদন করে না। এমনকি স্বয়ং রাসূল সাঃ-কেও এ ব্যাপারে সতর্ক করে দেয়া হয়েছিল।
‘তুমি হচ্ছো (পরকালের আজাবের) ভয় প্রদর্শনকারী (একজন রাসূল মাত্র)।’
‘যদি এসব মানুষ তোমার সাথে (এই জীবন বিধানের ব্যাপারে) কোনোরূপ বিতর্কে লিপ্ত হয়, তাহলে (তুমি তাদের) বলে দাও, আমি ও আমার অনুসারীরা (সবাই) আল্লাহর আনুগত্য স্বীকার করে নিয়েছি। অতঃপর যাদের (আমার পক্ষ থেকে) কিতাব দেয়া হয়েছে এবং যারা (কোনো কিতাব না পেয়ে) মূর্খ (থেকে গেছে) তাদের (সবাইকে) জিজ্ঞেস করো, তোমরা কি সবাই আল্লাহর আনুগত্য মেনে নিয়েছ? (হ্যাঁ) তারা যদি (জীবনের সর্বক্ষেত্রে) আল্লাহর আনুগত্য মেনে নেয়, তাহলে (তো ভালো কথাই), তারা তো সঠিক পথ পেয়ে গেল, কিন্তু তারা যদি (ঈমান থেকে) মুখ ফিরিয়ে নেয় তাহলে (তোমার কোনো উদ্বেগ, উৎকণ্ঠার কারণ নেই) তোমার দায়িত্ব হচ্ছে কেবল (আমার কথা) পৌঁছে দেয়া, তারপর বান্দাদের (কার্যকলাপ) পর্যবেক্ষণ করার জন্য আল্লাহতায়ালাই রয়েছেন।’ [সূরা আলে-ইমরান (৩:২০)]
‘(হে নবী) তুমি (এদের আরো) বলো, হে মানুষ! তোমাদের কাছে মালিকের পক্ষ থেকে সত্য এসেছে। অতএব (এ সত্যের ভিত্তিতে) যে হেদায়েতের পথ অবলম্বন করবে, সে তো তার নিজের ভালোর জন্যই হেদায়েতের পথে চলবে। আর যে গোমরাহ্‌ থেকে যাবে, সে তো গোমরাহির ওপর চলার কারণে (এমনিই) পথভ্রষ্ট হয়ে যাবে। আসলে আমি তো তোমাদের ওপর কর্মবিধায়ক নই (যে তোমাদের জোর করে গোমরাহির পথ থেকে বের করে আনব)। [সূরা ইউনুস (১০:১০৮)]
সূরা বাকারার ২৫৬ নম্বর আয়াতে বর্ণিত হয়েছেঃ
‘আল্লাহর দীনের ব্যাপারে কোনো প্রকার জবরদস্তি কিংবা বাধ্যবাধকতা নেই।’ এর অর্থ হচ্ছে­ যেহেতু বিশ্বাস একটি মনোজাগতিক প্রক্রিয়া, ধর্মীয় জবরদস্তি একটি নিষ্ফল প্রচেষ্টা মাত্র; এবং এটি নিষিদ্ধও বটে। এ কারণেই ধর্মীয় মতবিরোধ ও বিতর্ককে একটি বন্ধুত্ব এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশে পরিচালিত করার তাগিদ রয়েছে, এবং এগুলোর ফলাফলকে সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর হাতে ছেড়ে দেয়ার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে (৪:৫৯)
একজন বিশ্বাসীকে চেনার সহজতম উপায় হচ্ছে তার আচরণ। অর্থাৎ সে ‘ভালো কাজের নির্দেশ দিবে’ (আল আমরু বি আল মারুফ) এবং ‘মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করবে’ (আন নহি আনিল মুনকার)। হাদিসের নির্দেশ মোতাবেক একজন মুসলমানকে এটা করতে হবে প্রথমত, ‘নিজের হাত দ্বারা’। এটা সম্ভব না হলে ‘নিজের ভাষা দ্বারা’ এবং এটাও যদি সম্ভবপর না হয় তাহলে, অন্ততপক্ষে ‘নিজের অন্তর দ্বারা’।
ধর্মীয় ব্যাপারে জবরদস্তি মোনাফিকির জন্ম দেয়, যাকে সর্বশক্তিমান আল্লাহ্‌তায়ালা চরমভাবে অপছন্দ করেন। নৈতিকতার ব্যাপারে যেহেতু ব্যক্তি বিবেকের অভ্যন্তরের একটি প্রক্রিয়া ক্রিয়াশীল থাকে, সেহেতু নৈতিক উৎকর্ষ জোর করে আরোপ করা সম্ভব নয়। নবী করিম সাঃ বলেছেন, ‘অকপটতাই ধর্ম।’
আল্লাহ্‌তায়ালা যেখানে মুসলমানদের অমুসলিমদের বুদ্ধিবৃত্তিক, নৈতিক মর্যাদা ও বিবেকের স্বাধীনতা (২ঃ২৫৬) রক্ষা করার নির্দেশ দিচ্ছেন, সেখানে সাক্ষাৎ মুসলমানেরা কিভাবে স্ব-আরোপিত জবরদস্তির শিকারে পরিণত হতে পারে।
সহনশীলতার যে নির্দেশ কুরআন দিচ্ছে তা যুগপৎ মুসলিম ও অমুসলিম উভয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। প্রত্যেককেই মেনে চলতে হবে যে, যে ক্ষেত্রে যেটি সঠিক ও ন্যায়, সেটিকে তার নিজস্ব পরিবেশে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। নিজের পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে, নিজের কারখানার ব্যবস্থাপক হিসেবে, রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে নিজ রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে, কিন্তু কোনো অবস্থাতেই নিজ আইনগত আওতার বাইরে গিয়ে নয়। তা না হলে ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় চেতনার ‘বিভ্রান্ত সংশ্লেষণ’-এর ফলে একটি ‘ফ্যাসিস্ট ইসলামি’ রাষ্ট্র জন্ম নিতে পারে। আল্লাহ্‌ আমাদের এই আজাব থেকে রক্ষা করুন। এমন রাষ্ট্র নিজেকে ‘ধর্মরাজ্য’ বা যাই বলে আখ্যায়িত করুক না কেন।

মুরাদ হফম্যান অনুবাদঃ মঈন বিন নাসির

Permission taken from Source     http://islamicbanglabd.blogspot.com/

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: