কার উপাসনা করব, কেন করব? (পর্ব-১)

Permission taken from Source    http://prothom-aloblog.com/users/base/tarif/

 

এ মহাবিশ্বে মানুষের অস্তিত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেহেতু প্রাণীজগতের মধ্যে কেবল মানুষেরই বিবেক রয়েছে, ভাল-মন্দ বিবেচনা করার ক্ষমতা রয়েছে। তাই জীবন সংসারের পরতে পরতে মানুষকে তার সুকীর্তির জন্য পুরস্কৃত করা হয়, আবার তার কাছ থেকে তার ভুলের মাশুলও কড়ায়-গণ্ডায় আদায় করা হয়। মানুষ তার বুদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে তার চেয়ে অধিক শক্তিধর, অতি হিংস্র, অত্যন্ত বিষধর, বিশালদেহী প্রাণীকে পর্যন্ত বশ করতে সক্ষম হয়। অনেক সময় দেখা যায় মহীরুহী হাতীটির মাহুত ছোট্ট একটা মনুষ্য বাচ্চা অথবা শক্তিশালী অশ্বের সওয়ারী একজন নাবালক শিশু। জলে-স্থলে এমন কোন প্রাণী নেই মানুষ যাকে বশ করতে পারে নি। বড় তিমি মাছটিকেও মানুষের কাছে হার মানতে হয়।

কিন্তু, এ বুদ্ধিমান মানুষ যার কাছে প্রাণীজগতের সকলেই নতি স্বীকার করতে বাধ্য, সেকি অন্য কোন শক্তিমানের কাছে নত হতে বাধ্য? অন্য কোন সত্তার কাছে আপনাকে সঁপে দেয়ার কি কোন আবশ্যকতা মানবের রয়েছে? অন্য কথায় মানবের জীবনে উপাসনা বা ইবাদতের প্রয়োজনীয়তা কতটুকু? আদৌ কি মানুষ কারো কাছে মাথা নত করতে বাধ্য? নাকি এসব ধর্মান্ধদের আস্ফালন বৈ কিছুই নয়। আসুন অন্তরাত্মাকে খুলে ধরে, দৃষ্টিকে প্রসারিত করে, বিবেককে কাজে লাগিয়ে একটু ভাবি।প্রথমেই আসা যাক, এ মহাবিশ্বের সৃষ্টির উতস সম্পর্কে। এ সম্পর্কে যদি আমরা মানুষের নানা মত, নানা কথা হাতড়াতে যাই সম্ভবত কোন কূলকিনারা পাব না; মতামতের আধিক্যের কারণে। তবে মৌলিকভাবে এসব মতামতকে দুভাগে ভাগ করা যেতে পারে। একটা মত হচ্ছে- এ বিশ্বজগতের একজন স্রষ্টা আছেন, তিনি এ মহাবিশ্বকে সৃষ্টি করেছেন এবং নিয়ন্ত্রণ করছেন। আর অন্য মত হচ্ছে- এ বিশ্বজগতের কোন স্রষ্টা নাই, অন্য কোন উপায়ে এর সৃষ্টি হয়েছে এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে এ জগত পরিচালিত হচ্ছে, এর নিয়ন্ত্রণে কারো হাত নেই। আমরা নিশ্চিতভাবে এ কথা বলতে পারি এ পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ প্রথম মতের প্রবক্তা। কারণ পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ কোন না কোন ধর্মের অনুসারী, আর ধর্ম সমূহের মূলমন্ত্র হল স্রষ্টার উপাসনা করা, তা একক সত্তার জন্য হোক অথবা একাধিক সত্তার জন্য হোক। সুতরাং স্রষ্টার উপাসনাকে স্বাব্যস্ত করতে গেলে তারা স্রষ্টার অস্তিত্বকেও স্বাব্যস্ত করবে। আর দ্বিতীয় মতের পক্ষে রয়েছেন অপেক্ষাকৃত কম সংখ্যক মানুষ। তাদের মধ্যে নব্য মতবাদসমূহের প্রবক্তাদের বক্তব্য এ ব্যাপারে অতি স্পষ্ট এবং মতের উপর তাদের অবস্থানও অতি মজবুত। যেমন, প্রত্যক্ষবাদ বা দৃষ্টবাদ (positivism) যার প্রবক্তা হচ্ছেন ফরাসি দার্শনিক ও ওগ্যস্ত কঁৎ; মানবতাবাদ বা মানবতন্ত্রবাদ (humanism) যার প্রবক্তা হচ্ছেন জন ডেভিড; কমিউনিজম (communism) যার প্রবক্তা হচ্ছেন কার্ল মার্কস ইত্যাদি নব্য দার্শনিক থিওরির প্রবক্তারা।

এবার আসা যাক সুস্থ বিবেক কি বলে? উপরিউক্ত দুটো মতের কোনটিকে একজন সুস্থ মানুষের বিবেক সায় দেয়?

যারা দ্বিতীয় মতের প্রবক্তা তাদের মধ্যে কেউ হলেন প্রকৃতিতে বিশ্বাসী। তারা বলেন, এই মহাবিশ্ব প্রকৃতির নিজের সৃষ্টি। পদার্থের বিভিন্ন অংশের মাঝে বিক্রিয়ার ফলে কোন ধরনের ইচ্ছা বা উদ্দেশ্য ছাড়া তার বিভিন্ন অংশগুলো একটি নির্দিষ্ট অবয়ব ও নির্দিষ্ট পরিমাণে জড়ো হয়ে আসমান, জমিন, মানুষ ও উদ্ভিদ ইত্যাদির অস্তিত্ব হয়। বিক্রিয়ার কারণে পদার্থের বিভিন্ন অংশ বিভিন্ন ধরনের আকৃতি ধারণ করে যার ফলে মহাবিশ্বের প্রাণীজগত ও জড়জগতের মাঝে শ্রেণী বৈচিত্র প্রচুর।

আমরা যদি এ মতাবলম্বীদেরকে জিজ্ঞেস করি- আপনারা প্রকৃতি বলতে কি বুঝাতে চান। তারা হয়তো বলবেন- প্রকৃতি হচ্ছে এ জগতের অস্তিত্বশীল বিভিন্ন সত্তা যেমন- প্রাণিজগত, উদ্ভিদজগত, জড়জগত। অথবা বলবেন প্রকৃতি হচ্ছে এ মহাবিশ্বে বিদ্যমান বিভিন্ন বস্তুর নানা রকম বৈশিষ্ট্য বা নানা রকম গুণ যেমন, উষ্ণতা, ঠাণ্ডা; গতিশীলতা, স্থিরতা; কাঠিন্য, তারল্য ইত্যাদি। তৃতীয় কোন জবাব তারা আদৌ দিতে পারবেন না।

উত্তর তাদের যেটায় হোক না কেন- কিভাবে ভাবা যেতে পারে কোন বিবেকহীন সত্তা বিবেকবান কোন সত্তাকে অস্তিত্ব দিবে?! মানুষ বিবেকবান প্রাণী, তার রয়েছে নিজস্ব ইচ্ছাশক্তি, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য, অন্যকে পরিচালনা করার ক্ষমতা। সুতরাং (প্রকৃতি) যার নিজের কোন ইচ্ছাশক্তি নাই তার পক্ষে কি সম্ভব এমন কাউকে সৃষ্টি করা যার স্বতন্ত্র ইচ্ছাশক্তি রয়েছে, যার কার্যাবলী বিশেষ কোন উদ্দেশ্যে সাধিত হয়?! অথবা প্রকৃতির পক্ষে কি সম্ভব এ বিশাল জগতকে এত নিপুনভাবে পরিচালনা করা, যে নিপুনতার প্রমাণ আমরা আমাদের চারিপাশের প্রতিটি বস্তুনিচয়ের মধ্যে লক্ষ্য করে থাকি?!

পদার্থের অংশগুলোর তো নিজস্ব কোন ইচ্ছাশক্তি নাই; সে কিভাবে নভোমণ্ডল, ভূমণ্ডল, প্রাণীজগত, উদ্ভিদজগত, মানুষ ইত্যাদি নানা শ্রেণীতে বিভক্ত হয়ে মহাবিশ্বে বৈচিত্র আনল?!

যে পদার্থের নিজেরই বিবেক নাই, দৃষ্টিশক্তি নাই সে কিভাবে এ পৃথিবীর বস্তুনিচয়কে বিন্যস্ত করবে, স্তরে স্তরে সাজাবে?! যে পদার্থের কথা বলার ক্ষমতা নাই সে কিভাবে বিভিন্ন বস্তুর ভবিষত নিয়ে চিন্তা করবে, ভবিষতের প্রয়োজন মিটাবার পরিকল্পনা করবে?!

অতএব প্রকৃতিপন্থীদের এ মতামতের অর্থ দাঁড়ায় এই যে, পানি নিজেই নিজেকে সৃষ্টি করেছে, পৃথিবী নিজেই নিজেকে সৃষ্টি করেছে, আসমান নিজেই আসমানকে সৃষ্টি করেছে, বিভিন্ন বস্তু নিজেই নিজেকে অস্তিত্ব দিয়েছে এবং বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত হয়েছে; অর্থ্যাৎ যে সৃষ্টি সেই আবার স্রষ্টা; যা অসম্ভব, অযৌক্তিক, যার ফলে বিপরীত বৈশিষ্ট্যের দুই সত্তা একত্রিত হওয়া আবশ্যক হয়ে পড়ে। অথবা তাদের এ মতামতের আউট ফুট হল কোন কারণ ছাড়া যে কোন কিছুর অস্তিত্ব হওয়া সম্ভব; যা নিতান্ত ভ্রান্ত কথা, যে কোন বিবেকবান ব্যক্তি এ মতের প্রতিবাদ করবেন। কারণ এ পৃথিবীর দালান-কোঠা, বাড়ী-গাড়ী, আসবাবপত্র ইত্যাদি সবকিছু কোন কোন মাধ্যমে তৈরী হয়েছে, মাধ্যম ছাড়া কোনটাই অস্তিত্ব লাভ করেনি। সুতরাং এ মহাবিশ্ব কিভাবে কোন মাধ্যম ছাড়া অস্তিত্ব লাভ করবে!?

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: