কার উপাসনা করব, কেন করব? (পর্ব-২)

Permission taken from Source      http://prothom-aloblog.com/users/base/tarif/

দ্বিতীয় মতের প্রবক্তাদের মধ্যে কেউ আবার বিজ্ঞানীদের গোঁড়া অনুসারী, যারা পরীক্ষাগারে নিরবিচ্ছন্ন গবেষণার পর কোন বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছেন এবং মত পেশ করেন। বিজ্ঞানীদের কেউ কেউ অন্যের চিন্তাধারা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে কিছু সময়ের জন্য নাস্তিক্যবাদের প্রতি নতজানু হলেও যখনি তারা নিজের সামনে মুক্ত চিন্তার দ্বার উম্মুক্ত করার প্রয়াশ চালিয়েছেন তখনি তারা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে এ পৃথিবীর একজন স্রষ্টা আছেন। এ রকম একজন বিজ্ঞানীর নাম হচ্ছে ফ্রাঙ্ক লেন। যিনি বায়োলোজির গবেষক ছিলেন। তিনি বলেন, “যদি আমরা মেনে নিই এ জগত অস্তিত্বশীল, তবে এ অস্তিত্ব ও এর উতসকে আমরা কিভাবে ব্যাখ্যা করব? এ প্রশ্নের উত্তরের চারটি সম্ভাবনা আছে।
এক: হয়ত বলা হবে এ মহাবিশ্ব কল্পনা ছাড়া আর কিছু না। এ মতামত আমরা শুরুতে যা মেনে নিয়েছি তার সাথে সাংঘর্ষিক-অর্থ্যাৎ এ মহাবিশ্ব অস্তিত্বশীল।

দুই: অথবা বলা হবে এ মহাবিশ্ব নিজে থেকেই নিজে সৃষ্টি হয়েছে। সহজজ্ঞান (intuition) এ মতকে প্রত্যাখান করে।তিন: অথবা বলা হবে এ মহাবিশ্ব অনাদি, যার কোন শুরু নাই। এ মত আল্লাহতে বিশ্বাসীদের মতের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ, যারা বলেন সৃষ্টিকর্তা অনাদি। কিন্তু মহাবিশ্বের নিয়মনীতি এটাই প্রমাণ করে যে- এ মহাবিশ্ব একটা সময়ের সাথে জড়িত এবং নির্দিষ্ট একটা ক্ষণ থেকে এর যাত্রা শুরু হয়। সুতরাং এ মহাবিশ্ব একটা ঘটনার ফল বটে, কিন্তু এ সুনিপুন, বিন্যস্ত ঘটনাকে কোন দৈব ঘটনা বলে আখ্যায়িত করা যাবে না। অতএব এ মতও বাতিল।

চার: অথবা বলা হবে এ মহাবিশ্বের একজন স্রষ্টা রয়েছেন যিনি অনাদি, তিনি এ মহাবিশ্বকে অস্তিত্ব দিয়েছেন, এর আগে মহাবিশ্বের কিছুই ছিল না। কোনরূপ আপত্তি না করে বিবেক এ মতটাকে গ্রহন করে এবং এ মতকে গ্রহন করার ফলে ভিন্ন কোন সম্ভাবনার অবতারনা হয় না, যা এ মতকে অসার প্রমাণিত করতে পারে। সুতরাং এ মতের উপর নির্ভর করা অপরিহার্য।”

জন ক্লিফল্যান্ড কার্সার নামে অপর এক গণিতবিদ ও পদার্থ বিজ্ঞানী বলেন, “পদার্থ বিজ্ঞান আমাদেরকে এ প্রমাণ দিচ্ছে তা হচ্ছে- কিছু কিছু পদার্থ ধ্বংসের পথে আগাচ্ছে। কিন্তু এর কোনটি খুব দ্রুত আগাচ্ছে, আবার কোনটি খুব ধীরে আগাচ্ছে। এর ভিত্তিতে বলা যায় যে ‘পদার্থ চিরস্থায়ী নয়’, সুতরাং পদার্থ অনাদিও নয়। পদার্থ বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখার সূত্রগুলো এ প্রমাণ দেয় যে, পদার্থের শুরুটা খুব দ্রুত ছিল না, আবার ক্রমধারায়ও ছিল না। বরং হঠাৎ করে পদার্থের উৎপত্তি হয়। এমনকি বিজ্ঞান আমাদেরকে পদার্থের সঠিক উৎপত্তি কালটা বের করে দিতে সক্ষম। এর উপর নির্ভর করে বলা যায় বস্তুজগৎ সৃষ্ট এবং সৃষ্টির পর থেকে তা বিশেষ নিয়ম ও বিশেষ ধর্ম মেনে চলছে। দৈবক্রমে এর সৃষ্টি হয়নি। সুতরাং এ বস্তুজগৎ যখন নিজে নিজেকে সৃষ্টি করতে পারেনি এবং নিজস্ব গতিপথ ও আপনার ধর্ম নিজে নির্ধারণ করতে অক্ষম, সুতরাং তা জ্ঞান ও প্রজ্ঞার গুণে গুণান্বিত কোন এক মহান সত্তার কুদরতে সৃষ্টি।”

উপরিউক্ত যৌক্তিক ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণের আলোকে এটাই প্রমাণিত হল যে, মহাবিশ্বের উতপত্তি সম্পর্কে প্রথম মতই সঠিক। অর্থ্যাৎ এ মহাবিশ্ব একজন মহান স্রষ্টার সৃষ্টি ছাড়া আর কিছু নয়। এ মহাবিশ্ব তাঁর আদেশে সৃষ্টি হয়েছে, তাঁর ইশারায় নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে এবং তাঁর ইশারায় ধ্বংস হবে। সুতরাং এ মহাবিশ্বের অন্যান্য প্রাণীর ন্যায় মানুষও সে মহান স্রষ্টার একটা সৃষ্টি এবং তাঁর নিময়নীতির কাছে নত হতে বাধ্য; চাই তা ইচ্ছায় হোক অথবা অনিচ্ছায় হোক। তার সাথে সাথে এ কথাও প্রমাণিত হল, মহান স্রষ্টা জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় ভুষিত এবং তাঁর জ্ঞান সৃষ্টিকুলের জ্ঞানের অনেক উর্ধ্বে। সৃষ্টিকুল তাঁর জ্ঞান সীমানায় পৌঁছার সামান্যতম ক্ষমতাও রাখে না। সৃষ্টির আয়ু,ক্ষয়, ধ্বংসের নিশ্চিত জ্ঞান একমাত্র তাঁর কাছে রয়েছে।

স্রষ্টার অস্তিত্বের উপর নিশ্চিত সিদ্ধান্তে আসার পর আমাদেরকে এ সিদ্ধান্তে আসতে হচ্ছে- স্রষ্টা কি একজন না একাধিক? এই প্রসঙ্গে আমাদেরকে খুব বেশী আলোকপাত করতে হবে বলে মনে করি না। কারণ এটা খুব স্পষ্ট বিষয়। যদি ধরে নিই- এ পৃথিবীর স্রষ্টা একজন নয়, একাধিক তবে আমাদেরকে এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে- তাদের কে আগে কে পরে? কে কার চেয়ে শক্তিশালী? কার নির্দেশে মহাবিশ্ব পরিচালিত হচ্ছে? অথচ পূর্বের আলোচনা থেকে এ কথা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, স্রষ্টা অনাদি, কালের বন্ধনে তাঁর অস্তিত্বকে আবদ্ধ করা থেকে তিনি পবিত্র; বরং কাল বা সময় তাঁর সৃষ্টিকুলের অন্তর্ভুক্ত, কালের অস্তিত্বের আগে অতীত-বর্তমান-ভবিষত বলে কিছু ছিল না। আর স্রষ্টা যদি একাধিক হন এবং তাদের শক্তিও সমমানের হয় তাহলে এ মহাবিশ্ব পরিচালনায় বিঘ্ন দেখা দেয়া স্বাভাবিক ছিল; অথচ এ ধরনের কোন বিঘ্নতা সৃষ্টির শুরু থেকে আজ অবধি দেখা দেয়নি। অর্থ্যাৎ মহাবিশ্বের নিয়ন্ত্রণ যদি দুজনের হাতে থাকত তাহলে একজন বলতেন- আজ সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উদিত হবে; অন্যজন বলতেন- না, আজ সূর্য পূর্ব দিক থেকেই উদিত হবে। এভাবে মহাবিশ্বের ধ্বংস অনিবার্য হয়ে পড়ত, কিন্তু এমন কিছু আজো ঘটেনি। যদি বলি না তারা একজন অন্যজনের চেয়ে শক্তিশালী অথবা বলি সৃষ্টি ক্ষেত্রে দুজনের অংশগ্রহন থাকলেও নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে দুজনের অংশগ্রহন নাই; তাহলে দুজনের একজনকে ব্যর্থতার গুণে গুণান্বিত করা হল যা স্রষ্টার শানে সাজে না। স্রষ্টা হবেন তিনি যিনি যাবতীয় পূর্ণতার গুণে ভূষিত; সকল ব্যর্থতা, হীনতা ও দীনতার যিনি উর্ধ্বে।

এমনকি এ পৃথিবীর বিভিন্ন ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে যারা একাধিক উপাস্যের উপাসক তারাও এ কথা বলেন না যে, স্রষ্টা একাধিক। তারা মনে করেন উপাসনা পাওয়ার যোগ্য একাধিক সত্তা, কিন্তু মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন একাধিক সত্তা এ কথা তারাও বলেন না। খ্রিস্টানদের কথায় ধরা যাক না; তারা ত্রিত্ববাদে বিশ্বাসী- অর্থ্যাৎ তারা পিতা, পুত্র ও পবিত্র আত্মার উপাসক- তারাও এ কথা মনে করেন না যে এ তিনজনে মিলে মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন। বরং তারাও বলেন মহাবিশ্বের স্রষ্টা একমাত্র পিতা, আর যীশূ (তাদের দৃষ্টিতে) তাঁর পুত্র হিসেবে উপাসনা পাওয়ার যোগ্য এবং পবিত্র আত্মা যেহেতু এ দু’জনের মাঝে বার্তাবাহক ছিলেন, সুতরাং তাদের দৃষ্টিতে তিনিও উপাসনা পাওয়ার যোগ্য। অথবা হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কথা বিবেচনা করলেও দেখা যায়, তারা বহু ঈশ্বরে বিশ্বাস করলেও সবাইকে তারা স্রষ্টা মনে করেন না। বরং একজনকেই তারা স্রষ্টা মনে করেন।

অতএব আমরা এ সিদ্ধান্তে আসতে পারলাম এ মহাবিশ্বের স্রষ্টা একজন এবং মহাবিশ্ব সৃষ্টিতে তাঁর সাথে অন্য কোন সত্তার অংশগ্রহন ছিল না, তাঁর একক নির্দেশে এ মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়েছে। এখন আমাদের এ সিদ্ধান্তে আসা প্রয়োজন মানুষ কি তার স্রষ্টার প্রতি নতি স্বীকার করতে বাধ্য? মানুষকে কি তাঁর উপাসনা করতে হবে?
স্রষ্টার প্রতি নতি স্বীকার বা বশ্যতা স্বীকার দু রকম হতে পারে। এক: অনিচ্ছাধীন নতি স্বীকার। দুই: ইচ্ছাধীন নতি স্বীকার।

অনিচ্ছাধীন নতি স্বীকার হচ্ছে- এমন যাতে সৃষ্টিকুলের ইচ্ছা বা অনিচ্ছার কোন প্রভাব নাই। অর্থ্যাৎ ঐসব নিয়ম বা বিধি-বিধানের প্রতি নতি স্বীকার করা যেগুলো ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় লঙ্ঘন করার সাধ্য এ মহাবিশ্বের কারো নাই; হোক মানুষ অথবা অন্য কোন সৃষ্টি। যেমন- রাতদিনের আবর্তন, জন্ম-মৃত্যুর বিধিবদ্ধ রীতি, চন্দ্র-সূর্যের উদয়-অস্ত, জোয়ার-বাটার আবহমানতা ইত্যাদি। এমন কি বিবেকের অধিকারী প্রাণী “মানুষ” পর্যন্ত তার নিজের দেহের ক্ষেত্রে স্রষ্টার নিয়ম মানতে বাধ্য। মানুষের হৃদপিণ্ড, শিরা-উপশিরা, কিডনী অথবা অন্য যে কোন অঙ্গ ঠিক সেভাবে কাজ করে চলছে যে ফর্মুলা, যে সফটওয়্যার স্রষ্টা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। কোন ব্যক্তি নির্দেশ দিয়ে, জোর খাটিয়ে এগুলোর গতিপথ সামান্যতম পরিবর্তন করতেও অক্ষম। অতএব প্রথম প্রকারের নতি স্বীকার করতে সৃষ্টিকুলের সবাই বাধ্য কি সে মানুষ হোক অথবা অন্য কোন প্রাণী হোক অথবা অন্য কোন সৃষ্টি হোক।

আর ইচ্ছাধীন নতি স্বীকার হচ্ছে- যা করতে স্রষ্টা কাউকে বাধ্য করেন নি। যার ইচ্ছা সে তাঁর বশ্যতা স্বীকার করে, তার কাছে নত হয়। আর যার ইচ্ছা সে তাঁর বশ্যতা স্বীকার করে না, তাঁকে মানে না। এ প্রকারের নতি স্বীকারকে ধর্মাবলম্বীরা “ইবাদত”, ‘উপাসনা’ “পূজা” ইত্যাদি বলে আখ্যায়িত করে থাকেন। কিন্তু বিবেক কী বলে? বিবেক কি স্রষ্টার উপাসনা করাকে আবশ্যক সাব্যস্ত করে? ন্যায়ের দাবী কি স্রষ্টার প্রতি বশ্যতা স্বীকার করা? আসুন এ বিষয়ে একটু পর্যালোচনা করি।

এক: এ পৃথিবীতে যদি মানুষের যাবতীয় প্রয়োজনগুলোর দিকে দৃষ্টিপাত করা হয় তবে দেখা যাবে সবগুলো প্রয়োজন বা চাওয়া-পাওয়া দুটো বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ। কোন কল্যাণ লাভ করা এবং অকল্যাণ থেকে রক্ষা পাওয়া। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান; হাসি-খুশি, নিরাপত্তা, মানসিক প্রশান্তি ইত্যাদি সব কল্যাণের অর্ন্তভূক্ত। আর রোগ, শোক, যুদ্ধ-বিগ্রহ; কান্না, ব্যাথা-বেদনা ইত্যাদি সব অকল্যাণের অর্ন্তভুক্ত। যেহেতু মহান স্রষ্টা কল্যাণ ও অকল্যাণেরও স্রষ্টা, এবং কল্যাণ ও অকল্যাণের ভাগ-ভাটোয়ারা তাঁর হাতে এবং এ মহাবিশ্বে এমন কোন সত্তা নাই যিনি কল্যাণ অর্জনে, অকল্যাণ থেকে রক্ষা পেতে সার্বক্ষণিক মানুষের পাশে থাকতে পারে একমাত্র স্রষ্টা ছাড়া, অতএব মানুষের উচিত কল্যাণ পাওয়ার জন্য, অকল্যাণকে প্রতিহত করার জন্য স্রষ্টার প্রিয়ভাজন হওয়া, সার্বক্ষণিক ও সর্বক্ষেত্রে তাঁর আদেশ মেনে চলার মাধ্যমে তাঁর নিকটবর্তী হওয়া। আর একেই বলে স্রষ্টার ইবাদত, উপাসনা, পূজা বা দাসত্ব। অতএব মানুষের নিজের স্বার্থে স্রষ্টার উপাসনা করা তা উপর আবশ্যকীয়।

দুই: সৃষ্টিকুলের জ্ঞান স্রষ্টার জ্ঞানের সামান্যতম অংশমাত্র। মানুষ অতীত জীবন ভুলে যায়, বর্তমান সম্পর্কে সামান্যটুকু জ্ঞান রাখে, আর ভবিষ্যত সম্পর্কে সে কিছুই জানে না। আর মানুষ যতটুকু জ্ঞান রাখে তাও স্রষ্টার প্রদত্ত। কিন্তু স্রষ্টার জ্ঞান সর্বব্যাপী, তিনি প্রতিটি অনু-পরমানুর অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে জানেন। কোন ফর্মুলা মানব জীবনের জন্য উপযোগী, কোন ফর্মুলায় মানব জীবনের সমস্যাগুলোর স্থায়ী সমাধান মিলবে এ জ্ঞান একমাত্র স্রষ্টার রয়েছে। অতএব মানুষের উচিত স্রষ্টার দেয়া বিধিবিধান মেনে চলা। তাঁর আদেশ পালন করা, নিষেধ থেকে বিরত থাকা; এটাই স্রষ্টার উপাসনা।

তিন: যে কোন ভাল গুণের প্রতি মানুষ প্রকৃতিগতভাবে দূর্বল, ভাল গুণের অধিকারীকে সবাই ভালোবাসে। ক্লাশের ভাল ছাত্রকে, মেধাবী ছেলেটিকে সবাই বন্ধু হিসেবে পেতে চায়। আর এ ভালগুণগুলোর যিনি স্রষ্টা তাঁর মাঝে এ গুণগুলো পূর্ণামাত্রায় বিদ্যমান আছে বলেই তো ঐসব গুণের সামান্য মাত্রা তিনি সৃষ্টিকে দিতে পেরেছেন। অতএব মানব প্রকৃতির দাবী স্রষ্টাকে ভালোবাসা, আর স্রষ্টাকে ভালোবাসাই হল উপাসনার মূল কথা। যেহেতু উপাসনা বলতে বুঝায় “পূর্ণ ভালোবাসার সাথে পরিপূর্ণ নতি স্বীকার করা। অতএব মানুষের সহজাত প্রকৃতির দাবী স্রষ্টার উপাসনা করা। যেহেতু তিনি সৃষ্টির চেয়ে উত্তম এবং তিনি যাবতীয় উত্তম গুণাবলীতে অভিষিক্ত।
প্রবন্ধকে আর দীর্ঘায়িত না করার স্বার্থে এ প্রমাণগুলোকে আমরা যথেষ্ট মনে করছি এবং আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারলাম যে মানুষের উপর স্রষ্টার উপাসনা করা আবশ্যক; তা তার নিজের স্বার্থেই, নিজ প্রয়োজনে; স্রষ্টার এতে কোন লাভ বা ক্ষতি নাই। তাহলে এবার এ সিদ্ধান্তে আসা উচিত স্রষ্টার সাথে কি অন্য কারো উপাসনা করা যাবে, নাকি এককভাবে তাঁর উপাসনা করতে হবে?

পূর্বের আলোচনাতে আমরা যে সকল গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্যের কারণে স্রষ্টার উপাসনা করার পক্ষে প্রমাণ পেশ করেছি সে সকল গুণাবলী যেমন- সৃষ্টি করার ক্ষমতা, এ বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ, নিখুঁত-জ্ঞান, ভাল-আনয়ন ও মন্দ-দমনের ক্ষমতা একমাত্র স্রষ্টা ছাড়া আর কারো কাছে নাই। অতএব উপাসনা পাওয়ার নিরঙ্কুশ অধিকার স্রষ্টার একার, অন্য কেউ এ অধিকারে তার সাথে অংশীদার নয়। বরং স্রষ্টা নিজেই ঘোষণা দিয়েছেন- “তোমাদের উপাস্য একজন, তিনি ব্যতীত আর কেউ উপাসনা পাওয়ার হকদার নয়।” এবং যেহেতু তিনি ব্যতীত এ মহাবিশ্বের আর সবকিছু তাঁর সৃষ্টি, তাঁর অনুগত দাস; অতএব মনিবকে বাদ দিয়ে এক দাস আরেক দাসের প্রতি নতি স্বীকার কি আদৌ যুক্তি সঙ্গত। আমরা যে সূর্য দেখতে পাচ্ছি সে তো তার স্রষ্টার নির্দেশে আলো দিয়ে যাচ্ছে। যে বিশাল সমুদ্র দেখছি সে তো তার সৃষ্টিকর্তার আদেশে বহমান। যে বিশাল আকাশ দেখছি তাও তো তার স্রষ্টার কুদরতে দাঁড়িয়ে আছে। অতএব এদের পুজা-অর্চনা করা কি আদৌ যৌক্তিক।

যে যীশুর পুজা করা হয় তিনি তো মানব। আর মানব কি মহান স্রষ্টার সৃষ্টি নয়! তাহলে সৃষ্টিকে কিভাবে স্রষ্টার অধিকার দেয়া হবে। যে ‘পবিত্র আত্মার’ (জিব্রাইলের) পুজা করা হয় সেও তো এ মহাবিশ্বের একটা একক। তাহলে সে ও তো স্রষ্টার সৃষ্টি অতএব কিভাবে তাকে স্রষ্টার মর্যাদা দিয়ে তাঁর প্রতি নতি স্বীকার করা হবে। তাকি অজ্ঞতা নয়!
আর মাটির তৈরী পুতুল দেবতা; তার তো না আছে প্রাণ, না আছে শ্রবণশক্তি, না আছে দৃষ্টিশক্তি। নিজের রক্ষাবেক্ষন সে নিজে করতে পারে না; তাহলে সে কিভাবে চাক্ষুষমান, শ্রবণশক্তি ও বাকশক্তির অধিকারী, বিবেকবান মানবের উপাস্য হবে। তার নিজের দেহকে প্রতিনিয়ত ধুয়ে মুছে রাখার জন্য সে অন্যের মুখাপেক্ষী তাহলে সে কিভাবে মানবের অকল্যাণ দূর করবে!

এ নিরিখে আমরা বলতে পারি মহান আল্লাহ যিনি এ মহাবিশ্বের স্রষ্টা তিনি ব্যতীত আর যা কিছুর উপাসনা করা হয় না কেন তারা বা সেগুলো প্রত্যেকটি এ মহাবিশ্বের একেকটা একক বা একেকটা অংশ। আর মহাবিশ্বের সবকিছু যেহেতু আল্লাহ পাকের সৃষ্টি সুতরাং এসব কল্পিত উপাস্যরাও আল্লাহ পাকের সৃষ্টি। অতএব মহান স্রষ্টা আল্লাহর সাথে এসব উপাস্যের উপাসনা করা মানে স্রষ্টার অধিকার ক্ষুন্ন করা, সৃষ্টিকে স্রষ্টার আসনে সমাসীন করানো। নিঃসন্দেহে এটা মহা অন্যায়, অমার্জনীয় অপরাধ।

অতএব হে মানব; নাস্তিক্যবাদ, বহু ঈশ্বরবাদ ছেড়ে দিয়ে একত্ববাদ গ্রহন কর; এক আল্লাহর ইবাদতের স্বীকৃত দাও; তাওহীদের শাহাদা দিয়ে মুমিন হও; তবে তুমি কল্যাণে অভিষিক্ত হবে, দুনিয়াতে শান্তি পাবে, পরকালে তোমার মুক্তি মিলবে। আল্লাহ তোমার ভাল করুন।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: