যিকির

Permission taken from Source  http://prothom-aloblog.com/users/base/ahsanullahsumon/

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
আমাদেরকে আল্লাহ তাঁর মনোনীত শ্রেষ্ঠ নবীর উম্মত করে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন এটা যে আমাদের জন্য কত বড় পাওয়া তা বলে বা লিখে শেষ করার মত নয়। এজন্য মহান রবের নিকট শুকরিয়া আদায়করা আমাদের জন্য অনেক কম হয়ে যায়। আমাদের মর্যাদা যে কত বড়, মহান রাব্বুল আলামিন যে আমাদের উপর কতটুকু দয়াবান তার কিছু নমুনা নিচের হাদিস থেকে আমরা পেতে পারি-
* রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন- আমার উম্মতের হিসাব আমার উপর ন্যাস্ত করার জন্য আমি মহান আল্লাহর সমীপে আরয করলাম, যাতে তারা অপরাপর উম্মতের সামনে লাঞ্ছিত না হয়, তখন মহান ও পরাক্রমশালী রব আমার প্রতি প্রত্যাদেশ করলেন, “হে মুহাম্মদ! আমি তাদের হিসাব গ্রহণ করব। অনন্তর তাদের যদি কোন ক্রটি হয়, আমি আপনার কাছেও তা গোপন রাখব, যাতে তারা আপনার কাছেও অপদস্খ না হয়।” -দায়লামী এ হাদীসটি হযরত আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে সংগ্রহ করেছেন।
যে আল্লাহ আমাদের উপর এতটুকু দয়াবান আমাদের উচিত নয় কি সে মহান আল্লাহর রাস্তায় নিজেকে সামিল করা। সামান্য একটু খেয়াল করে চললে আমাদের জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের পথে চলা কোন কঠিন কাজ নয়। আমরা পারি সারাদিন ইবাদাতে কাটিয়ে দিতে। শুনতে কেমন যেন কঠিন কঠিন ভাব হয়ে যায়। যে কোন কাজের শুরুতে আল্লাহর নাম নিয়ে শুরু করলে তা শেষ না হওয়া পর্যন্ত ইবাদতের সওয়াব আমাদেরকে দেওয়া হয়। কত সহজ হয়ে গেলনা?
আসুন আমরা আজ আল্লাহ যিকির নিয়ে কিছু হাদিস পড়ি এবং সে অনুযায়ী আমল করার চেষ্টা করি আল্লাহ নিশ্চয়ই আমাদেরকে তাঁর প্রিয় বান্দাদের কাতারে সামিল করে নিবেন।
১. রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন- মূসা (আঃ) বললেন, “হে আমার রব। আমি চাই, তোমার বান্দাদের মধ্যে তুমি যাকে ভালবাস আমিও যেন তাকে ভালবাসতে পারি।” আল্লাহ্ বললেন, “(হে মূসা), তুমি যখন দেখ, আমার কোন বান্দা বেশি আমার যিকির করছে (তখন বুঝে নিও) আমি তাকে এর সমতা দিয়েছি, আমার অনুমতিক্রমেই সে আমার যিকির করছে এবং তাকে আমি ভালবাসি। আর যখন দেখ, আমার কোন বান্দা আমার যিকির করে না তখন যেন আমি তাকে এ (আল্লাহর যিকির) থেকে বিরত রেখেছি এবং আমি তার উপর রুষ্ট।” -দারু কুতনী এ হাদীসটি হযরত উমর (রাঃ) থেকে সংগ্রহ করেছেন।
২. রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন- মহান আল্লাহ বলেছেন, “আমার যিকির যাকে এভাবে মগ্ন রাখে যে, সে আমার কাছে তার কাম্যবস্তু চওয়ারও অবসর পায় না, সে আমার কাছে চাওয়ার আগেই আমি তার সে চাহিদা পুরন করে দেই।”-এ হাদীসটি আবূ নুয়াঈ’ম হযরত হুযাইফা (রাঃ) থেকে সংগ্রহ করেছেন।
৩• রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন- সেই পবিত্র সত্তার কসম! যাঁর হাতে আমার জীবন। নিশ্চয়ই মহান ও প্রতাপশালী আল্লাহ্ বেহেশতের কোন কোন গাছকে আদেশ করবেন, “আমার যে সকল বান্দা আমার যিকিরের জন্য গান-বাজনা শোনা থেকে বিরত রয়েছে তাদেরকে তুমি সুমিষ্ট সূর পরিবেশন কর।” তারা তখন তসবীহ ও পবিত্রতা বর্ণনার বিনিময়ে (অর্থাৎ যিকিরের পুরস্কার হিসাবে) এরূপ সুমিষ্ট সূর শুনতে পাবে ইতিপূর্বে যার অনুরূপ সূর কোন সৃষ্টি জীব শুনেনি।” -দায়লামী এ হাদীসটি আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে সংগ্রহ করেছেন।
৪. রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন- এমন কোন জাতি নেই যারা আল্লাহর যিকিরের জন্য মজলিসে বসেছে অথচ জনৈক ঘোষক আকাশ থেকে তাদেরকে এই বলে আহবান করেননি-“নিশ্চয়ই তোমাদের পাপ ক্ষমা করা হয়েছে এবং তোমাদের পাপসমূহ পূণ্য দ্বারা পরিবর্তিত করে দেয়া হয়েছে।” -আসকারী এ হাদীসটি হযরত হানযালা আবসী (রাঃ) থেকে সংগ্রহ করেছেন।
৫. রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন- মহান আল্লাহ বলেছেন, “হে আদম সন্তান! ফজর ও আসর নামাযের পরে কিছু সময়ের জন্য আমাকে স্মরণ কর। তাহলে উভয় নামাযের মধ্য সময়ে আমি তোমাকে সহায়তা করব।” -আবূ নুয়াঈ’ম এ হাদীসটি আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে সংগ্রহ করেছেন।
৬. রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন- নিশ্চয় বিশ্ববাসী মু’মিন বান্দা আল্লাহকে ডাকে, অনন্তর আল্লাহ্ তা পছন্দ করেন। অতঃপর তিনি বলেন, “হে জিবরাঈ’ল আমার (মুমিন) বান্দার এ প্রয়োজন পূরণ কর এবং তা সাময়িক রেখে পেছনে ফেল, কারণ আমি তার কন্ঠস্বর শুনতে ভালবাসি।” আর নিশ্চয় (গুনাহগার) বান্দা আল্লাহকে ডাকে কিন্তু আল্লাহ্ তা ঘৃণা করেন। অত:পর মহান আল্লাহ্ বলেন•“হে জিবরাঈ’ল আমার বান্দার প্রয়োজন পূরণ কর এবং তার জন্য তা জলদি কর। কারণ, আমি তার কন্ঠস্বর শুনতে ভালবাসি না।” -ইবনু আসাকির এ হাদীসটি আনাস (রাঃ) থেকে সংগ্রহ করেছেন।
৭. রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন- নিশ্চয়ই সুমহান আল্লাহ্ বলেন, “আমি আমার বান্দার সাথে অবস্খান করি। যতক্ষণ সে আমার যিকির করে এবং আমার যিকিরে তার দু’ঠোট সঞ্চারিত হয়।” -আহমদ এ হাদীসটি আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে সংগ্রহ করেছেন।
উপরোক্ত হাদিসগুলো থেকে আমরা কিছুতো বুঝতে পেরেছি যিকিরের মর্যাদা কতটুকু। যিকির করার জন্য কোন অবসর সময়ের প্রয়োজন হয়না। আমরা যদি হাতে কাজ করি আর মনে মনে আল্লাহর যিকির করি তাতে কাজের কোন সমস্যা হওয়ার কথা নয়। আর এভাবে প্রথম দিকে হয়ত কষ্ট হতে পারে কিন্তু কিছুদিন চালু রাখার পর দেখবেন আপনার মনের অজান্তে কখন যেন অন্তরে অন্তরে যিকির চালু হয়ে যাবে। আমাদের শরীরকে চালু/তাজা রাখার জন্য যেমন খাবারের প্রয়োজন তদ্রুপ আমাদের অন্তরকে তাজা রাখার জন্য যিকির চালু রাখা প্রয়োজন। আসুন আমরা চেষ্টা করি কাজের মধ্যে বা গাড়িতে বসে আছি বা অবসর বসে আসি তখনই মনে মনে যিকির চালু করি এবং আমাদের অন্তরকে তাজা করি। নিচের কিছু যিকির বিষয়ক হাদিস তুলে ধরার চেষ্টা করছি-
১• রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন- সুমহান আল্লাহ্ বলেছেন, “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ (আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই) আমার দুর্গ। তাতে যে প্রবেশ করেছে, সে আমার শাস্তি থেকে নিরাপদ হয়েছে।”- এ হাদীসটি হযরত আনাস (রাঃ) থেকে ইবনু নাজাজ সংগ্রহ করেছেন।
২• রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন – সুমহান আল্লাহ্ হযরত মূসা ইবনে ইমরানের প্রতি প্রত্যাদেশ নাযিল করলেন যে, “তাঁর উম্মতের মধ্যে এমন কিছু সংখ্যক লোক হবে, তারা উঁচু নিচু স্খানে উঠা নামার সময় ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ (আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই)’ সাক্ষ্য দিতে থাকবেন, তাদের জন্য আম্বিয়ায়ে কেরামের অনুরূপ পুরস্কার রয়েছে।” -দায়লামী এ হাদীসটি হযরত আনাস (রাঃ) থেকে সংগ্রহ করেছেন।
৩. রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন- মহান ও পরাক্রমশালী আল্লাহ বলেন, “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহর সম্প্রদায়কে আমার আরশের ছায়া তলে স্খান দাও। কারণ, নিশ্চয়ই আমি তাদেরকে ভালবাসি।” -দায়লামী এ হাদীসটি হযরত আনাস (রাঃ) থেকে সংগ্রহ করেছেন।
৪. রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন- কোন মুসলমান বান্দা যখন ‘লা -ইলাহা ইল্লাল্লাহু‘ (আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই) বলে, তখন তা আকাশসমূহ ছেদন করে আল্লাহর সম্মুখে গিয়ে পৌছে। আল্লাহ্ তখন বলেন, “স্খির হও”, তখন এটা বলে, “আমি কিরূপে স্খির হব- আমি যার দ্বারা উচ্চারিত হয়েছি এখনও তাকে ক্ষমা করা হয়নি”। আল্লাহ তখন বলেন, আমি তোমাকে সে লোকের জিহ্বা দ্বারা উচ্চারিত করিনি যাকে উচ্চারনের আগ মুহুর্তে ক্ষমা করে দেইনি।” -দায়লামী এ হাদীসটি হযরত আনাস (রাঃ) থেকে সংগ্রহ করেছেন।
৫. রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন- বান্দা যখন বলে, “রাব্বিগ-ফিরলী, (প্রভু আমাকে ক্ষমা করুন)” প্রতিপালক তখন বলেন, “আমার বান্দা এটা উপলব্ধি করেছে যে, আমি ছাড়া আর কেউ পাপসমূহ মাফ করতে পারে না।” -আহমদ এ হাদীসটি হযরত আলী (রাঃ) থেকে সংগ্রহ করেছন।
৬. রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন- বান্দা যখন বলে- ‘সুবহানাল্লাহ্’ (আল্লাহ পবিত্র) আল্লাহ্ বলেন, “আমার বান্দা আমার পবিত্রতা ও প্রশংসায় সত্যারোপ করেছে। পবিত্রতা আমি ভিন্ন আর কারো হতে পারে না।” -দায়লামী এ হাদীসটা হযরত আবুদ্ দারদা (রাঃ) থেকে সংগ্রহ করেছেন।
৭. রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন- যে লোক বলে, ‘সুবহানাল্লাহি ওয়াল হামদু লিল্লাহি, ওয়া লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, ওয়ালা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা-বিল্লাহি’ তার সম্পর্কে’ আল্লাহ বলেন, “আমার বান্দা আমার নিকট আত্নসমর্পন করেছে এবং আমার অনুগত হয়েছে।” -এ হাদীসটি হাকেম হযরত আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে সংগ্রহ করেছেন।
আমরা যিকির হিসেবে পড়তে পারি- সুবহানাল্লাহ (আল্লাহ পবিত্র), আলহামদুলিল্লাহ (সকল প্রশংসা শুধু আল্লাহর), আল্লাহু আকবার (আল্লাহ মহান), লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ (আল্লাহ ছাড়া কোন রব / মালিক নাই), সুবহানাল্লাহে ওয়াবিহামদিহী সুবহানাল্লাহিল আযিম ইত্যাদি।
যারা আল্লাহর পথে চলেনা, আল্লাহর হুকুম আহকাম মেনে চলেনা তাদের মুখ থেকে আল্লাহ যিকির উচ্চারনও আল্লাহ পছন্দ করেন না তা আমরা নিচের হাদিস থেকে স্পষ্টভাবে বুঝতে পারি-
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন- আল্লাহ্ দাউদ (আঃ)-এর প্রতি প্রত্যাদেশ করলেন, “জালিমদেরকে বলে দাও, তারা যেন আমাকে স্মরণ না করে। কারণ যে লোক আমায় স্মরণ করে, আমিও তাকে স্মরণ করি। আর জালিমদেরকে স্মরণ করার অর্থ হল তাদের প্রতি আমার অভিশাপ বর্ষণ করা।” -হাকেম এ হাদীসটি ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে সংগ্রহ করেছেন।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে দুনিয়াবি কাজের ফাঁকে ফাঁকে আল্লাহ যিকিরে মশগুল হওয়ার তৌফিক নফিস করুন, আর যিকিররত অবস্থায় যেন আমাদের মৃত্যু হয়। আর এই যিকিরের পুরষ্কার যে কত বড় তা আমরা নিচের হাদিস থেকে বুঝতে পারব।
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন-নিশ্চয় ইবরাহীম (আঃ) তাঁর রবকে জিজ্ঞেস করেছিলেন এবং বলেছিলেন, “ইয়া রব! যে লোক তোমার হামদ বা প্রশংসা করে, তার পুরস্কার কি? তিনি বললেন, “হামদ বা প্রশংসা কৃতজ্ঞতার চাবি; তার কৃতজ্ঞতা তা নিয়ে পরওয়ারদেগারে আলমের আরশ পর্যন্ত আরোহণ করে।” তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, “যে তোমার তাসবীহ বা গৌরব বর্ণনা করে, তার পুরস্কার কি?” তিনি বললেন, “তাসবীহের রহস্য পরওয়ারদেগারে আলম ছাড়া আর কেউ জানেনা।” -দায়লামী এ হাদীসটি হযরত আনাস (রাঃ) থেকে সংগ্রহ করেছেন।
আমাদের সবার মাঝে যিকিরের চর্চা শুরু হোক, আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাঁর আশেকে রাসুল হিসেবে কবুল করুক। আমীন।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: